কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
০৮:৩০ পি.এম
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় মধুমতি নদীর তীব্র ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে খাদ্যসহায়তা নিয়ে ছুটে গেলেন নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জোবায়ের হাবিব। বুধবার (৭ অক্টোবর) সকালে তিনি উপজেলার চরখোলাবাড়িয়া ও দিগনগর এলাকার ভাঙনকবলিত স্থান পরিদর্শন করেন। এ সময় ৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রত্যেককে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়।
পরিদর্শনকালে ইউএনও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতির খোঁজ নেন। বসতভিটা হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়া পরিবারগুলোকে তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে মধুমতি নদীতে পানি বৃদ্ধি ও স্রোতের তীব্রতা বাড়ায় চরখোলাবাড়িয়া ও দিগনগর এলাকায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ওই দুই এলাকায় আটটি বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও বহু বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি ও গাছপালা।
ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে কিংবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। হঠাৎ বসতভিটা হারিয়ে এসব পরিবার চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে।
এ বিষয়ে ইউএনও মো. জোবায়ের হাবিব বলেন, মধুমতি নদীর ভাঙনের তীব্রতা সরেজমিনে দেখেছি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে ভাঙন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, নদীভাঙন স্থায়ীভাবে রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়টিও সরকারি উদ্যোগে বিবেচনা করা হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশের প্রশস্তকরণ কাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর।
মঙ্গলবার বিকেলে ফটিকছড়ির জুবলি স্কুল সংলগ্ন এলাকায় আকস্মিক পরিদর্শনকালে তিনি বালির পরিবর্তে মাটিমিশ্রিত বালি ব্যবহারের বিষয়টি হাতেনাতে দেখতে পান। এমপি পরে কাজ বন্ধ করে নিম্নমানের সামগ্রী তুলে নির্ধারিত মানের বালি দিয়ে পুনরায় কাজ করার নির্দেশনা প্রদান করেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার বিকেলে ফটিকছড়ির একটি কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের জুবলি স্কুল সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ অংশে চলমান প্রশস্তকরণ কাজ পরিদর্শন করেন। বিষয়টি তার দৃষ্টিগোচর হলে তিনি গাড়ি থামিয়ে ঘটনাস্থলে নেমে কাজের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
এ সময় সড়কের ভিত্তি তৈরির কাজে নির্ধারিত মানের বালির পরিবর্তে মাটিমিশ্রিত বালি ব্যবহারের বিষয়টি তার নজরে আসে। সরকারি অর্থে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের কাজ নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারকে কঠোরভাবে সতর্ক করে মাটিমিশ্রিত বালি সম্পূর্ণভাবে তুলে ফেলার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নির্ধারিত মানের বালি ব্যবহার করে কাজ করার নির্দেশনা দেন তিনি।
এ সময় সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর বলেন, "জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বাস্তবায়িত উন্নয়ন কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার বরদাশত করা হবে না। কাজের মানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অনিয়মের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজ যদি টেকসই না হয়, তবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হতে পারে। তারা কাজের মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি দাবি করেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে এতিম, অসহায় ও ছিন্নমূল ৭৪ শিশুর আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও মাতৃস্নেহের ঠিকানা হয়ে উঠেছেন বিলকিছ বানু। ২০০৯ সালে মাত্র ১৩ শিশুকে নিয়ে শুরু করা তাঁর মানবিক উদ্যোগ আজ ৭৪ শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়তে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।
এই মহৎ উদ্যোগে শুরু থেকেই বিলকিছ বানুর পাশে রয়েছেন তাঁর স্বামী নাগেশ্বরী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক মো. রবিউল ইসলাম। শিশুদের কল্যাণে নিজেদের সম্পদও ট্রাস্টের নামে লিখে দিয়েছেন এই দম্পতি।
ছোটবেলা থেকেই মানুষের সেবায় আগ্রহী ছিলেন বিলকিছ বানু। বিয়ের কয়েক বছর পর চারজন ছিন্নমূল শিশুকে নিজের বাড়িতে এনে তাঁদের লেখাপড়া ও লালন-পালনের দায়িত্ব নেন তিনি। পরে পিতৃ-মাতৃহীন ও অসহায় শিশুদের জন্য স্থায়ীভাবে কিছু করার উদ্যোগ নেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে ১৩ শিশুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় গোলাপ খাঁ শিশু সদন।
২০১২ সালে সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রমও চালু করা হয়। বর্তমানে শিশু সদনে ৭৪ শিশু বসবাস করছে। ছেলে ও মেয়েদের জন্য রয়েছে পৃথক আবাসন ব্যবস্থা। শিশুদের দেখাশোনায় রয়েছেন ২০ জন শিক্ষক ও কর্মচারী।
শিশুদের খাবার, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়। শিশু সদনের ব্যয় মূলত ট্রাস্টের সম্পদ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে একটি সুপার মার্কেটের প্রায় ৮০টি দোকানের ভাড়া, কলেজছাত্রীদের জন্য নির্মিত হোস্টেলের আয় এবং কৃষিজমি থেকে পাওয়া অর্থ।
শুধু থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নয়, অসুস্থ হলে শিশুদের চিকিৎসার দায়িত্বও নেন বিলকিছ বানু। চলতি বছরের জুনে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী তুষার গিলিয়ান-বারে সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশু ফাতেমার চিকিৎসাও চলছে।
বিলকিছ বানু বলেন, “চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তহবিল শূন্য হয়ে যাচ্ছে। এই শিশুদের কোথায় ফেলে দেব? ওরা তো আমারই সন্তান।”
শিশু সদনের কো-অর্ডিনেটর সব্যসাচী সাহা জানান, এখানকার শিশুরা বিলকিছ বানুকে ‘মা’ এবং রবিউল ইসলামকে ‘বাবা’ বলে ডাকে। তাঁদের স্নেহ, ভালোবাসা ও যত্নেই শিশুরা বেড়ে উঠছে।
শিশু সদনের শিক্ষার্থীরাও তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফ হামজা জানায়, পড়াশোনার সময় পড়াশোনা এবং খেলার সময় খেলতে উৎসাহ দেন ‘মা’। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইব্রাহীম জানায়, থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলারও সুযোগ রয়েছে।
তবে দীর্ঘ এই পথচলায় প্রতিষ্ঠানটিকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। করোনাকালে আর্থিক সংকটের কারণে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালু রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবাসন ও আর্থিক সহায়তা শিশু সদন থেকেই দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করে অনেক শিশু বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাঁদের মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন বলেও জানা গেছে।
বিলকিছ বানু জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে সহায়তা পাওয়া গেছে। তবে শিশু সদনকে আরও বড় পরিসরে গড়ে তোলার স্বপ্ন রয়েছে তাঁদের। শহরের বাইরে ট্রাস্টের নামে থাকা প্রায় সাড়ে সাত বিঘা জমি নিয়েও বিরোধ রয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বামী মো. রবিউল ইসলাম বলেন, “যত দিন বেঁচে আছি, আমাদের সবকিছু দিয়ে এই শিশুদের পাশে থাকব।”
বিলকিছ বানুর স্বপ্ন আরও বড়। তাঁর ভাষায়, “পেটে ধরা যায় দুই-একজনকে, বুকে ধরা যায় কোটি সন্তানকে। আমি সেই কোটি সন্তানের মা হতে চাই।”
১৩ শিশু দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ ৭৪ এতিম ও অসহায় শিশুর আশ্রয়স্থল। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও শিক্ষা, চিকিৎসা ও মাতৃস্নেহের মাধ্যমে এসব শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার যে চেষ্টা বিলকিছ বানু ও রবিউল ইসলাম করে যাচ্ছেন, তা সমাজে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
সাক্ষাৎটি অনুষ্ঠিত হয় বুধবার (৭ অক্টোবর) বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে। সাক্ষাৎকালে, আইজিপি এবং বিমান বাহিনী প্রধান কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও পুলিশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন।
বাংলাদেশ পুলিশ জানায়, সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই সাক্ষাৎ দুই বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান পারস্পরিক আস্থা ও পেশাদার সম্পর্কের প্রতিফলন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের কেন্দ্রস্থলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। একটি অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তদারকি কর্মকর্তাদের হাত ধরে এই বরাদ্দ ভেস্তে যেতে বসেছে। সিডিউল ও নকশাকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন স্থানে ২ ও ৩ নম্বর মানহীন ইট ব্যবহার করা হচ্ছে, ঢালাই থেকে রডের ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, এবং কাজ শুরুর আগেই বেআইনিভাবে কোটি টাকার সরকারি কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধান, স্থানীয়দের অভিযোগ এবং উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে উন্নয়ন কাজের নামে এই নয়ছয় ও অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
নোয়াড্ডা-মাদারটেক-ঘোরাডিয়া সড়ক :
সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২ কোটি ২৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫২ টাকা ব্যয়ে ১৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যের 'নোয়াড্ডা রোড হয়ে মাদারটেক-ঘোরাডিয়া' সড়কটি ইউনিব্লক দ্বারা উন্নয়নের কাজ পায় এম আর ট্রেডিং নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিনে সড়কটিতে গিয়ে দেখা যায়, কাজের সিডিউল অনুযায়ী যেখানে উন্নতমানের ১ নম্বর ইট ব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, সেখানে পুরো সড়ক জুড়ে অত্যন্ত নিম্নমানের লালচে-হলুদ ২ নম্বর ও ৩ নম্বর ইট ব্যবহার করা হয়েছে। কাজের মান পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, রোলার দিয়ে সামান্য চাপ দিতেই ইটগুলো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে বালুর সাথে মিশে যাচ্ছে। সড়কের আগের পুরাতন ইট প্রতি পিস ১৫ টাকা ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে এক নাম্বার ইট পাওয়া যাচ্ছে আরো অনেক কমে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা অভিযোগ করে বলেন, "চোখের সামনে এভাবে দুই নম্বর ইট দিয়ে রাস্তা করা হচ্ছে। গাড়ি চললে তিন মাসও এই রাস্তা টিকবে না।"
ফারুক হোসেন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে সড়কটির উন্নয়ন করা হচ্ছে, সামান্য বৃষ্টি হলেই আবার ভেঙ্গে যাবে। সড়কের পাশ দিয়ে কোথাও কোথাও ২০ ফুট ২৫ ফুট গভীর খাদ রয়েছে।
সড়কটির কাজ দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুল ইসলাম বলেন, কাজে কোন অনিয়ম হচ্ছে না। ওই সড়কের পুরাতন ইট দিয়েই সড়কটি সংস্কার হচ্ছে। হয়তো ঠিকাদারের কিছু ইট কিনতে হবে। পুরাতন প্রত্যেকটা ইট ১৫ টাকা করে দাম ধরা হয়েছে। রোলার দিয়ে ডলার দেওয়ায় ইট ফাঁকি হয়ে যাচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুই একটা খারাপ ইট থাকতে পারে।
কাজের অনিয়মের বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রকৌশল অফিস থেকে দেয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মোঃ সাকিবের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, এই সড়কটির কাজের অনিয়মের খবর আমি আগেই পেয়েছি। সড়কের আগের পুরাতন ইট দিয়েই কাজ চলছিল। কিন্তু আগের ইটগুলো ছিল তিন নাম্বার। যার কারণে রোলার দিয়ে ডলা দিলেই ফাঁকি হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সড়কের সাইটেও অনেক গভীরতা ১৫ থেকে ২০ ফিটের কম হবে না। বৃষ্টি হলেই সড়কটি ভেঙ্গে পড়ারও আশংকা রয়েছে। তিনি বলেন, সড়কটির কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
কুরগাঁও-গকুলনগর সড়ক :
একই প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ৮৯ লাখ ৭০ হাজার ৪২৫ টাকা ব্যয়ে ১৩৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ দশমিক ৭ মিটার প্রস্থের 'কুরগাঁও-গকুলনগর' সড়কটি ইউনিব্লক দ্বারা উন্নয়নের দায়িত্ব পায় ডন এন্টারপ্রাইজ।
সরেজমিনে যা দেখা গেছে, সড়কটির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং দুই পাশ যাতে ভেঙে না পড়ে, সেজন্য সিডিউল ও অফিশিয়াল ড্রয়িং-ডিজাইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পুরুত্বের ঢালাই (সাইড প্রটেকশন) দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ড্রয়িংয়ের ধার ধারেনি। সিডিউল তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো অতি নিম্নমানের সিমেন্ট, বালু ও সুরকি দিয়ে নামকাওয়াস্তে প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ করছিল।
সড়কের মারাত্মক নিম্নমানের কাজ দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা। একপর্যায়ে স্থানীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সরেজমিনে গিয়ে কাজের অনিয়ম ধরে ফেলেন এবং সরাসরি নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। অনিয়মের সত্যতা পেয়ে পরবর্তীতে উপজেলা প্রকৌশল (এলজিইডি) অফিস থেকে ডন এন্টারপ্রাইজকে লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে এ পর্যন্ত করা নিম্নমানের সম্পূর্ণ অংশ ভেঙে ফেলে নতুন করে সিডিউল অনুযায়ী কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের পর থেকে বর্তমানে সড়কটির উন্নয়ন কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
পাথালিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম শাওন বলেন, সিডিউল তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো অতি নিম্নমানের সিমেন্ট, বালু, রড কম দিয়ে সড়কের প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ করছিল। পাথর যে গ্রেডের দেওয়ার কথা ছিল সেটিও দেয়নি। আমরা বিষয়টি উপজেলা প্রকৌশলিকে অবহিত করলে তারা এসে কাজ বন্ধ করে দেন এবং নিম্নমানের যে কাজ করেছিল সেটা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
কাজটির তদারকির দায়িত্বে থাকা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। এমনকি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরপর দুটি চিঠিও দিয়েছি যে কাজ নতুন করে করতে হবে। গত এক সপ্তাহ ধরে কাজটি বন্ধ রাখা হয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ড্রয়িং- ডিজাইন অনুযায়ী কাজ করেনি, ম্যাটেরিয়ালস কম দিয়েছে তাই কাজ বন্ধ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, তদারকির দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ার এর গাফেলতির কারণেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজে অনিয়ম করার সুযোগ পেয়েছে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ডন এন্টারপ্রাইজের সুপারভাইজার মোঃ মিজান বলেন, আমরা সঠিকভাবে কাজ করছিলাম। পাথর দুই একটা বড় বড় ছিল। রডের রিং দুই -একটি জায়গায় কম হয়েছিল এই অভিযোগ তুলে আমাদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে এবং ভেঙ্গে ফেলেছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় কয়েকজন আমাদের কাছে মালামাল বিক্রি করতে চেয়েছিল আমরা তাদের কাছ থেকে নেইনি। এ কারণেই আমাদের উপর তারা ক্ষুব্ধ। আমাদের লস যা হওয়ার তা তো হয়েছেই। এখন আমাদের কাজের সুযোগ করে দিলে আমরা পুনরায় কাজ করবো তাহলে বন্ধই থাকবে বলেন তিনি।
কুটুরিয়া ৪০ ফিট আরসিসি সড়ক :
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে উপজেলা ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইউডিএফ) আওতায় নির্মিত 'কুটুরিয়া ৪০ ফিট' সড়কে। প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রস্থের এই আরসিসি সড়কটির কাজ পায় গোল্ডেন কনস্ট্রাকশন।
পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) অনুযায়ী সরকারি কাজের উপ-চুক্তি বা সাব-লিজ সম্পূর্ণ অবৈধ হলেও, গোল্ডেন কনস্ট্রাকশন কাজ শুরু করার আগেই গোপনে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে এটি মিথিলা ট্রেডার্স নামে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেয়।
নতুন ঠিকাদার মূল খরচের টাকা তুলতে গিয়ে সড়কের বুনিয়াদি শক্তিতেই হাত দিয়েছে। সরেজমিনে স্থানীয়রা দেখান, সড়কের সাব-বেসে ঢালাওভাবে ব্যবহার করা হয়েছে পচা ৩ নম্বর ইট। এছাড়া আরসিসি ঢালাইয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ড্রয়িং অনুযায়ী যতটুকু রড দেওয়ার কথা, দেওয়া হচ্ছে তার কম।
এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী এস এম সাব্বির হোসেনের মুখোমুখি হয় এই প্রতিবেদক।
সড়কটির কাজের বরাদ্দ, সরকারি সিডিউল ও ড্রয়িং সংক্রান্ত নথিপত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন। বারবার তথ্যের জন্য চাপ দেওয়া হলে তিনি এক পর্যায়ে অবিশ্বাস্য দাবি করে বলেন, "কাজের ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।"
উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরকারি প্রকল্পের ফাইল 'খুঁজে পাচ্ছেন না' বলায় প্রকৌশল দপ্তরের কর্মকর্তা ও অনিয়মকারী ঠিকাদারদের মধ্যকার নীরব যোগসাজশের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
স্থানীয় দোকানী শামীম হোসেন বলেন, গার্মেন্টস শিল্পবেষ্টিত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের সড়কগুলোর এমন বেহাল দশায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও কারখানা শ্রমিকরা। দীর্ঘদিন পরে সড়কটির উন্নয়ন কাজ শুরু হলেও ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে কাজ চলছে। রডগুলো দেয়া হয়েছে চিকন। রডের গ্যাপ কোথাও ১০ ইঞ্চি কোথাও এক ফুটেরও বেশি।
স্থানীয় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঠিকাদাররা চুরি না করলে লাভ করবে কিভাবে।
এসব বিষয়ে জানতে মিথিলা ট্রেডার্স নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের ভাই কাজ দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ফরহাদ হোসেন বলেন, খোলা থেকে ইট আনার সময় তিন নাম্বার ইট দুই-চারটা আসতেই পারে। আমাকে তো আর ইঞ্জিনিয়ার অফিস থেকে বলে দেয় নাই তিন নাম্বার ইট সরিয়ে রেখে কাজ করার জন্য। রডের গ্যাপ বেশি থাকার বিষয়ে বলেন, গ্যাপ আট ইঞ্চি করে রেখে সব ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি ইঞ্জিনিয়ারকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিয়েছি লোক পাঠিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। প্রকৌশল অফিস থেকে ফাইল গায়েবের বিষয়ে বলেন, কাজের ফাইল না পাওয়ার কিছু নাই, তাছাড়া সব কম্পিউটারেই আছে।
এসব বিষয়ে কথা বলতে এলজিইডির সাভার উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ মিনারুল ইসলামের দপ্তরে দুইদিন ঘুরেও তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠো ফোনে ফোন করে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পরে সাক্ষাতে কথা বলবেন বলে ফোনটি রেখে দেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ