০৬:০১ পি.এম
বয়সের ভারে শরীর ন্যুব্জ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ১২০ বছর বয়সেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ছলিমাবাদ ইউনিয়নের সাতবিলা গ্রামের কৃষক তারা মিয়া কারো সাহায্য ছাড়া নিজে নিজে চলাফেরা করেন।
স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি ‘তারু মিয়া’ নামেই বেশি পরিচিত। তিনি দীর্ঘ জীবনযাপন করার পর কৃষিকাজের পাশাপাশি মানুষের শেষ ঠিকানা কবর খননকে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের মতে, এই বয়সেও এলাকার কারো মৃত্যুর খবর পেলেই তিনি কবর খুঁড়তে বের হয়ে যান। তিনি আজ থেকে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ বছর ধরে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কবর খনন করে আসছেন।
আরও পড়ুন: চাঁদা না পেয়ে শ্রমিকদের ওপর হামলা, গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি, থানায় অভিযোগ
এতদিনে তিনি সাতবিলা ও ছলিমাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় এক হাজার মানুষের কবর খুঁড়েছেন। এর জন্য তিনি কারো কাছ থেকে কোনো অর্থ গ্রহণ করেননি।
তারু মিয়ার বর্তমানে এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছেন। তার স্ত্রী ও আরেক ছেলে তিন বছর আগে মারা গেছেন। তার ছেলে সালাম মিয়া, পুত্রবধূ, মেয়ে ও নাতি-নাতনিরা তার দেখভাল করেন।
কবর খননের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষের শেষ ঠিকানা কবর। এই কবরেই একদিন শায়িত হতে হয়। ৩০-৩৫ বছর বয়স থেকে আমি মনোযোগ দিয়ে কবর খোঁড়ার কাজটি করে আসছি। প্রায় ৮০-৮৫ বছর ধরে এ কাজ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাতবিলা ও ছলিমাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় এক হাজার মানুষের কবর খুঁড়েছি ও এর বিনিময়ে কাউর কাছ থেকে কোনো অর্থকড়ি নিইনি। আত্মীয়-স্বজন, নিজ গ্রাম অথবা পাশের গ্রামের কারো মৃত্যুর খবর শুনলেই কবর খুঁড়তে ছুটে যাই। তবে এখন শরীর তেমন সায় দেয় না। কারণ এখন বয়স এসে গেছে।’
আরও পড়ুন: বেগম খালেদা জিয়ার নামে সিলেটের পুরানো কারাগারে জায়গায় পার্ক নির্মাণ হচ্ছে
ছয়কুড়ি বয়সী এই বৃদ্ধ আরো জানান, ‘বয়স ছোট থেকেই মৃত মানুষের কবর খনন করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এটি একটি মানবিক কাজ। একজন ক্ষুদ্র মানুষ হিসেবে যদি ভালো কাজ করতে পারি তাহলে শান্তি পাই।’
নিজের জীবনযাপন সম্পর্কে তারু মিয়া বলেন, ‘আমি ৭ কানি জমিতে কাজ করে আয়-রোজগার করে সংসার চালাচ্ছি। আমার একমাত্র ছেলে সালামও কৃষিকাজ করে। আমি মনে প্রাণে, মানবিকতা থেকে মানুষের জন্য সারা জীবন কবর খননের কাজ করি। যতদিন বাঁচব, ততদিন মানুষের মঙ্গলের জন্য মানবিক কাজ করে বাঁচতে চাই। কিন্তু এখন আর বিশেষভাবে পারি না।’
প্রতিবেশী মোহাম্মদ মহসিন মিয়া বলেন, ‘তারু চাচা সহজ-সরল মানুষ। তিনি সব সময় হাসিখুশি থাকেন। কবর খনন করা তার মহৎ গুণের একটি। তিনি ছোটবেলা থেকেই কবর খোঁড়া শুরু করেন।’
ছলিমাবাদ ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অনেকদিন ধরে দেখছি, তারা চাচা কবর খনন করছেন। কবর খননের বিষয়টি মানবিক এবং প্রশংসনীয়।’
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট জব্দ, মূল্য ২৭ লাখ টাকা
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘কবর খনন করা একটি মহৎ কাজ। এটি অন্য কেউ করতে পারে না। যারা মানবিক, তারাই নিঃস্বার্থভাবে এই কাজ করে।’
তারু মিয়ার ছেলে সালাম মিয়া (৭০) বলেন, ‘আব্বা নিজের কাজ নিজেই করেন। তিনি বয়স্ক ভাতা নিতে চান না। আমি দেখেছি, যেটুকু আয় করেন, সেটুকুই ব্যয় করেন। অন্যদের ওপর নির্ভর হতে চান না। নিয়ম মেনে চলাফেরা ও খাবার খান। এজন্য ১২০ বছর বয়সেও তার কোনো জটিল অসুখ বিসুখ নেই।’
বয়সের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও মানুষের প্রয়োজনে পাশে থাকার এই অভ্যাস তিনি ধরে রেখেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে এ ধরনের মানবিক কাজ করে যেতে চান তিনি।
আরও পড়ুন: ময়মনসিংহে সেলুনে ঢুকে নরসুন্দরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, স্ত্রী অভিযুক্ত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন