০১:০৮ পি.এম
জয়পুরহাটের হিমাগারে মজুত আলু এখন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে ২০ টাকা খরচ হলেও বর্তমানে হিমাগার গেটের কাছে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১১ টাকায়। এতে লোকসানে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিপণন বিভাগ কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ মাসে জয়পুরহাটের হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণ করেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ২০২৫ সালের লোকসান ২০২৬ সালে পুষিয়ে নেওয়া। সেই সময়ে ৬৫ কেজির এক বস্তা আলু সংরক্ষণের জন্য তাদের খরচ হয়েছিল এক হাজার ৩০০ টাকা। বর্তমানে ৬০ কেজির প্রতি বস্তা আলু হিমাগার গেটে সর্বোচ্চ ৬৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আরও পড়ুন: তিস্তার ভাঙনে কৃষকের স্বপ্ন ভঙ্গ, গরুকে খাওয়ানো হচ্ছে আমন ধান
কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, টানা দুই বছর আলুর মূল্য না পাওয়ার পর চলতি বছরের দামে তারা লোকসান গুণছেন। জেলার ২২টি হিমাগারে মৌসুমের শুরুতে দুই লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। মৌসুম শেষ হওয়ার কিছুদিন আগে মাত্র ৫৫ শতাংশ আলু খালাস হয়েছে। হিমাগার কর্তৃপক্ষ বলছে, রফতানিসহ আলুর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে কারখানা নির্মাণ জরুরি।
কৃষি বিপণন বিভাগ জানাচ্ছে, সম্প্রতি কালাই উপজেলায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য জায়গা নির্ধারণের প্রস্তুতি চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কৃষকরা আলুর বিভিন্ন পণ্যের সঠিক বাজার পাবেন।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর জয়পুরহাটে প্রায় ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে ১০ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আলু উৎপাদনকারী জেলা জয়পুরহাট। এ বছর সেই আলুতেই কপাল পুড়ছে জেলার প্রান্তিক কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। আলুর বাজারে দরপতনের ফলে অনেক কৃষকের পরিবার পথে বসার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে যারা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে আলু চাষ করেছেন। ব্যবসায়ী ও মৌসুমি আলুর পাইকারি বিক্রেতারাও বিপাকে পড়েছেন। তারা বিভিন্ন এনজিও থেকে এবং ধারদেনা করে হিমাগারে আলু মজুত করেছিলেন বেশি দামে বিক্রির আশায়।
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কৃষকের লাউবাগানের গাছ কেটে রাতের আঁধারে স্বপ্ন শেষ
আলুর দাম কমে যাওয়ার কারণে তারা পুঁজি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। শুধু কৃষক এবং ব্যবসায়ী নয়, হিমাগারের মালিক কর্তৃপক্ষও শঙ্কিত। সময়মতো হিমাগার থেকে আলু খালাস না হলে তাদের লোকসান হবে।
কৃষক ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন, এ বছর আলু উৎপাদন থেকে শুরু করে হিমাগারে সংরক্ষণ, সব মিলিয়ে প্রতি বস্তা আলুর জন্য খরচ হয়েছে এক হাজার ৩০০ টাকা। বর্তমানে হিমাগারের আলু বিক্রি হচ্ছে ৬৮০ টাকায়। ফলে প্রতি বস্তা আলুতে ৫০০ টাকার লোকসান হচ্ছে।
প্রান্তিক কৃষক শহিদুল ইসলামের ভাষ্য, এ বছর প্রতি বিঘা জমিতে আলুর বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও সেচসহ সব মিলিয়ে কৃষকের খরচ হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। আর প্রতি বিঘা জমিতে আলু উত্তোলনের সময় বিক্রি করেছেন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায়। এতে করে ভরা মৌসুমেই কৃষকের ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার লোকসান হয়েছে।
কৃষক বকুল হোসেন বলেন, "গত বছরের লোকসান কাটিয়ে এ বছর লাভের মুখ দেখবো বলে আশা করেছিলাম। মৌসুমের শুরুতে লোকসান হয়েছে, তাই ভেবেছিলাম হিমাগারে রাখলে হয়ত দাম বাড়বে, তখন বিক্রি করবো। কিন্তু এখন পর্যন্ত আলুতে সবাই লোকসানে আছি আমরা। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু নজর দিত তাহলে কৃষকদের উপকার হতো।"
আরও পড়ুন: নাটোরে নর্থ বেঙ্গল চিনিকলের আখ মাড়াই শুরু ৩০ অক্টোবর
আলু ব্যবসায়ী জাকারিয়া হোসেন বলেন, "এ বছর আলুর দরপতনের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন আলু ব্যবসায়ীরাও। বাজারদর কমে যাওয়ায় মজুত করা আলু প্রত্যাশিত দামে বিক্রি করতে পারছেন না অনেক ব্যবসায়ী। ফলে হিমাগারে রাখা আলুর পেছনে বিনিয়োগ করা অর্থ আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। হিমাগার থেকে আলু বের করছেন না কৃষকরা।"
কালাইয়ের এম ইসরাত হিমাগারের ব্যবস্থাপক আবু রায়হান এবং পুনট কোল্ড স্টোরেজের হিসাব রক্ষক এনামুল হক জানান, "তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং শ্রমিকের মজুরি কয়েক গুণ বেড়েছে, তবে তারা ভাড়া বাড়াননি। আগের ভাড়াই নিচ্ছেন। এ বছর আলুর দরপতনের কারণে হিমাগার থেকে আলু বিক্রি করছেন না কৃষকরা। এতে করে একদিকে যেমন পাইকাররা অলস সময় পার করছেন, অন্যদিকে হিমাগার থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ আলু খালাস হওয়ার কথা তা হচ্ছে না। এতে করে সময়মত হিমাগার থেকে আলু খালাস নিয়েও শঙ্কায় আছে হিমাগার কর্তৃপক্ষ।"
জয়পুরহাট কৃষি বিপণন অধিদফতরের কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, "জেলার ২২টি হিমাগারে এ বছর প্রায় দুই লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন আলু মজুত রাখা হয়েছিল। অথচ চলতি মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আলু খালাস হয়েছে মাত্র এক লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন; যা মূল সংরক্ষণ করা আলুর ৫৫ ভাগ দাঁড়ায়।"
তবে তিনি আলু চাষি ও ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর দিয়ে জানান, "সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই কালাই উপজেলায় একটি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য জায়গা নির্ধারণ করার চেষ্টা চলছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আলুর বিভিন্ন পণ্যের সঠিক বাজার পাবেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
আরও পড়ুন: সৈয়দপুরের কৃষকরা আগাম শীতের সবজি চাষে ব্যস্ত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন