০৬:৪৯ পি.এম
সুনামগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত জেলা। এখানে দুর্গম এলাকার কারণে বর্ষায় নাও, হেমন্তে পা। অর্থাৎ বর্ষাকালে নৌকা আর হেমন্তে পায়ে হেঁটে চলাচল করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। তাই শিক্ষায় পিছিয়ে আছে হাওরপাড়ের জনগোষ্ঠী।
কোনো রকম পাঠশালা শেষ করে অধিকাংশ মানুষ রাজধানীমুখী হন। শিশু শ্রম ও বাল্য বিয়ের মতো বিভিন্ন অপরাধের খপ্পরে পড়তে হয় এসব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে প্রয়োজন জীবনমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষা।
জেলার দিরাই, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা এ ৫ উপজেলা একদম দুর্গম এলাকায় অবস্থিত।
আরও পড়ুন: উখিয়ায় ১৫ ঘণ্টা পরও জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এই সকল উপজেলার মানুষদের বর্ষাকালে বৈরী আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে তাদের সন্তানদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠান। হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ অঞ্চল দুর্গম হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ক্ষেত্রে ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ না থাকায় অস্বস্তিতে আছেন হাওরপাড়ের মানুষ।
এই বছরের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সুনামগঞ্জের দুর্গম হাওরাঞ্চলের একাধিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। তিনি শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি দূর করতে বিষয়ভিত্তিক মৌলিক পাঠদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রতিমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষা সেবা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
হাওর এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম ভুইয়া বলেন, বর্ষাকালে সকল রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেলে গোটা হাওরাঞ্চল নৌকানির্ভর হয়ে পড়ে। দুর্গম হাওরের প্রত্যেকটি গ্রাম যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। এই সময়ে পানিবন্দী মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজ করতে নৌকাযোগে যত্রতত্র যাতায়াত করেন।
অন্যদিকে, প্রতিকূল আবহাওয়ার ফলে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। বর্ষা মৌসুমে ঝড়-বৃষ্টি, আফাল, বজ্রপাত ও নৌকাডুবির মতো ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে হাওর ও নদী পাড়ি দিয়ে আসার জন্য বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী নৌকায় আসা-যাওয়া করেন। ফলে পাঠ গ্রহণে অনীহা, শিখন ঘাটতি ও ঝরে পড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের ঝুঁকিমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য নিরাপদ নৌযানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেন সচেতন মানুষগুলো।
আরও পড়ুন: তাহিরপুরে প্রবাসীর স্ত্রী ও পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে উধাও নাজমুল, পরিবার উদ্বিগ্ন
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে মোট ১ হাজার ৪৭৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ১২৯টি, দোয়ারাবাজারে ১০৪টি, বিশ্বম্ভরপুরে ৭৮টি, ছাতকে ১৮৫টি, তাহিরপুরে ১৩৪টি, জামালগঞ্জে ১২৬টি, ধর্মপাশায় ১১০টি, শাল্লায় ১০৫টি, দিরাইয়ে ১৬৩টি, জগন্নাথপুরে ১৫৮টি, শান্তিগঞ্জে ৯৭টি ও মধ্যনগরে ৮৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সুতরাং, জেলার বেশির ভাগ বিদ্যালয়ই দুর্গম এলাকায় অবস্থিত।
মধ্যনগর উপজেলার রংচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ আমজোড়া নূরুনাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তাহিরপুর উপজেলার জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাহেবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামালগঞ্জ উপজেলার হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফেনারবাঁক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শাল্লা উপজেলার শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইয়ারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং যাত্রাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ জেলার বেশির ভাগ বিদ্যালয় বর্ষায় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে পতিত হয়।
শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের ভেড়াডহর হাওর এলাকায় মির্জাকান্দা নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মির্জাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান। সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৬ এবং ৯৪ জন।
হাওরের মাঝে খণ্ড, খণ্ড পাড়া মিলে মির্জাপুর গ্রাম। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এসব গ্রামের সকল ছাত্র-ছাত্রী বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের। তারা নিজেরাই নৌকা নিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করে। ঝড়-বৃষ্টি থাকলে উপস্থিতি কমে যায় বলে স্থানীয় শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগ।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে ‘দাদা ভাই বাহিনী’র বন্দুকযুদ্ধে ৫ জেলে উদ্ধার
বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী নতুন হাটির সাইদুর রহমানের তিন ছেলেমেয়ে রয়েছে। ছোট ছেলে আইজুল প্রথম শ্রেণির ছাত্র। একমাত্র মেয়ে রিয়া মনি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। বড় ছেলে কোনো রকম প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করলেও বিভিন্ন বাধ্য-বাধকতায় তার শিক্ষাজীবন আর এগোয়নি।
স্কুলে যাওয়ার পথে বাড়ির পার্শ্ববর্তী প্রায় ৩০০ ফুট রাস্তা বর্তমানে চলাচলের অনুপযোগী। সাইদুর রহমান বলেন, কেউ পানি দিয়ে যায়। কেউ আবার নৌকা দিয়ে স্কুলে আসতে-যেতে চেষ্টা করেন। সরকারের পক্ষ থেকে একটি নৌকার ব্যবস্থা করলে ছাত্র-ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতে খুব উপকার হবে।
মির্জাকান্দা নতুন হাটির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চমক কান্তি তালুকদার বাসসকে বলেন, আমরা একেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। চারপাশে শুধু পানি আর পানি। ছাত্র-ছাত্রীরা নৌকায় করে স্কুলে এসে থাকে। আবহাওয়া খারাপ হলে ছাত্ররা তেমন আসেন না।
লামাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ে। এখানে ১৪২ জন ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নরত।
আরও পড়ুন: কুমিল্লার আদালতে মহিলা আ.লীগ নেত্রীর বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ, আটক
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসরিন আক্তারের ভাষ্য, আবহাওয়া খারাপ থাকলে অনেক ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে আসতে পারেন না। নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে নাসরিন আক্তার বলেন, ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের নৌকা বেয়ে ও সাঁকো পার হয়ে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে।
তিনি বলেন, ঝড়-বৃষ্টিসহ নানা দুর্যোগের মুখোমুখী তাদের হতে হয়। সরকারিভাবে নৌকার ব্যবস্থা করতে পারলে ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে।
লামাগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরিফ ও ইসরাত জাহান নোহা জানিয়েছে, তাদেরকে নৌকা বেয়ে ও সাঁকো পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। অনেকের নৌকা নেই। দিন খারাপ থাকলে তারা আসেন না। বৃষ্টির কারণে বইপত্র ও কাপড়চোপড় ভিজে যায়। ভেজা শরীরে ক্লাস করতে হয় বলে জানান তারা।
রংচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহেন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, শিশু ছাত্র-ছাত্রীরা প্রায়ই ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। তাদের স্কুলে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হলো নৌকা। হাওরপাড়ের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সরকারি বিশেষ উদ্যোগ।
আরও পড়ুন: কালীগঞ্জে ডোপ টেস্টে মাদক সেবনের প্রমাণ, ৫ জনের কারাদণ্ড
সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, প্রকৃতিনির্ভর জীবন-জীবিকা বাদ দিলে সামনে চলে আসে হাওরের দুর্যোগপূর্ণ শিক্ষা পরিস্থিতি। বর্ষায় প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝে নৌকা বেয়ে বিদ্যালয়ে যায় শিশুরা। নৌকাডুবি, ঝড়-ঝাপ্টা ও বজ্রপাতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে বর্ষা মৌসুমের মাসছয়েক বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি নিরাপদ নৌযানের ব্যবস্থা করা জরুরি। না হলে দিন দিন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে শিক্ষার্থীরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস বাসসকে বলেন, সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্যের উদ্যোগে ১৬ টি নৌকা প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী তাহিরপুরের বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন।
তিনি বলেছেন, হাওর এলাকার শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে উনাকে অবহিত করা হয়েছে। বর্ষাকালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ঝুকিপূর্ণ যাতায়াতের বিষয়টি তিনি জানেন। আশা করি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকেরা বিএনপির রাজনীতিতে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন