০৮:০৭ পি.এম
ফিফা বিশ্বকাপ কেবল মাঠের উত্তেজনা নয়, আয়োজক দেশগুলোর জন্য এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করে। ২০২৬ আসর অনুষ্ঠিত হতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে। তাই অনেকের দৃষ্টি এখন পুরোদমে এই বিশ্বকাপে আয়োজকদের আসল আয় কত হবে সেটির দিকে।
ফুটবলকে আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে চলে আসা ৩২ দলের কাঠামো এবার ভেঙে দিয়েছে ফিফা। ফলে ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ হবে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আসর। এতে থাকবে ৪৮টি দল, তিনটি স্বাগতিক দেশ এবং ১৬টি ভেন্যু, যেখানে ৩৯ দিনে রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
কিন্তু এই সম্প্রসারণকে শুধু খেলার উন্নয়ন হিসেবে দেখলে চিত্রটা পুরোপুরি ধরা পড়ে না। কারণ একই সঙ্গে ম্যাচ, দর্শক এবং সম্প্রচারের পরিসর বাড়িয়ে ফুটবল এখন আরও বড় এক বাণিজ্যিক মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
বর্ধিত টুর্নামেন্ট ফরম্যাটের কারণে ফিফা আশা করছে, বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ৮.৯ বিলিয়ন ডলার আয় হবে। এই আয় মূলত আসবে সম্প্রচার স্বত্ব, বিনিয়োগ, টিকিট বিক্রি এবং অতিথি সেবা থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র ১১টি ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজন করবে, আর মেক্সিকো ও কানাডা যথাক্রমে ৩টি এবং ২টি ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজন করবে। মেক্সিকো মোট ১৩টি ম্যাচ আয়োজন করবে, যার মধ্যে থাকবে ১১ জুন মেক্সিকো সিটিতে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে উদ্বোধনী ম্যাচ। এছাড়া সেখানে তিনটি নকআউট পর্বের ম্যাচও অনুষ্ঠিত হবে।
কানাডাও মোট ১৩টি ম্যাচ আয়োজন করবে। স্বাগতিক কানাডার প্রথম ম্যাচ হবে ১২ জুন টরন্টোতে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে। সেখানে তিনটি নকআউট ম্যাচ আয়োজন করা হবে।
বাকি ৭৮টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। এর প্রারম্ভ হবে ১২ জুন লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দল ও প্যারাগুয়ের ম্যাচ দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে শুরু করে সব ম্যাচ আয়োজন করবে। এর মধ্যে সেমিফাইনাল এবং ফাইনালও থাকবে, যা অনুষ্ঠিত হবে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে জমকালো আয়োজনে সিএফএলের প্লেয়ার্স ড্রাফট অনুষ্ঠিত
ফিফার ২০২৩–২৬ বাণিজ্যিক চক্রের প্রাথমিক বাজেটে মোট আয় ধরা হয়েছিল ১১ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু সংস্থাটি ২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে শেষ হওয়া চার বছরের বাণিজ্যিক চক্রে রেকর্ড আয়ের পথে রয়েছে। তারা আশা করছে, এই পুরো সময়ের মোট আয় প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। এর মধ্যে প্রায় ৮.৯ বিলিয়ন ডলার একা যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্ট থেকেই আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পূর্বাভাস আগের চক্রগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ দিয়ে শেষ হওয়া চক্রের তুলনায় আয় প্রায় ৭২ শতাংশ বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং ২০১৫–১৮ সময়ের তুলনায় এটি দ্বিগুণেরও বেশি। আর যেহেতু ফিফা কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে পূর্বাভাসের চেয়ে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় বেশি করেছিল, তাই চূড়ান্ত আয় আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জুরিখ-ভিত্তিক সংস্থাটি আশা করছে, সম্প্রচার স্বত্ব তাদের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে থাকবে এবং এটি প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অবদান রাখবে। বিনিয়োগ থেকে আয় ধরা হয়েছে প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলার, যা নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাড়বে। এর মধ্যে সৌদি আরবের জ্বালানি জায়ান্ট আরামকোর সঙ্গে একটি চুক্তিও রয়েছে।
তবে সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা আয় আসবে টিকিট বিক্রি ও অতিথি সেবা থেকে, যা ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে শুধু ৬৪ ম্যাচ থেকে ১০৪ ম্যাচে টুর্নামেন্ট সম্প্রসারণ নয়, বরং টিকিটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া এবং সেকেন্ডারি টিকিট বাজারের বৃদ্ধিও ভূমিকা রেখেছে।
আরও পড়ুন: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে আরেকটি বিপ্লবের ডাক দেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে
বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত আয় ফিফার পুরো চার বছরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়। এর একটি অংশ সংস্থাটির আর্থিক রিজার্ভ শক্তিশালী করতেও ব্যবহৃত হবে, যা কাতার বিশ্বকাপের পর ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে ২০২৫ সালের শেষে কমে ২.৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ফিফা সাধারণত প্রতিটি চক্রে একটি নির্দিষ্ট উদ্বৃত্ত লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্নয়ন কর্মসূচিকে সমর্থন দেয়।
তিন দেশের বিশ্বকাপ অর্থনৈতিক দিক থেকে আগের টুর্নামেন্টগুলোর তুলনায় একেবারেই ভিন্ন একটি মডেল তৈরি করে। ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো—এই তিন দেশে আয়োজিত হওয়ার কারণে আর্থিক চাপ এককভাবে কোনো একটি দেশের ওপর না পড়ে একাধিক সরকার ও শহরের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। এর ফলে নতুন করে বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনও কমে আসে এবং আয়োজকরা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপরই বেশি নির্ভর করতে পারেন।
এই বহুদেশীয় ফরম্যাট ফিফার বাণিজ্যিক পরিসরও আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ স্পনসর, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান এবং অংশীদাররা একসঙ্গে তিনটি বড় ভোক্তা বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়।
তবে এই মডেলের সঙ্গে জটিলতাও আছে। দল, দর্শক এবং মিডিয়া সংস্থাগুলোকে সীমান্ত পেরিয়ে ভ্রমণ করতে হয়, বিভিন্ন সময় অঞ্চলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয় এবং আগের আসরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়।
আরও পড়ুন: টঙ্গীতে গ্যাস লিকেজের বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৩ সদস্য দগ্ধ
ফিফার দৃষ্টিতে সুবিধাগুলো স্পষ্ট—আরও বেশি ম্যাচ, বড় দর্শকসংখ্যা এবং বেশি বাণিজ্যিক সুযোগ। কিন্তু স্বাগতিক শহরগুলোর জন্য বিষয়টি কিছুটা জটিল। বিশ্বকাপ আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক গতি দিলেও নিরাপত্তা, পরিবহন ও জনসেবা খাতে বড় ব্যয়ও করতে হয়।
চূড়ান্ত অর্থনৈতিক ফলাফল তাই নির্ভর করবে কে তা মূল্যায়ন করছে তার ওপর। ফিফা সবচেয়ে বড় আর্থিক লাভবান প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হোটেল, এয়ারলাইন, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান, স্পনসর এবং অতিথি সেবা ব্যবসাগুলোও লাভবান হবে। কিন্তু সরকার ও স্বাগতিক শহরগুলোর দীর্ঘমেয়াদি লাভ নির্ভর করবে বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও এটি কতটা স্থায়ী উপকার রেখে যায় তার ওপর।
তিন দেশের এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ৮টি ম্যাচ আয়োজন করে সিংহভাগ অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে কানাডা ও মেক্সিকো আয়োজন করবে ১৩টি করে ম্যাচ। এ আসর চলাকালে প্রায় ৬৫ লাখ পর্যটক আয়োজক শহরগুলোতে ভ্রমণ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গড়ে ১২ দিন অবস্থান করা এই দর্শনার্থীরা প্রতিদিন প্রায় ৪১৬ ডলার করে খরচ করবেন—হোটেল, রেস্তোরাঁ ও যাতায়াতে। সব মিলিয়ে তাদের মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই যাবে প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার বিদেশি পর্যটক, যাদের ৬০ শতাংশই প্রথমবারের মতো দেশটি ভ্রমণ করবেন।
কর্মসংস্থানেও বড় প্রভাব পড়বে এই বিশ্বকাপে। আয়োজনের প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮ লাখ ২৪ হাজার পূর্ণকালীন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি আয়োজক শহরেই নতুন কাজ পেয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ।
আরও পড়ুন: হত্যাচেষ্টা মামলায় দিলীপ আগারওয়ালাকে গ্রেপ্তারসহ ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন
কর হিসেবেও তিন দেশ মিলিয়ে আয় হবে প্রায় ৯৪০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস একাই তাদের ৮টি ম্যাচ থেকে প্রায় ৫৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয়ের আশা করছে, যা ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত ‘সুপার বোল’ ইভেন্টের আয়কেও ছাড়িয়ে যাবে। একইভাবে ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ৯টি ম্যাচ থেকে প্রায় ৪০ কোটি ডলার আয় হতে পারে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দিবাগত রাত ১টায় পর্দা উঠবে ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের। আর ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের মাধ্যমে পর্দা নামবে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন