১০:৩২ পি.এম
রাষ্ট্রের চালিকাশক্তিকে শক্তিশালী রাখা ব্যয় নয়, বিনিয়োগ। একজন আর্থিকভাবে স্বস্তিতে থাকা সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী আরও মনোযোগী, আরও দক্ষ এবং আরও দায়িত্বশীলভাবে রাষ্ট্রের সেবা দিতে সক্ষম হন। বিপরীতে, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ প্রশাসনিক দক্ষতা ও মনোবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা অবকাঠামো, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কথা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু একটি মৌলিক সত্য বারবার আড়ালে থেকে যায়—রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনবল। আর সেই জনবলের কেন্দ্রে রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, যাঁদের হাত ধরেই সরকারের নীতি বাস্তবায়িত হয় এবং প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে রাষ্ট্রের কার্যক্রম সচল থাকে।
পে-স্কেল কোনো দয়া বা অনুদান নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা ধরে রাখার একটি অপরিহার্য অর্থনৈতিক কাঠামো। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাস্তব বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। কারণ, প্রশাসনকে কার্যকর রাখতে হলে প্রশাসনের মানুষগুলোকেও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম রাখতে হবে।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পরপর পে-স্কেল পুনর্বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সর্বশেষ পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। আজ ১১ বছর অতিক্রম হলেও নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহু গুণ বেড়েছে। অথচ অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পে-স্কেলের ওপর নির্ভরশীল নিবন্ধনভুক্ত কর্মচারীরা সেই পুরোনো বেতন কাঠামো নিয়েই জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই শ্রেণির মানুষের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—তাঁরা সাধারণত প্রকাশ্যে নিজেদের আর্থিক সংকট নিয়ে কথা বলেন না। নিরবে নিজেদের দুঃখগুলো সহ্য করে ঋণগ্রস্ত হয়েও চললেও আত্মসম্মানের খাতিরে, সামাজিক মর্যাদার ভয়ে নিজেদের দুরবস্থার কথা কাউকে বলেন না। তাঁদের এই নীরবতা কখনোই স্বাচ্ছন্দ্যের প্রমাণ নয়; বরং দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। কিন্তু নীরবতারও একটি সীমা আছে। দীর্ঘদিন ধরে বাস্তব আয় কমে গেলে তার প্রভাব শুধু সংসারে নয়, কর্মস্পৃহা ও মানসিক অবস্থাতেও পড়ে। তাই এটি শুধু একটি আর্থিক বাজার ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত অর্থনীতির ব্যালেন্স করার নীতি নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত জনশক্তির জন্য নতুন উদ্যমে কিংবা কর্মস্পৃহা সৃষ্টির একটি বৃহৎ অনুপ্রেরণাদায়কও উদ্দীপক বটে।
বর্তমানে জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আলোচনা সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু যদি শুধুমাত্র আর্থিক সীমাবদ্ধতার যুক্তি দেখিয়ে এমন একটি পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়, যা বাস্তব মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় কিংবা তা ১০০% এর কম, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা রাষ্ট্র সচল রাখা বিশাল এই জনগোষ্ঠীর কাছে তা প্রত্যাশা পূরণের পরিবর্তে হতাশার কারণ হয়ে উঠতে পারে যা কর্ম স্পৃহা বাড়ানোর চেয়ে তার কর্মসৃহা হারাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সরকার চাইলে গ্রেডভিত্তিক ভিন্ন হারে বেতন বৃদ্ধি করতে পারে। প্রথম থেকে নবম গ্রেড, কিংবা দশম থেকে বিংশ গ্রেড—যেভাবেই কাঠামো নির্ধারণ করা হোক না কেন, সে ক্ষেত্রে যদি কোন গ্রেডের জনগোষ্ঠীকে তাদের বেতনের অপ্রুতলতার কারণে ১০০% এর ঊর্ধ্বে অতিরিক্ত কোন শতাংশ সরকার দিতে চায় সেটি সরকারের মর্জি, কিন্তু কোন গ্রেডকে ১০০ শতাংশের নিচে পে-স্কেল দিলে তা কোনভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত বৃহৎ এই অংশের আর্থিক ও মানসিক প্রশান্তির কারণ হবে বলে মনে হয় না।
নীতিগতভাবে এটি বৃদ্ধি হওয়া প্রয়োজন যা অন্তত দীর্ঘ ১১ বছরের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বাস্তবতা প্রতিফলিত করে। কারণ, আবার কবে নতুন পে-স্কেল হবে, তার কোনো নিশ্চিত সময়সীমা নেই। আজ যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরেও একই সংকট আরও গভীর হবে।
সরকার যখন নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের মতো একটি ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে, তখন সেটি যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়ে না থাকে। এমন একটি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে এই বিশ্বাস জাগায় যে রাষ্ট্র তাঁদের অবদানকে মূল্যায়ন করে এবং তাঁদের জীবনযাত্রার বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দেয়।
একটি কার্যকর রাষ্ট্র গড়তে হলে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তিকে সন্তুষ্ট, মর্যাদাপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল রাখা অপরিহার্য। দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষার পর নতুন পে-স্কেল যদি বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে না পারে, তবে সেটি শুধু আর্থিক নয়, মানসিকভাবেও অসংখ্য সরকারি চাকরিজীবীর জন্য হতাশার কারণ হবে। তাই সময়ের দাবি—নতুন পে-স্কেল এমন হোক, যা কেবল বেতন বৃদ্ধি নয়, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করার একটি দূরদর্শী বিনিয়োগ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়। দীর্ঘ ১১ বছরের ব্যাপক মূল্য স্থিতির এবং পরবর্তী পাঁচ বছরের ভবিষ্যতব্য বাজার পরিস্থিতির কারণে নতুন সরকারের কাছে এমন শতভাগ পে স্কেল প্রত্যাশা করা রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য অমূলক প্রত্যাশা বলে গণ্য করা উচিত হবে না।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন