প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে এতিম, অসহায় ও ছিন্নমূল ৭৪ শিশুর আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও মাতৃস্নেহের ঠিকানা হয়ে উঠেছেন বিলকিছ বানু। ২০০৯ সালে মাত্র ১৩ শিশুকে নিয়ে শুরু করা তাঁর মানবিক উদ্যোগ আজ ৭৪ শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়তে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।
এই মহৎ উদ্যোগে শুরু থেকেই বিলকিছ বানুর পাশে রয়েছেন তাঁর স্বামী নাগেশ্বরী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক মো. রবিউল ইসলাম। শিশুদের কল্যাণে নিজেদের সম্পদও ট্রাস্টের নামে লিখে দিয়েছেন এই দম্পতি।
ছোটবেলা থেকেই মানুষের সেবায় আগ্রহী ছিলেন বিলকিছ বানু। বিয়ের কয়েক বছর পর চারজন ছিন্নমূল শিশুকে নিজের বাড়িতে এনে তাঁদের লেখাপড়া ও লালন-পালনের দায়িত্ব নেন তিনি। পরে পিতৃ-মাতৃহীন ও অসহায় শিশুদের জন্য স্থায়ীভাবে কিছু করার উদ্যোগ নেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে ১৩ শিশুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় গোলাপ খাঁ শিশু সদন।
২০১২ সালে সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রমও চালু করা হয়। বর্তমানে শিশু সদনে ৭৪ শিশু বসবাস করছে। ছেলে ও মেয়েদের জন্য রয়েছে পৃথক আবাসন ব্যবস্থা। শিশুদের দেখাশোনায় রয়েছেন ২০ জন শিক্ষক ও কর্মচারী।
শিশুদের খাবার, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়। শিশু সদনের ব্যয় মূলত ট্রাস্টের সম্পদ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে একটি সুপার মার্কেটের প্রায় ৮০টি দোকানের ভাড়া, কলেজছাত্রীদের জন্য নির্মিত হোস্টেলের আয় এবং কৃষিজমি থেকে পাওয়া অর্থ।
শুধু থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নয়, অসুস্থ হলে শিশুদের চিকিৎসার দায়িত্বও নেন বিলকিছ বানু। চলতি বছরের জুনে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী তুষার গিলিয়ান-বারে সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশু ফাতেমার চিকিৎসাও চলছে।
বিলকিছ বানু বলেন, “চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তহবিল শূন্য হয়ে যাচ্ছে। এই শিশুদের কোথায় ফেলে দেব? ওরা তো আমারই সন্তান।”
শিশু সদনের কো-অর্ডিনেটর সব্যসাচী সাহা জানান, এখানকার শিশুরা বিলকিছ বানুকে ‘মা’ এবং রবিউল ইসলামকে ‘বাবা’ বলে ডাকে। তাঁদের স্নেহ, ভালোবাসা ও যত্নেই শিশুরা বেড়ে উঠছে।
শিশু সদনের শিক্ষার্থীরাও তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফ হামজা জানায়, পড়াশোনার সময় পড়াশোনা এবং খেলার সময় খেলতে উৎসাহ দেন ‘মা’। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইব্রাহীম জানায়, থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলারও সুযোগ রয়েছে।
তবে দীর্ঘ এই পথচলায় প্রতিষ্ঠানটিকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। করোনাকালে আর্থিক সংকটের কারণে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালু রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবাসন ও আর্থিক সহায়তা শিশু সদন থেকেই দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করে অনেক শিশু বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাঁদের মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন বলেও জানা গেছে।
বিলকিছ বানু জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে সহায়তা পাওয়া গেছে। তবে শিশু সদনকে আরও বড় পরিসরে গড়ে তোলার স্বপ্ন রয়েছে তাঁদের। শহরের বাইরে ট্রাস্টের নামে থাকা প্রায় সাড়ে সাত বিঘা জমি নিয়েও বিরোধ রয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বামী মো. রবিউল ইসলাম বলেন, “যত দিন বেঁচে আছি, আমাদের সবকিছু দিয়ে এই শিশুদের পাশে থাকব।”
বিলকিছ বানুর স্বপ্ন আরও বড়। তাঁর ভাষায়, “পেটে ধরা যায় দুই-একজনকে, বুকে ধরা যায় কোটি সন্তানকে। আমি সেই কোটি সন্তানের মা হতে চাই।”
১৩ শিশু দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ ৭৪ এতিম ও অসহায় শিশুর আশ্রয়স্থল। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও শিক্ষা, চিকিৎসা ও মাতৃস্নেহের মাধ্যমে এসব শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার যে চেষ্টা বিলকিছ বানু ও রবিউল ইসলাম করে যাচ্ছেন, তা সমাজে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন