০২:৪১ পি.এম
জেলায় মধুপুর উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় উৎপাদিত জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আনারসের স্বাদ ও গন্ধ অতুলনীয়। কিন্তু কিছু অসাধু লোভী কৃষক অধিক লাভের আশায় রাসায়নিকের অত্যাধিক ব্যবহারে আনারসের সুনাম নষ্ট করে ফেলছেন। এরই প্রেক্ষিতে মধুপুরের আনারসের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে স্বল্প খরচ ও ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা এখন অর্গানিক পদ্ধতিতে বিষমুক্ত ও নিরাপদ আনারস চাষ করছেন।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আনারসের রাজধানী হিসেবে খ্যাত মধুপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষীর সংখ্যা যেমন বেড়ে চলেছে, তেমনই দেশব্যাপী এই সুমিষ্ট আনারসের জন্য রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু আনারস চাষীরা বেশি লাভের আশায় আনারসের আকার, রং উজ্জ্বল ও অসময়ে বাজারে ওঠানোর জন্য নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে ভালো দাম পাওয়ার আশায় রমজান মাসকে টার্গেট করে ছোট-বড় গাছে একসঙ্গে ফুল ও ফলন আসার জন্য রাসায়নিক মিশ্রণ স্প্রে করে, যা সিজার হিসেবে পরিচিত।
এ সময় নিয়মিত হরমোন এবং পাকানোর জন্য নিয়ন্ত্রিত হরমোন প্রয়োগের ১০-১২ দিন পরেই আনারস হারভেস্ট করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। আনারস দেখতে হলুদ বর্ণ হলেও তা বিষাক্ত ফল হিসেবে পরিণত হয়ে যায়। স্বাদ ও ঘ্রাণ তখন ঠিক থাকে না। এ কারণেই অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে আকারে বড় ও আকর্ষণীয় রঙ তৈরি হলেও আনারসের স্বাদ-গন্ধ ও গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: ভাণ্ডারিয়ায় যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন, র্যালি ও সমাবেশ
তবে ইদানিং মানুষ সচেতন হওয়ার কারণে এবং বিষযুক্ত আনারস না কেনার ফলে মধুপুরে বিষমুক্ত আনারসের চাষ শুরু হয়েছে। আনারসের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সোহেল রানাসহ অনেক কৃষক এখন নিরাপদ আনারস চাষ করছেন।
সরেজমিনে মধুপুর উপজেলার ফুলবাগ চালা ইউনিয়নের হাগুড়া কুড়ী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, সোহেল রানা আনারস বিক্রির উদ্দেশ্যে তার ক্ষেত থেকে আনারস সংগ্রহ করছেন।
এ সময় এ প্রকল্পের উদ্যোক্তা সোহেল রানার সাথে কথা হয়। তিনি বাসসকে জানান, ২০২৫ সালে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর আর্থিক সহায়তায় ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এসএসএস’ এর সহযোগিতায় এ কাজে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এ সংস্থার পক্ষ থেকে ৬০ হাজার টাকা অনুদান ও তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে নিরাপদ আনারস প্রকল্পের কাজ শুরু করেন। মোট চার বিঘা (১২০ শতাংশ) জমিতে নিরাপদ আনারসের চাষ করেছেন।
তিনি জানান, ওই জমিতে হানিকুইন জাতের ২৪ হাজার আনারসের চারা রোপণ করেন। তিনি সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ আনারস চাষ করছেন। চারা রোপণ থেকে শুরু করে আনারস হারভেস্ট করার মধ্যে আঠারো মাসে মোট ৫০ জন শ্রমিক বিভিন্ন সময়ে তার এই প্রকল্পে কাজ করেছেন। তাদের বেতন ও অন্যান্য সব খরচ বাবদ তার ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে সোহেল রানা মোট ৫ লাখ ২৮ হাজার টাকার আনারস বিক্রি করেছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে আরো প্রায় ৭০ হাজার টাকা আনারস বিক্রি করতে পারবেন।
আরও পড়ুন: নাটোরের বড়াইগ্রামে প্রাচীন রামাগাড়ী কাচারীঘরের জমি অবৈধ দখলের অভিযোগ, বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্য
তিনি আরও জানান, বর্তমানে যেখানে অতিরিক্ত রাসায়নিক কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো প্রতি পিস বড় সাইজের আনারস ২৫-৩০ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি হয়, সেখানে অর্গানিক পদ্ধতিতে নিরাপদ আনারস বিক্রি করছেন ৪০-৪৫ টাকা দরে।
নিরাপদ আনারস চাষি সোহেল রানা বাসস’কে জানান, মধুপুরের আনারসের স্বাদ ও গন্ধ অতুলনীয়। বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করতে গিয়ে অধিক লাভের আশায় অনেক চাষিরা আনারসের আকার, রং উজ্জ্বল ও অসময়ে বাজারে ওঠানোর জন্য নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। এতে মধুপুরের আনারসের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার মতে, পাহাড়ি অঞ্চলের বহু কৃষক আনারসের স্বাদ, গন্ধ ও তার পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে নিরাপদ আনারস চাষ করছেন। উৎপাদনে খরচ কম ও দাম ভালো পাওয়ায় দিন দিন আরও অনেক চাষি বিষমুক্ত ও নিরাপদ আনারস চাষে ঝুঁকছেন।
তিনি আরো জানান, তাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্থানীয় এলাকার মিজানুর রহমান সবুজ, রনি মিয়া, কল্যাণ ম্যাথিউ নিরাপদ আনারস চাষ শুরু করেছেন। এছাড়া মধুপুর গড় অঞ্চলে প্রায় শতাধিক চাষি বর্তমানে নিরাপদ আনারস চাষে যুক্ত রয়েছেন।
নিরাপদ আনারসের বাজারজাত সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহেল রানা জানান, পুরাতন চাষি হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানের ক্রেতারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনে থাকেন। উত্তরবঙ্গের নীলফামারী, রংপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ এবং ঢাকা থেকে ক্রেতারা তার ক্ষেত থেকে সরেজমিনে এসে আনারস কিনে নিয়ে যান।
আরও পড়ুন: ত্রিশালে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসে র্যালি ও দোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার নিজের ফেসবুক পেজ এস আর ব্লগ বিডি এর মাধ্যমে অনলাইনে নিরাপদ আনারস অর্ডার নিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রেতাদের কাছে নিরাপদ আনারস পৌঁছাচ্ছেন সোহেল রানা।
কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ও অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করা আনারস চেনার উপায় সম্পর্কে জুয়েল রানা জানান, প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ক আনারসের গোড়ার দিকে হলুদ রং হবে এবং উপরের দিকটি সবুজ থাকবে। আনারস কাটলে সুঘ্রাণ বের হবে এবং খেতে সুমিষ্ট হবে। অন্যদিকে হরমোন দিয়ে পাকানো আনারস সম্পূর্ণ হলুদ বর্ণের হবে। দেখতে আকর্ষণীয় হলেও সুঘ্রাণ বের হবে না এবং খেতে সুমিষ্ট হবে না।
ছবি : বাসস
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসএসএস এর নির্বাহী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সন্তোষ চন্দ্র পাল বাসস’কে জানিয়েছেন, সংস্থাটি শুরু থেকেই মধুপুর গড় ও পাহাড়ি অঞ্চলের স্থানীয় মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন নতুন কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে আনারস চাষিদের ক্ষুদ্র অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে আসছে। বর্তমানে সাসটেইনেবল মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ এন্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট (স্মার্ট) প্রকল্পের মাধ্যমে ১ হাজার ৮শ’ সদস্যদের ক্ষুদ্র অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের উপকারভোগীরা নিরাপদ আনারস চাষ করে আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
আরও পড়ুন: আলফাডাঙ্গায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. আশেক পারভেজ বাসস’কে জানান, টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় অঞ্চলে ছায়ান্টকিউ, হ্যানি কুইন এবং ফিলিপাইন থেকে আমদানিকৃত এমডি-২ জাতের আনারস আবাদ হচ্ছে। অধিক মুনাফার আশায় আনারস চাষীরা মাত্রাতিরিক্ত হরমোন প্রয়োগ করেন। ওই আনারস খেলে মানব দেহে দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ হতে পারে। এমনকি লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়া বা ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। তাই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি মধুপুরের আনারসের সুঘ্রাণ ও অতুলনীয় স্বাদ এবং আনারসের ঐতিহ্য ধরে রাখতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কেমিক্যালমুক্ত আনারস চাষে চাষীদের সবসময়ই উদ্বুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববাজারে আনারসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশ্বজুড়ে আনারস ফল হিসেবে ও আনারসজাত পণ্য রফতানিতে প্রথম সারিতে রয়েছে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন। সুতরাং, নিরাপদ আনারস চাষের মাধ্যমে আমাদের দেশে আনারসের ভ্যালু এডিশনের মাধ্যমে খাদ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু বেভারেজ কোম্পানি আনারসের জুস বিদেশে রফতানি করছে এবং এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা সরকারের কাছে নানা প্রকল্প প্রস্তাব আকারে পাঠিয়েছি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন