০১:৫৯ পি.এম
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রশ্ন: সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আইনি সহায়তা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চেয়েও এখনো সুনির্দিষ্ট জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে শিশু বয়সে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে দণ্ডিত আরেক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসান জাকি আল-ফারাজ নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে ১৪ বছর বয়সে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ ছিল। অভিযোগের মধ্যে অন্য আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করা এবং তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী হচ্ছে: মার্কিন রাষ্ট্রদূত
এইচআরডব্লিউর সৌদি আরববিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক জোই শে বলেন, আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা অত্যন্ত অমানবিক। তাঁর অভিযোগ, নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় এবং অন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘ ইতিহাস এ ঘটনাকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর ইউসুফ আল-মানাসিফ নামে আরেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে হাসান জাকি আল-ফারাজকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২২ সালে সৌদি আরবের বিশেষ অপরাধ আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাঁর আইনজীবীদের অভিযোগ, কারাগারে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং একটি স্বীকারোক্তিমূলক নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। তাঁকে নির্জন কারাবাসে রাখার অভিযোগও করেছে সংস্থাটি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে সৌদি সরকার। দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি, অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই এবং তাদের আইন ও বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করেই পরিচালিত হয়।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপান সফরে যাচ্ছেন আমজনতার মো. তারেক রহমান
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক হলেন নজরুল ইসলাম আব্দুল বসির ও সুইটি আক্তার। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় বলা হয়, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। গত ১৪ অক্টোবর মক্কায় তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মিডল ইস্ট আইয়ের ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁদের মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
বিচার চলাকালে দুই বাংলাদেশির জন্য আইনজীবী ও দোভাষীর ব্যবস্থা ছিল কি না, তাঁরা আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছিলেন কি না এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কী ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: রাজনৈতিক বিবেচনায় ১,৪১৩টি প্লট বরাদ্দে অনিয়মের তদন্তে আইনি ব্যবস্থা
জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি নথি অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে সৌদি আরবে আটক ছিলেন। ৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেটের হাতে আসা বন্দিদের তালিকায় নজরুল ইসলামকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সাইবার অপরাধ আইনের আওতায় আটকের তথ্য রয়েছে। এর পরদিন ব্যভীচারের অভিযোগে সুইটি আক্তারকে আটক করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম জেদ্দার একটি সংশোধন কেন্দ্রে এবং সুইটি আক্তার জেদ্দার নারী কারাগারে বন্দি ছিলেন। তাঁরা দুজনই আল মাজাল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
কনস্যুলেটের হাতে আসা তালিকায় ৯৭ জন বন্দির অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ছিল। তবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কলামে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়েও ওই তালিকায় কোনো উল্লেখ ছিল না।
কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা যায়, ১৮ অক্টোবর নথিটি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সাইবার অপরাধ আইন বা ব্যভীচারের অভিযোগে সৌদি আরবে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির আগে পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: কৃষিঋণে খেলাপি ১৯ হাজার কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংকে বাড়ছে
কনস্যুলেটের নথিতে বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া বা তা কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা জেদ্দার কনস্যুলেট জেনারেলকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেনি।
এ পরিস্থিতিতে রায়ের অনুলিপি ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চেয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি কূটনৈতিক পত্র, অর্থাৎ ‘নোট ভারবাল’ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট। রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
কনস্যুলেটের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে ৩০৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের কারাদণ্ডের মেয়াদ এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। নথিতে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত তিনটি পৃথক মামলার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে কারাদণ্ডের মেয়াদ ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর।
আরও পড়ুন: ফতুল্লায় কুবি শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলামের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার, স্বামী আটক
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং এ-সংক্রান্ত তথ্যের ঘাটতি বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা, কনস্যুলার সহায়তা ও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে, মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত সাজা কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনি অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তাঁরা অভিযোগ বুঝতে পেরেছিলেন কি না এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, এসব বিষয় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে সৌদি আরবে আরেক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি দুই নাগরিকের মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে তাঁদের মামলার বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য আদালতের রায় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা প্রয়োজন।
এখন নজর রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাবের দিকে। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে দুই বাংলাদেশির মামলায় আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর সমাধান উদ্ভাবনে গবেষণার আহ্বান প্রযুক্তিমন্ত্রীর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন