০৬:৪৬ এম
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র অবস্থায় পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ‘নিষ্ক্রিয়’ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সেনাবাহিনী।
ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকামিনিয়া রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়ে ইরানের কৌশল এ মুহূর্তে স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাব এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অবশ্যই নিষ্ক্রিয় করে দেব।’
আইআরএনএ তাদের এক্স বার্তায় দাবি করেছে, কিছু নির্দিষ্ট ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্র ভুল ধারণা করেছে। সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, উপকূল বা দ্বীপের অবস্থান যা-ই হোক না কেন, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম ইরান।
আরও পড়ুন: প্রযুক্তি জায়ান্টদের ইউক্রেনীয়দের রক্তের বিনিময়ে ব্যবসার অভিযোগ
বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপের পর দেশটির উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে দুটি দফা হামলা চালায়। ইরান জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। ইরান এই সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অস্তিত্বের যুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা শুরু হয় কয়েক দিন আগে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর। এরপর ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। শনিবার রাতে যখন ইরান ঘোষণা দেয় যে তারা প্রণালিটি বন্ধ করে দেবে, তখন ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতির মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে বুধবার এক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে প্রতি ব্যারেল বিক্রি হচ্ছে ৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার সকালে ইরানের গ্রেটার তুনব দ্বীপে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম এবং উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে প্রথম দফা হামলা চালানো হয়। প্রায় নয় ঘণ্টা পর দ্বিতীয় দফায় একাধিক শহরে হামলা চালানো হয়।
আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক ই-কমার্সে রিমার্কের শক্ত অবস্থান, বিশ্ববাজারে যাচ্ছে হাজারো পণ্য
সেন্টকমের দাবি, মার্কিন বাহিনী ইরানের কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে গেছে। এর পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত ইরানের বৃহত্তম বন্দর, বন্দর আব্বাস ও সেখানে থাকা নৌবাহিনী এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু ছিল।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে। কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির একটি রাডার ব্যবস্থা এবং সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের সমাবেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিচালনার কথাও জানিয়েছে তারা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পরিচালিত হামলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতাও ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, যাতে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো সহজ হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, ইরানের খার্গ দ্বীপের দিকে অগ্রসর হওয়া একটি খালি তেলবাহী জাহাজ একাধিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করলে সেটিকে লক্ষ্য করে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। মঙ্গলবার থেকে পুনরায় নৌ অবরোধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত দুটি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে এবং একটি জাহাজ অচল করে দেওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: বিশ্ববাসী একদিন বাংলাদেশের উদাহরণ দেবে
ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসসহ উপকূলীয় এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আহভাজ, কোনারাক, সিরিক ও কেশম এলাকাতেও বিস্ফোরণ ও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রেস টিভি জানিয়েছে, তেহরান থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে খন্দাব শহরেও অন্তত দুটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। মেহর বার্তা সংস্থা নিশ্চিত করেছে, সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করতে রাজধানী তেহরানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দাবি করেছে, আহভাজে শিশু ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা একটি হাসপাতালের কাছেও মার্কিন হামলা হয়েছে। এ হামলায় হাসপাতালটি সাময়িকভাবে খালি করা হয় এবং শিশুদের নিয়ে পরিবারের সদস্যেরা হাসপাতালের বাইরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
প্রথম দফা হামলার পর ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ‘ইরানের নিজস্ব ব্যবস্থা’ বজায় রাখাই দেশের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অস্তিত্বের যুদ্ধে রয়েছি।’
আরও পড়ুন: ভ্যান্সকে গালিবাফের খোঁচা: বসকে এসব বলছেন না কেন?
চলমান এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানি এবং লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ইরান ও লেবাননে। ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন সংঘাত শুরুর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থার বরাতে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধুমাত্র জুলাই মাসেই মার্কিন হামলায় অন্তত ৩৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন