০৫:২৯ পি.এম
দুই পা অচল এবং দুই হাতের শক্তি কম থাকলেও জীবনযুদ্ধে থেমে নেই সৈয়দ কাঞ্চন। আগুনে পুড়ে গেছে তার শেষ সম্বল, কিন্তু তিনি হার মানেননি। স্ত্রী আসমা বেগম তার এই সংগ্রামে সবচেয়ে বড় ভরসা।
সৈয়দ কাঞ্চন মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার বেতবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতার নাম সৈয়দ সোহবার হোসেন। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং মায়ের সঙ্গে সংসার পরিচালনা করেন।
ছোটবেলায় টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কারণে কাঞ্চনের পরিবার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেনি। এর ফলস্বরূপ, তার হাত-পা অচল হয়ে যায়। এক আত্মীয়ের মাধ্যমে আসমার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। শারীরিক সীমাবদ্ধতা এবং জীবনের বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও আসমার উপস্থিতি তাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করে। তাদের ভালোবাসা ও নির্ভরতার সম্পর্কের ভিত্তিতে ২০১০ সালে তাদের বিয়ে হয়। সংসারজীবনের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আসমা আজও তার স্বামীর পাশে রয়েছেন এবং বাকি জীবন তার সঙ্গে কাটাতে চান।
আরও পড়ুন: ফটিকছড়িতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ফ্রি ক্যাম্প, ৩ লাখ টাকার ওষুধ ও চশমা বিতরণ
দুজনে মিলে একটি মুদি দোকান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৩ সালের এক রাতে আগুনে পুড়ে যায় তাদের দোকান, যা ছিল তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। এই ঘটনার পরেও কাঞ্চন হাল ছাড়েননি। বর্তমানে, স্ত্রীর সহযোগিতায় বাড়িতে উপকরণ তৈরি করে প্রতিদিন বিকেলে হুইলচেয়ারে করে বের হন তিনি।
ডাসার সরকারি মহিলা কলেজের পাশে একটি ছোট জায়গায় সিঙ্গারা ও পুরির দোকান বসান। সেখানে আসমা বেগম নিজ হাতে সিঙ্গারা ও পুরি তৈরি করে বিক্রি করেন। এই আয়েই তাদের সংসার চলে। তাদের দুই মেয়ে, যারা ১২ ও ৮ বছর বয়সী, মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। তাদের খাতা-কলম কেনার খরচ এবং সংসারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাদের।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও অসহায়ত্ব থাকা সত্ত্বেও কাঞ্চন কখনো ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়াননি। তিনি নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। তবে সরকারি সহায়তা পেলে তার পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি আধুনিক হুইলচেয়ার এবং ঋণ সহায়তা তার বিশেষ প্রয়োজন।
সৈয়দ কাঞ্চন বলেন,
আরও পড়ুন: সামিট এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ শেষে গ্যাস সরবরাহ শুরু
“মানুষ জন্ম নিলে একদিন মরবেই। কিন্তু যতদিন বেঁচে আছি, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই। আমার দুইটা পা অচল, আমি হাঁটতে পারি না। কিন্তু আল্লাহ আমাকে একটা সুস্থ বিবেক আর দুইটা হাত দিয়েছেন। সেই হাতও প্রায় অচল। সেই বিবেক থাকতে আমি মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করতে পারব না। ভিক্ষা করলে হয়তো সহজে টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু নিজের আত্মসম্মানটা ধুলায় মিশে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “আমার একমাত্র আয়ের পথ ছিল ওই ছোট্ট মুদি দোকানটা। কিন্তু আগুনে পুড়ে আমার শেষ সম্বলটুকু যখন ছাই হয়ে গেল, আমি পুরো দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। তবে আমি হাল ছাড়িনি। আমি কারও করুণা চাই না, শুধু একটু সুযোগ চাই, যেন নিজের পরিশ্রম দিয়ে আমার পরিবার আর দুই মেয়ের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে পারি।”
কাঞ্চনের স্ত্রী আসমা বেগম বলেন,
“বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছি, তিনি কতটা কষ্ট করেন। শরীরটা অচল হলেও তার মনের জোর আমাদের সবার চেয়ে বেশি। সরকারিভাবে একটু সহযোগিতা পেলে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব।”
আরও পড়ুন: এলডিসি উত্তরণের পরও জলবায়ু অর্থায়ন অব্যাহত রাখার আহ্বান
মাদারীপুর জেলার সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা আফজাল হোসাইন জানিয়েছেন, অসহায় এই কাঞ্চনকে ইতিমধ্যে ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। তাকে সাবলম্বী করতে সহযোগিতা করা হবে। প্রয়োজনে তাকে ক্ষুদ্র ঋণও দেয়া হবে।
মাদারীপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা আফজাল হোসাইন আরও জানান, কাঞ্চনকে এরইমধ্যে ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। তাকে স্বাবলম্বী করে তুলতে সহযোগিতা করা হবে। প্রয়োজনে তাকে ক্ষুদ্রঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন