১০:২০ পি.এম
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কূটনৈতিক ভুল, রাজনৈতিক ঔদ্ধত্য কিংবা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ভুল হিসাব শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককেই নয়, সমগ্র এশিয়ার মানচিত্রসহ কৌশলগত ভারসাম্যকেও নাড়া দিতে পারে। তাই বাংলাদেশের প্রতি যেকোনো আগ্রাসী বা একতরফা নীতির সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরে ভারতের একান্ত অনুগত রাজনৈতিক দলের প্রধান শেখ হাসিনা সরকারের ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানের পর দুই দেশের সম্পর্ক শীতলীকরন প্রক্রিয়ায় নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।
অতীতের একমুখী সম্পর্কের পরিবর্তে হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডঃ ইউনুস এর সময় থেকে বর্তমান নির্বাচিত নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ এখন বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির পথে হাঁটছে। এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিক কূটনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করার পরিবর্তে এই পরিবর্তনকে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি অংশ ক্রমেই সন্দেহ ও অস্বস্তির দৃষ্টিতে দেখছে। বিশেষ করে সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ক্ষমতায় আসা বিজেপির শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান সেই মনোভাবকে আরও তীব্র থেকে তীব্রতর করেছে বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা।
বাংলাদেশকে নতজানু পররাষ্ট্রনীতিতে অধীনস্থ করে রাখার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দীর্ঘদিনের সীমান্ত হত্যা, সীমান্তে উত্তেজনা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি নতুন করে অবৈধ "পুশ-ইন" নিয়ে উদ্বেগ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মোদি সরকারের উগ্র হিন্দুত্ববাদী আচরণের রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন প্রদেশে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষী, বিশেষত মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক এবং তাদের বাংলাদেশী বলে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা সহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার অব্যাহত প্রচেষ্টা বাংলাদেশে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। যদি এ ধরনের নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা অব্যাহত থাকে, তবে তা শুধু মানবিক সংকটই নয়, দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাসকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ কারণে সম্পর্কের শীতলতা থেকে উষ্ণ হওয়ার পরিবর্তে শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় তা হিমাগারে গিয়ে ঠেকতে পারে। এমনকি এমন ক্রমাগত উস্কানির ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাও অস্বাভাবিক নয়- যার পরিণতি আন্দাজ করা ভুলও হতে পারে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের রুদ্ধশ্বাস ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসানের পর থেকেই নতুন বাংলাদেশ চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও আরব বিশ্ব সহ পশ্চিমা বিশ্বের তথা ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে ও বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা সম্প্রসারণ করতে চলেছে, তবে সেটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির অংশ। কোনো রাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে—এটাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। পূর্বের ধ্যান-ধারণা বজায় রেখে সেটাকে বা সেই সিদ্ধান্তকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চোখে দেখা কিংবা অভ্যাসগতভাবে পূর্বের মতো চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রভাবিত করার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কারও জন্যই লাভজনক হবে না বরং তা নিজেদের জন্যই বুমেরাং হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারতের নিজস্ব কৌশলগত বাস্তবতা - যে দেশের প্রায় ২৮টি অঙ্গরাজ্যে ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অনেকটিতেই দীর্ঘদিন থেকে স্বাধীনতা লাভের চেষ্টা করে যাচ্ছে তাদের অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীগুলো। বিশাল ভৌগোলিক বিস্তার, একাধিক ক্ষমতাধর দেশে সঙ্গে সংবেদনশীল সীমান্ত, বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আধিপত্যবাদী মনোভাবের কারণে তৈরি হওয়া জটিল সম্পর্ক—সব মিলিয়ে ভারতের সামনে এমনিতেই বহুস্তরীয় নিরাপত্তার হিসাব রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে ভুল ক্রমেও ক্ষদ্রাতি ক্ষুদ্র কোন ভুল, সংঘাত বা সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তা ভারতের জন্যও অপরিণামদর্শী ও অকল্পনীয় জটিল কৌশলগত চাপ তৈরি করতে পারে। একই সময়ে একাধিক নিরাপত্তা ফ্রন্টে চাপ মোকাবিলা করা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই অত্যন্ত কঠিন। যে ভুলটি দীর্ঘদিন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের উপর করে এসেছে । বিশাল সামরিক শক্তি, বিশ্বে একাধিপত্যের ভীতিকর ধারণা সবকিছু মিলিয়েই ইরানকে সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে ভুল হিসেব করে সহজেই পর্যদুস্তু করতে চেয়েছিল-এমনকি শাসন ব্যবস্থা সহ তাদের মেরুদন্ডও ভেঙে দিতে চেয়েছিল - পরিণতি কি? বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যের স্থানে বহু মেরু ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে এখন গোটা বিশ্ব, এমনকি রাজনৈতিকভাবে উভয় দেশ তাদের নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে কোণঠাসা হয়ে ভবিষ্যৎ ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
এ কারণেই নিজেদের অসংখ্য দুর্বলতা, সীমান্ত জটিলতা, পূর্ব-পশ্চিমে শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দুই পরাশক্তির সাথে ক্রমাগত সীমান্ত উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোতে স্বাধীনতার বিস্ফোরণের চাপ থাকার পরেও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের কোন ধরনের শক্তি প্রদর্শনের ভুল রাজনীতি কিংবা সামরিক চাপের কৌশলকে সহজ সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, অর্থনৈতিক করিডোর, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশ আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও ভূ-রাজনৈতিকভাবে বিশ্বের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, বিশ্ব পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোন ধরনের ভুল এর পরিবর্তে তাদের নিজেদের পরাশক্তির শত্রুতা ভুলে একসাথে হতে সময় লাগবে না। এ কারণে একটি ছোট্ট ভুল সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া কখন যে প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়ে যাবে, তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় মহারাষ্ট্র হিসেবে খ্যাত ভারতকে এত বড় শক্তি হিসেবে দেখতে চায় না বিশ্বের পরাশক্তি গুলো। বিশ্ব শাসনের সুপার পাওয়ার হওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার পরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাশিয়া, রাশিয়া থেকে চীন এমনকি পশ্চিমা বিশ্বের মার্কিন মিত্র সংশ্লিষ্ট দেশগুলোও ভারতের এই বিশাল ভূখণ্ডকে নিয়ে কৌশলগত রাজনীতিতে একমত। অর্থাৎ বিশ্ব পরাশক্তির রাজনীতিতে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ পরাশক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে অসংখ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ অবস্থায় থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতি রাজনীতির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একই মেরুতে এসে যুক্ত হয়- এটি ভারতের নীতি নির্ধারণী কৌশলবিদ তথা রাজনীতিবিদদের অনুধাবন করা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ আজ আর অতীতের সেই অবস্থানে নেই, যেখানে তার কৌশলগত গুরুত্বকে উপেক্ষা করা সম্ভব। বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক, আঞ্চলিক সংযোগ এবং অর্থনৈতিক করিডোরের কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া বাংলাদেশ এখন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বাংলাদেশের প্রতি যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ শুধু ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের মহা সংকট সৃষ্টি করবে না; বরং সমগ্র দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত মানচিত্র ও পরিবেশকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, শক্তির অহংকার অনেক সময় রাষ্ট্রকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে যার মূল্য বহু বছর ধরে দিতে হয়। তাই আজ প্রয়োজন সংঘাতের ভাষা নয়, বাস্তবতার ভাষা বোঝা। বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে সম্মান করা এবং পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাই দুই দেশের জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে। অন্যথায় একটি ক্ষুদ্র ভুল হিসাব কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, সমগ্র এশিয়ার মানচিত্রসহ ভূরাজনীতির গতিপথকেও অপ্রত্যাশিতভাবে বদলে দিতে পারে - এমন কথা আজকের দিনে বলা মনে হয় অমূলক হবে না।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন