০২:২০ এম
বিএনপি সরকারের উদ্যোগে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক দ্বারা দারিদ্র্য নিরসন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকরী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের যৌথ বার্ষিক আলোচনার দ্বিপক্ষীয় সভায় এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। বৈঠকে সরকারের ঘোষিত এই দুই কর্মসূচির প্রশংসা করেন উন্নয়ন সহযোগীরা। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর আগে সকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও ব্যাংক অব আমেরিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি নতুন অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকার এসব চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আরও পড়ুন: দেশের প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকার নিশ্চিতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ: রাষ্ট্রপতি
তিনি আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য পাঁচ শতাংশ কমবে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) এই ধরনের কর্মসূচিকে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে দেখছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিতুমীর বলেন, অতীতের সরকারের সময় তালিকায় ত্রুটি থাকায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ফ্যামিলি ও ফার্মার্স কার্ডকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক মনে করে, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে জনজীবনে স্বস্তি ফিরবে।
ড. তিতুমীর বলেন, অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রধান দুর্বলতা ছিল উপকারভোগী বাছাইয়ে ত্রুটি। যাদের সহায়তা পাওয়ার কথা, তাদের অনেকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হননি। অন্যদিকে, যাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা নয়, তারাও তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এই সমস্যা সমাধানে সরকার ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো যায়।
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গ তুলে ধরে অর্থ উপদেষ্টা জানান, অতীতে কর ফাঁকি, কর অব্যাহতি ও পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতির কারণে রাজস্ব বাড়েনি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছে। ফলে গত ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আয়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের প্রক্ষেপণে চার দশমিক সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা উল্লেখ রয়েছে। বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তবিক ফল প্রমাণে কাজ করছে।
আরও পড়ুন: ঢাকা-সৌদি রুটে ১০৭ ফ্লাইট বাতিল, ১৬ হাজার ৬২০ যাত্রী ভোগান্তিতে
ব্যাংকিং খাত সংস্কার নিয়ে তিতুমীর জানান, অতীতে ব্যাংক লুটপাটের ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হতে পারে। তবে ইতিমধ্যে সংস্কারের ফলে ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে।
তিনি বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফিরে এসেছে এবং গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে তারা টাকা তুলতে পারছেন। অন্যান্য সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের বিষয়ে ‘রেজল্যুশন অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমছে, যা ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়। অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, সরকার ম্যানুফ্যাকচারিং হাব ও এক্সপোর্ট গেটওয়ে গড়ে তোলার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব চুক্তি করতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধিদল বৈঠক করে চুক্তির বিষয়গুলো চূড়ান্ত করবে। মূল নীতিগত বিষয়গুলোতে কোনো সমস্যা না থাকলেও, আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলো কীভাবে চূড়ান্ত রূপ পাবে, তা যৌথ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
গতকাল ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দিনের শুরুতে সিরিকিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ব্যাংক অব আমেরিকা, গুগল, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও মুডিসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি, ঋণসংক্রান্ত বিষয়, আর্থিক খাতের সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
আরও পড়ুন: সেতুমন্ত্রী: ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
বৈঠক প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা পুনর্ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন কাঠামো চুক্তি তৈরি করা হচ্ছে।
মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে টপকালো বাংলাদেশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ এবং আগামী দুই অর্থবছর পর্যন্ত এই অবস্থান ধরে রাখতে পারে ঢাকা। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে আবারও শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করবে ভারত এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ এই ব্যবধান আরও বাড়াবে দেশটি।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ ডেটাবেজ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বর্তমান মার্কিন ডলারের মূল্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৮৮৬ ডলারে, যেখানে ভারতের ক্ষেত্রে তা দুই হাজার ৭৫০ ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান মাত্র ১৩৬ ডলার।
আরও পড়ুন: ভারত থেকে ১৮ নতুন রেলকোচ এসেছে, আসবে আরো ১৮২টি
অর্থনীতির আকার প্রায় আট গুণ বড় হওয়া সত্ত্বেও ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের পেছনেই থাকবে ভারত। তবে আইএমএফের প্রক্ষেপণ বলছে, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে দাঁড়াবে তিন হাজার ৬৬২ ডলারে, যা বাংলাদেশের তিন হাজার ৩৩৪ ডলারকে ছাড়িয়ে যাবে। ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ এই ব্যবধান আরো বেড়ে প্রায় ৭০৯ ডলারে পৌঁছাবে; তখন ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে চার হাজার ৩৮৯ ডলার এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা দাঁড়াবে তিন হাজার ৬৮০ ডলারে।
এর আগে ২০১৮ সাল থেকে টানা সাত বছর ভারতের চেয়ে বেশি মাথাপিছু জিডিপি বজায় রেখেছিল বাংলাদেশ। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে বাংলাদেশেকে পেছনে ফেলেছিল ভারত।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন