১০:৪২ এম
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বেশ কিছু কৃষক গত কয়েক বছর ধরে গরমের মধ্যে শীতকালীন সবজি চাষ করছেন, অধিক লাভের প্রত্যাশায়। এবার সারা বছরই সবজির বাজার চড়া থাকায় তাদের কাজের গতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায়, শীত আসার আগেই ফুলকপি ও বাঁধাকপির চাষাবাদ শুরু করেছেন তাঁরা। চারা রোপণের ৮-১০ দিন পর থেকেই কৃষকেরা ক্ষেতের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। দুই-তিন দিন পর পর জমিতে কীটনাশক ও সেচ দিচ্ছেন তাঁরা।
উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে আগাম শীতকালীন সবজি, যেমন বাঁধাকপি, শিম, বেগুন, শসা ও ঢ্যাঁড়শ বিক্রি হচ্ছে এবং এসবের দামও বেশ চড়া। এই কারণে শীতকালীন আগাম সবজির চাষাবাদ করে লাভবান হওয়ার জন্য কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। ফলে, চড়া বাজারে আরও বেশি লাভের আশায় কৃষকেরা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিশ্রম করছেন।
সৈয়দপুর উপজেলার সবজি চাষের ব্যাপক সুনাম রয়েছে। বোতলাগাড়ী, কামারপুকুর, বাঙালীপুর, কাশিরাম ও খাতামধুপুর ইউনিয়নের কৃষকেরা শীতকালীন সবজি, যেমন মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, টমেটো, পালংশাক, লালশাক, পুঁইশাক ও পেঁয়াজ শীত নামার আগেই বাজারে নিয়ে আসেন। এ ছাড়াও, এসব এলাকার কৃষকরা শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন সবজি ও চারা চাষ করে আশপাশের জেলা ও উপজেলাগুলোতে সরবরাহ করেন।
আরও পড়ুন: ইঁদুরের উপদ্রবে চান্দিনায় শীতের আগাম সবজি নিয়ে কৃষকের শঙ্কা
সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সৈয়দপুরে প্রতি বছর শীতকালীন সবজির ভালো চাষ হয়ে থাকে। এবারের বৃষ্টি কম হওয়ায় চারা ভালো হয়েছে। শীত আসার এখনো সময় বাকি থাকলেও, সবজি চাষিরা আগাম সবজি চাষ শুরু করে দিয়েছেন। এ বছর উপজেলায় ৫০০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন আগাম সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে ১০ থেকে ১১ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।
বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের শ্বাসকান্দর এলাকার কৃষক রেজাউল প্রতি বছর আগাম সবজি চাষ করেন। এবারে তিনি দুই বিঘা জমিতে আগাম ফুলকপি লাগিয়েছেন এবং দিনরাত পরিশ্রম করছেন। ফুলকপি পরিপূর্ণ হতে আরও কিছু দিন সময় লাগবে। তিনি জানান, "আগাম সবজি চাষ কষ্টসাধ্য হলেও দ্বিগুণ লাভ হয়।" এবারে তিনি চার টাকা দরে চারা কিনে রোপণ করেছেন। প্রতি বিঘা জমিতে সবজি চাষের জন্য খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। খরার কারণে ফলন হতে কিছু দেরি হলেও লাভ ভালো হবে বলে জানান এই কৃষক।
খাতামধুপুর ইউনিয়নের খালিশা গ্রামের কৃষক আজম আলী জানান, তিনি প্রত্যেক শীতে তিনবার শীতকালীন সবজি চাষ করেন। চারা থেকে বাজারে তোলার উপযোগী ফুলকপি চাষ করতে দুই মাস সময় লাগে। ইতিমধ্যে ১০ শতক জমির আগাম ফুলকপি ৩৫০০ টাকা মন দরে বিক্রি করেছেন। এখন আরও ২০ শতক জমির ফুলকপি বাজারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তিনি বলেন, "আগাম শীতকালীন সবজি যার যত বেশি আগে বাজারে আসবে, সে তত লাভবান হবে।"
কামারপুকুর ইউনিয়নের বাগডোকরা গ্রামের নারী কৃষক নাজমা বেগমের সাথে কথা হলে তিনি জানান, প্রতি বছর শীতকালীন সবজি গরমের মধ্যে চাষ করে ভালো আয় করেন। তাঁর জমিতে শিম, টমেটো, মরিচ, বেগুন ও ফুলকপি রোপণ করে নিয়মিত পরিচর্যা করছেন। আবহাওয়া ভালো থাকলে শীতকালীন সবজি বাজারে তুলতে পারবেন চলতি মাসের শেষ দিকে।
আরও পড়ুন: নড়াইলে আমন ধানের ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা
বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের বড়দাহ গ্রামের কৃষক আহাদ জানান, এবারে শীত মৌসুমের আগেই প্রায় ৩ বিঘা জমিতে ফুলকপি ও ২ বিঘা জমিতে বাঁধাকপির চারা রোপণ করেছেন। প্রায় ৫০-৬০ দিন পর ফুলকপি ও বাঁধাকপি বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। তিনি বলেন, "বর্তমান সময়ে অনেকেরই কাজ থাকে না, জমিও পড়ে থাকে প্রায় দুই মাস। এ কারণে আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপির চাষাবাদ করেছি। এতে একদিকে যেমন বেশি দামে এসব বিক্রি করতে পারব, অন্যদিকে বেকার থাকা মানুষরাও মজুরি পেয়ে যাচ্ছেন।" তিনি আরও জানান, ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা রোপণ থেকে বিক্রি করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হলেও ২ লাখ টাকারও বেশি লাভের আশা করছেন।
ওই ইউনিয়নের পোড়ার হাট এলাকার কৃষক সামাদ ২ বিঘা জমিতে ফুলকপি, ১ বিঘা জমিতে ঢ্যাঁড়শ, ৫ কাঠা জমিতে বেগুন ও ১ বিঘা জমিতে করলা চাষ করেছেন। তিনি বলেন, "কৃষি অফিসের পরামর্শে গত বছর থেকে আগাম শীতকালীন সবজি চাষাবাদ করে অনেক লাভবান হয়েছি। এবারে যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে, তাহলে ২ লাখ টাকারও বেশি লাভ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, জুলাই মাসের শেষের দিকে তাঁর দেড় বিঘা জমিতে বাঁধাকপির চারা রোপণ করেছিলেন। এতে খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু ওই জমির বাঁধাকপি সেপ্টেম্বরের শেষে বিক্রি করবেন প্রায় ১ লাখ টাকায়।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীমান ভূষণ বলেন, "অনেক কৃষক বেশি লাভের আশায় আগাম সবজি চাষ করেন। এখন এই উপজেলাতে যে সবজি চাষ হচ্ছে, তা রবি মৌসুম শুরুর আগেই করে থাকেন কৃষকরা। সবজি চাষে ফলন ভালো হয়। সাধারণত কার্তিক মাসে শীতকালীন সবজির চাষ শুরু হয়। এবারে ৫০০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন আগাম সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে আবাদকৃত এসব সবজি ইতিমধ্যে বাজারে উঠতে শুরু করেছে।
আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের ব্যস্ততা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন