০৭:৫৩ এম
জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের (বিএলএস) গত ৭ আগস্ট প্রকাশিত নতুন তথ্য অনুযায়ী, মাসটিতে দেশটির অর্থনীতি অপ্রত্যাশিতভাবে ২৩ হাজার কর্মসংস্থান হারিয়েছে। একই সময়ে শ্রমশক্তি থেকে আরও অনেক মানুষ বেরিয়ে যাওয়ায় বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে।
জুলাই মাসের কর্মসংস্থানের চিত্র অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দুর্বল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতিবিদরা গত মাসে ৯৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
এর আগে জুন মাসে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সংখ্যা ৫৭ হাজার থেকে সংশোধন করে মাত্র ২০ হাজার করা হয়েছে। মে মাসের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিও সংশোধিত হয়ে ১২৯ হাজার থেকে প্রায় অর্ধেক কমে ৬৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হারও গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাসের আগুন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে
তবে এক মাসের তথ্য দিয়ে শ্রমবাজারের পুরো চিত্র বোঝা যায় না। বিশেষ করে মহামারির পরের সময় এবং বর্তমানের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রাথমিক অর্থনৈতিক তথ্য পরে বড় ধরনের সংশোধনের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। তবে জুলাই মাসের তথ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক মাসগুলোর চিত্র মিলিয়ে দেখতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার যে মন্থর ও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে, তা স্পষ্ট হচ্ছে।
নেভি ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতিবিদ হেদার লং সিএনএনকে বলেন, এটি একটি হতাশাজনক প্রতিবেদন, এবং এতে শ্রমবাজার আবারও স্থবির হয়ে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তার মতে, গত তিন মাসে গড়ে মাত্র ২০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা যে কোনো বিবেচনায় খুবই দুর্বল।
শুক্রবারের প্রতিবেদনটি আরও কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আরও সতর্ক হয়ে উঠছে। বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার, তেলের উচ্চমূল্য, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধসহ নানা প্রতিকূলতার মুখে নিয়োগকারীরা নতুন কর্মী নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজার এখন ‘কম নিয়োগ, কম ছাঁটাই’ প্রবণতার মধ্যে আটকে আছে। ফলে নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য কার্যত সুযোগ কমে যাচ্ছে। জিপরিক্রুটারের শ্রম অর্থনীতিবিদ নিকোল বাচাউড বলেন, মূল্য পরিস্থিতির অস্থিরতা নিয়োগকারীদের মধ্যে দ্বিধা বাড়াতে পারে। চাকরির সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় আরও বেশি কর্মী পুরোপুরি শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
জুলাইয়ে যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, তার বড় একটি অংশ এসেছে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা খাত থেকে। গত মাসে এই খাতে আনুমানিক ২২ হাজার ৬০০টি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
ওয়েলস ফার্গোর প্রধান অর্থনীতিবিদ টম পোরচেলি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা খাত যেন চাকরি তৈরির একটি যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যসেবা বাদ দিলে বেসরকারি খাতে জুলাই মাসে ৩০ হাজার এবং চক্রীয় নিয়োগের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭ হাজার।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি নির্মাণ ও উৎপাদন খাতের বিভিন্ন অংশেও কর্মসংস্থান বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ ও ডেটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তারের কারণে এসব খাত লাভবান হয়েছে। পেশাগত ও ব্যবসায়িক পরিষেবা খাতে ১৮ হাজার এবং প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য খাতে ১১ হাজার নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে।
তবে স্থানীয় সরকার, বিশেষ করে স্থানীয় স্কুল এবং অবসর ও আতিথেয়তা খাতে বড় ধরনের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় এসব অর্জন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ, এলএফটি-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে অবসর ও আতিথেয়তা খাতে কর্মসংস্থান বাড়ার প্রত্যাশা ছিল। কারণ, দেশজুড়ে স্পোর্টস বার ও আয়োজক শহরগুলোর হোটেলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু বিএলএসের তথ্যানুসারে, জুন ও জুলাই মাসে এই খাতে যথাক্রমে ৪৩ হাজার ও ৪০ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে।
পিএনসি ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ গাস ফশার বলেন, বিশ্বকাপের সময়েও গত দুই মাসে অবসর ও আতিথেয়তা খাতে ৮৩ হাজার চাকরি কমে যাওয়ার বিষয়টি বিশ্বাস করা কঠিন। তার মতে, এটি একটি অত্যন্ত মৌসুমি খাত হওয়ায় মৌসুমি সমন্বয়ের হিসাবেও অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে।
মৌসুমি সমন্বয়ের উদ্দেশ্য হলো বছরের বিভিন্ন সময়ের স্বাভাবিক ওঠানামা বাদ দিয়ে কর্মসংস্থানের প্রকৃত প্রবণতা বোঝা। কিন্তু কোনো খাতে ঐতিহাসিক নিয়মের বাইরে নিয়োগ হলে সেই হিসাব চাকরি কমে যাওয়ার ছবিটা দেখাতে পারে।
গ্লেনমেডের বিনিয়োগ কৌশল ও গবেষণা বিভাগের প্রধান জেসন প্রাইড বলেন, স্থানীয় সরকার খাতে ৫৭ হাজার কর্মসংস্থান কমার মধ্যে স্থানীয় স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলোতেই ৪৯ হাজার ৬০০টি চাকরি কমেছে। এটিকে প্রকৃত কর্মসংস্থান হ্রাসের চেয়ে মৌসুমি সমন্বয়ের কৃত্রিম ফল হিসেবে দেখা যেতে পারে। গ্রীষ্মে স্কুল ডিস্ট্রিক্টের কর্মীদের ছাঁটাই ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি হওয়ায় প্রায় ৫০ হাজার কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলে এসব বিকৃতি সাধারণত দূর হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম
এডিপির প্রধান অর্থনীতিবিদ নেলা রিচার্ডসনও বলেছেন, মৌসুমি সমন্বয়ের এই অস্বাভাবিকতার পাশাপাশি নিয়োগের পদ্ধতিতে পরিবর্তন শ্রমবাজারের তথ্যকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেমে থেমে চলছে।
এতে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অভিবাসনের গতি কমে যাওয়ার মতো কাঠামোগত পরিবর্তনও রয়েছে। ফলে আগের মতো বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার প্রয়োজনও অর্থনীতিতে কমে এসেছে।
তবে মৌসুমি হিসাবের সম্ভাব্য অস্বাভাবিকতা বিবেচনায় নিলেও স্বাস্থ্যসেবা ছাড়া অধিকাংশ খাতেই নিয়োগ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন হেদার লং।
বর্তমান শ্রমবাজার সবার জন্য সমান সুবিধাজনক নয়। জুলাইয়ে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিও থমকে গেছে। জুনের তুলনায় গড় ঘণ্টাপ্রতি আয় মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির হার কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
আরও পড়ুন: সাঈদীর মামলার বাদীকে দাফনে বাধা দেয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন জামায়াতের
অন্যদিকে, সর্বশেষ ভোক্তা মূল্য সূচকে মুদ্রাস্ফীতি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে ছিল। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি থাকায় শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। হেদার লং বলেন, আমেরিকানদের বর্তমান আয় সংকট বুঝতে অর্থনীতিতে পিএইচডি করার প্রয়োজন নেই। তার মতে, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে অনেক পরিবারকে ব্যয় কমাতে হতে পারে।
তবে দুর্বল মজুরি বৃদ্ধি ফেডারেল রিজার্ভের জন্য কিছুটা স্বস্তির কারণ হতে পারে। ওয়েলস ফার্গোর পোরচেলির মতে, বর্তমান শ্রমবাজার চাহিদা-চালিত মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে তুলছে না। আর যেহেতু বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় একটি অংশ সরবরাহ-পক্ষ থেকে আসছে, তাই ফেড সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার কিছুটা বেড়েছে এবং ট্রেজারি ইল্ড কমেছে। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরে ফেডের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা আগের দিনের ৫৫ শতাংশ থেকে কমে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে সিএমই ফেডওয়াচের তথ্যে দেখা গেছে।
আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মুদ্রাস্ফীতির তথ্য প্রকাশিত হবে। বুধবার প্রকাশিত হবে ভোক্তা মূল্য সূচক। ইওয়াই-পারথেননের অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, গ্যাসের দাম জুনের তুলনায় কম থাকায় মুদ্রাস্ফীতি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে, যা আগের ৩ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে সামান্য কম।
আরও পড়ুন: বিয়ের আশ্বাসে তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ, এসআইকে প্রত্যাহার
তবে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ধীর গতি এবং চলমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মার্কিন পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ কমানোর জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন হেদার লং।
তিনি বলেন, অনেক আমেরিকান এখন নিজেদের আটকে পড়া মনে করছেন। বন্ধকী ঋণের সুদের হার প্রায় ৭ শতাংশ থাকায় তারা সহজে বাড়ি বদলাতে পারছেন না। আবার নিয়োগ প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়ায় নতুন চাকরিও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষ গাড়ি ও মোবাইল ফোনও আগের চেয়ে দীর্ঘ সময় ব্যবহার করছে। এটি এক ধরনের স্থবিরতার অনুভূতি তৈরি করছে-যা মানুষ গতিশীল আমেরিকান অর্থনীতির ক্ষেত্রে দেখতে চায় না।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। তাই দেশটির অর্থনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন হলে তার প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশের অর্থনীতিতে পড়া স্বাভাবিক। বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার প্রভাব দুইভাবে পড়তে পারে। একদিকে, মার্কিন শ্রমবাজার দুর্বল হলে মানুষের আয় এবং ভোগ ব্যয় কমতে পারে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি চাহিদাও কমবে। ফলে রফতানিনির্ভর দেশগুলো চাপের সম্মুখীন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দফতরের অটেক্সার তথ্য বলছে, মন্দাভাব চলছে মার্কিন পোশাকের বাজারে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্ববাজার থেকে পোশাক আমদানি কমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বিশ্ববাজার থেকে ৩ হাজার ৫০৮ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পোশাক আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এ আমদানি কমেছে ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষ দেশটিতে ব্যয় সংকোচন নীতির প্রভাব পড়েছে পোশাকের বাজারেও।
ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশও। গত জুন পর্যন্ত ছয় মাসে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের রফতানি কমেছে পৌনে ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪২৫ কোটি ২৪ লাখ ডলারের পোশাক রফতানি হলেও চলতি বছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ৪০০ কোটি ৭৮ লাখ ডলারে।
অন্যদিকে, শ্রমবাজার দুর্বল হওয়ায় অর্থনীতিতে তারল্য বাড়াতে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে ডলারের মান দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি উদীয়মান বাজারগুলোতে পুঁজি প্রবাহ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কমতে পারে বৈদেশিক ঋণের ব্যয়।
তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থানের এই প্রতিবেদন একদিকে যেমন বৈশ্বিক চাহিদা নিয়ে সতর্কবার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে আর্থিক বাজারে স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন