১০:৫১ এম
দেশে সার উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনটি সার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মধ্যে ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, চট্টগ্রামে বছরে ৪ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি এবং নরসিংদীর পলাশে বছরে ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) উৎপাদন ক্ষমতার কারখানা স্থাপন করা হবে।
শিল্পমন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশীয় সার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমবে। কৃষি খাতে সরবরাহ জোরদার করার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সংস্থাটি আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বিসিআইসি জানিয়েছে, তাদের অধীনে মোট সাতটি সার কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া এবং দুটি নন-ইউরিয়া কারখানা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। ওই অর্থবছরে বিসিআইসির কারখানাগুলোতে ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদিত হয়েছে, যা মোট চাহিদার ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
আরও পড়ুন: বিজ্ঞান ভিত্তিক আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে কৃষকের চাষ পদ্ধতি
একই অর্থবছরে দেশে টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদা যথাক্রমে সাত লাখ ৫০ হাজার এবং ১৪ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ছিল। বিপরীতে বিসিআইসির কারখানাগুলোতে উৎপাদন হয়েছে যথাক্রমে ৬৮ হাজার ২৫৯ ও ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন সার, যা মোট চাহিদার ৯.১০ শতাংশ ও ৫.৫৩ শতাংশ। ফলে অধিকাংশ চাহিদা পূরণ হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে।
বিসিআইসি’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের জন্য ২৩ হাজার টাকা, টিএসপি সারের জন্য ৪৯ হাজার ১৭০ টাকা এবং ডিএপি সারের জন্য ৯৮ হাজার ৮৪০ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার নতুন তিনটি সার কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের পরিকল্পনা
দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণের জন্য দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভোলায় নতুন ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন।
আরও পড়ুন: শরীয়তপুরে পেঁয়াজ-রসুন চাষে ব্যস্ত কৃষকরা, ভালো ফলনের প্রত্যাশা
বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটি বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন চালু রাখতে দৈনিক ৪৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে। তাই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারখানা স্থাপিত হলে দেশের ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের অবদান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ বিষয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা রাষ্ট্রীয় বলেন, ‘দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ভোলায় প্রস্তাবিত ইউরিয়া সার কারখানা নির্মাণের কাজ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ, কারিগরি প্রস্তুতি, অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।’
চট্টগ্রামে বছরে চার লাখ টন টিএসপি উৎপাদনের উদ্যোগ
ফসফেটজাত সারের দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় টিএসপিসিএল কমপ্লেক্সের অব্যবহৃত জায়গায় বার্ষিক ৪ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতার নতুন টিএসপি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে বিসিআইসির টিএসপি কমপ্লেক্সে কাঁচামালের সংকট ও প্ল্যান্টের সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: দৌলতখানের কৃষকরা শীতকালীন সবজিতে স্বপ্ন বুনছেন
এ অবস্থায় নতুন কারখানা স্থাপিত হলে টিএসপি সার উৎপাদনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, ‘টিএসপি সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিকগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে টিএসপি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং দেশের সার সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের অবদান বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।’
পলাশে ইউএফ-৮৫ কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা
নরসিংদীর পলাশে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসির অব্যবহৃত জায়গায় বার্ষিক ২৪ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতার ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো ও অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পপণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: তিস্তার চরে ভুট্টার বীজ রোপণে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রচেষ্টা
এ প্রসঙ্গে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, ‘বিদ্যমান শিল্প প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। পলাশে প্রস্তাবিত ইউএফ-৮৫ কারখানার ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রযুক্তি, বাজার চাহিদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা
নতুন তিনটি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্মাণ পর্বে ও উৎপাদন শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ শ্রমিক ও পরিচালনা কাজে নিয়োজিত কর্মীদের পাশাপাশি পরিবহন, সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সেবা খাতেও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। ভোলা, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়ানো এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, ‘নতুন কারখানা স্থাপনের ফলে নির্মাণ কাজ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে কতজনের কর্মসংস্থান হবে, তা প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা, উৎপাদন প্রযুক্তি ও জনবল কাঠামো নির্ধারণের পর বলা সম্ভব হবে। আমরা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প খাতে দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চাই।
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর কৃষিজমি পানিবদ্ধতায় ডুবছে
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন