০২:৩৯ এম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ক্রমাগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা আস্থা হারাচ্ছেন। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে হতাশা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনের সরকার ওয়াশিংটনের ওপর ক্রমাগতভাবে বিরক্ত হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থামানোর মতো কার্যকর কূটনীতি পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টে খবর প্রকাশ পেয়েছে, ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে একাধিকবার কঠোর সামরিক হুমকি দিয়েছেন। এরপর আবার আলোচনায় অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি সেই হুমকি থেকে সরে এসেছেন। উপসাগরীয় দেশগুলো এই নীতির কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
এই অবস্থায় সবচেয়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে কিছু উপসাগরীয় দেশের নেতারা। তারা আলোচনা করছেন মার্কিন সামরিক স্থাপনা রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এই প্রশ্নটি কেবল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অসন্তোষ নয়, দীর্ঘ সময়ের মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও তাঁদের ভাবনাকে প্রতিফলিত করছে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাসের আগুন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরতা ফেলতে চাচ্ছে না। তাদের মত অনুযায়ী, ইরানের হামলা এবং ক্রমবর্ধমান যুদ্ধে তারা দেখেছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি থাকলেও এই অঞ্চল পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এজন্য উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও বৈচিত্রময় অংশীদারত্ব নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।
'ট্রাম্প যুদ্ধ করছেন, আমরা মূল দিচ্ছি'
জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনজন কর্মকর্তা এবং একজন প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক ওয়াশিংটন পোস্টের কাছে অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় মিত্ররা এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইনস্ট্যান্ট ঘন ঘন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নেতাদের অসন্তোষ বেড়ে গেছে। ওই কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছেন এবং আমরা তার মূল্য দিচ্ছি।'
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওয়াশিংটন উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার এবং অস্ত্র সরবরাহকারী হলেও পরিস্থিতি এখন ভিন্নদিকে মোড় নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে আরও একটি সংকেত
জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলে হয়, একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে 'যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি সংকেত' জ্ঞাপন করেছেন। যা এই অঞ্চলের কিছু রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে বলে প্রমাণ করে।
এক সাক্ষাৎকারে ওই কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, উপসাগরীয় নেতারা এখন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট মনে করছেন না।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ, এলএফটি-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন
আরেক পশ্চিমা কূটনীতিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মনোভাবের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের বিষয়টিও তুলে ধরেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও এই অঞ্চলের নেতারা মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ভালো চোখে দেখেনি। বিষয়টি ছিল অনেকটা 'প্রয়োজনীয় মন্দ' বিষয়। এখন এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের কয়েক মাসব্যাপী হামলার পর আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে প্রবেশ করে।
এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিনটি দেশই তাদের মধ্যে যদি কোনো একটির ওপর হামলা ঘটে, তাহলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। যা ন্যাটোর ৫নং অনুচ্ছেদের অনুরূপ। এই অনুচ্ছেদে ন্যাটো জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষার দাবি করা হয়েছে।
যদিও রোববার সামাজিকমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রশংসা করেছেন। তিনি এটিকে একটি 'বড়, সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য কিভাবে একত্রিত হচ্ছে এবং দেশগুলো অবশেষে আরও অর্থবহ উপায়ে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছে।
আরও পড়ুন: বোম্বে হাইকোর্ট ইমরান খানের ভারত ছাড়ার নোটিশ স্থগিত করেছে
আরও দেখুন
অন্যদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলের বাজার অস্থির
সোমবার দিনের শুরুতে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ শেয়ার বাজার নিষ্প্রভ অবস্থায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী হয়ে যান চলাচল কমে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্য প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর আগে শনিবার ইরান ওয়াশিংটনকে পরাজয় মেনে নিতে আহ্বান জানানোর পর উত্তেজনার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম
একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে 'অত্যন্ত শয়তান' বলে অভিহিত করেছেন এবং মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানির ক্রমাগত দাম বাড়ার অভিঘাত মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে আহ্বান জানান।
সৌদি আরবের বেঞ্চমার্ক স্টক সূচক ০.২ শতাংশ কমেছে। এর প্রধান কারণ আল রাজহি ব্যাংক ও তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর ০.৫ শতাংশ দরপতন।
কাতারে বেঞ্চমার্ক স্টক সূচক ১ শতাংশ কমে গেছে এবং এর প্রায় সব উপদেষ্টা নেতিবাচক অবস্থানে লেনদেন করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম ঋণদাতা কাতার ন্যাশনাল ব্যাংকের সূচকও ১.৮ শতাংশ কমেছে।
গত সপ্তাহের ট্যাঙ্কার হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
আরও পড়ুন: সাঈদীর মামলার বাদীকে দাফনে বাধা দেয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন জামায়াতের
দুবাইয়ের প্রধান শেয়ার সূচক ০.১ শতাংশ কমেছে, যেখানে শীর্ষ ঋণদাতা এমিরেটস এনবিডি ১.৩ শতাংশ লোকসান করেছে। আবুধাবিতে সম্পদ তহবিল ল'ইমাডকে ব্যক্তিগত খাতে দিয়ে দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
ওমানের সঙ্গে চুক্তিতে ধাক্কা খাবে ওয়াশিংটন
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের পরিকল্পনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য এবং তারা সোমবার বলেছে, দুই দেশের মধ্যে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের একটি পরিকল্পনা নিয়ে তারা ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে।
উভয় পক্ষ এখন একটি যৌথ বিবৃতির জন্য বিস্তারিত বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে বলে বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। তারা নতুন কৌশলগত ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইরানের পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তেহরানে সাংবাদিকদের বলেছেন, 'পরিবহণ পথের মানচিত্র নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি বোঝাপড়া হয়েছে।'
এপি জানায়, এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে। এত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথের স্বাভাবিক চলাচল পুনরুদ্ধারে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের বদলে তেহরান-মাস্কাট সমঝোতা কার্যকর হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির দাবি তোয়াক্কা না করেই ইরান–ওমান আলাদা ব্যবস্থাপনা নিয়ে এগোচ্ছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন