বৃহস্পতিবার, ৫ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং
০৯:৫৫ পি.এম
চীন সাগরে চিনা স্যাটেলাইটের নজরদারির আওতায় মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি প্রকাশিত চিনা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ (CVN-71) বিমানবাহী রণতরী দক্ষিণ চীন সাগর অতিক্রম করছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় যৌথ সামরিক মহড়া শেষে রণতরীটি ইরান উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিকল্পনা অনুসারে চলতি নভেম্বরের শেষের দিকে ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ ওবায়দুল্লাহ জলসীমা অতিক্রম করে আরব সাগরে পৌঁছাতে পারে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, রুজভেল্ট কি পূর্বে সেখানে মোতায়েন থাকা ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’কে দায়িত্ব হস্তান্তর করে ফিরে আসবে, নাকি ইতোমধ্যে অবস্থানরত ‘ইউএসএস জর্জ এইচ.ডব্লিউ বুশ’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনটি মার্কিন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার একযোগে ইরানি সীমান্তে শক্তিপ্রদর্শন শুরু করবে?
স্যাটেলাইট ও বিমান চলাচলের তথ্য
৪ নভেম্বর ‘মিজারভিশন’ নামের চিনা একটি বাণিজ্যিক মহাকাশ সংস্থার স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ইন্দোনেশিয়ার নাটুনা দ্বীপপুঞ্জের উত্তরে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট এবং এর সহযোগী যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস চোসিন’-এর অবস্থান। তবে ছবিগুলোর বিভ্রান্তি এবং মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তার গোপনীয়তার কারণে যুদ্ধজাহাজ বহরের সব তথ্য জনসমক্ষে আসেনি।
এছাড়া, এমএইচ-৬০এস সি হক এবং সিএমভি-২২বি অসপ্রে যুদ্ধবিমানের গতিপথ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বহরটি মালাক্কা প্রণালীর দিকে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে।
কেন ৩টি রণতরীর উপস্থিতি এত গুরুত্বপূর্ণ?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশাল বিমানবাহী রণতরী যদি একই সঙ্গে আরব সাগরে অবস্থান নেয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ভারসাম্যের পরিবর্তন আনবে। এর মূল কারণগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
ইরানের ওপর নজরদারি ও প্রতিরোধ: হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষার অজুহাতে ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা প্রতিহত করতে বিপুল পরিমাণ ফাইটার জেট এবং নজরদারি এভিয়েশন মোতায়েনের সুযোগ তৈরি হবে।
আম্ফিবিয়াস ফোর্সের সমন্বয়: মার্কিন ৯,০০০ থেকে ১০,০০০ সৈন্য এবং '১৩তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট' বহরে থাকায় যেকোনো সামুদ্রিক সংকটে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পথ উন্মুক্ত হবে।
কূটনৈতিক চুক্তি ও হুমকি: যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক আলোচনার মধ্যবর্তী সময়ে মার্কিন নেতৃত্বের সরাসরি সামরিক ব্যবস্থার যে হুমকি ছিল, এই তিনটি ক্যারিয়ারের উপস্থিতি সেই কৌশলগত চাপকে বাড়িয়ে দেবে।
প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের সঙ্গে মার্কিন সমীকরণ
যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের বড় নৌ-বহর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরাচ্ছে, ঠিক তখনই প্রশান্ত মহাসাগরে চিনা নৌবাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। চিনা বিমানবাহী রণতরী 'লিয়াওনিং' ইতিমধ্যেই ফিলিপাইন ও জাপানের পার্শ্ববর্তী জলসীমায় টহল দিচ্ছে এবং তাদের নতুন বিমানবাহী জাহাজ 'ফুজিয়ান' ও 'শানডং' সাগরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
আমেরিকার পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে একটি অতিরিক্ত বিমানবাহী রণতরী দীর্ঘমেয়াদে রাখা মানে প্রশান্ত মহাসাগরে চিনের মুখোমুখি হওয়ার সক্ষমতা সাময়িকভাবে কমে যাওয়া।
কৌশলগত ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ
যদিও ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট একটি পারমাণবিক চালিত বিমানবাহী রণতরী, তবে এর সাথে থাকা প্রচলিত শক্তির চালিত রণতরীসমূহ এবং হাজার হাজার সৈন্যের জন্য রসদ সরবরাহের চ্যালেঞ্জ থেকেই যায়। সম্প্রতি এটি চিনের নজর এড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজ 'এইচএমএএস স্টালওয়ার্ট'-এর মাধ্যমে মধ্য-সমুদ্রে রিফুয়েলিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি রণতরী দীর্ঘমেয়াদে মোতায়েন থাকবে, নাকি নতুনটি এসে পুরনো রণতরীকে জাপানের প্রধান ঘাঁটিতে ফেরত পাঠাবে—তা আগামী কয়েক সপ্তাহের আন্তর্জাতিক সামরিক বিন্যাসের ওপর নির্ভর করছে। তবে সার্বিকভাবে, মার্কিন এই নতুন শক্তিপ্রদর্শন হরমুজ প্রণালী ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ