০২:৩৫ পি.এম
বরিশালের নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড ও সংলগ্ন টেম্পোস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পরিবহন মালিক সমিতির মধ্যে বিরোধ ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। এর জেরে পরপর দুই দিন বাস ও থ্রি-হুইলার শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ, বাস চলাচল বন্ধ এবং সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটের হাজারো যাত্রীকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরওয়ারের দুই ভাই যথাক্রমে বাস মালিক সমিতি ও আলফা-থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির নেতৃত্বে থাকায় তাদের প্রভাবকে কেন্দ্র করে পরিবহন খাতে বারবার উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। যদিও দুই সংগঠনের নেতারা এটিকে পারিবারিক দ্বন্দ্ব নয়, সাংগঠনিক বিষয় বলে দাবি করেছেন।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবহন শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেন সংসদ সদস্যের ভাই মোশারেফ হোসেন। একই সময়ে বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন টেম্পোস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেন অপর ভাই মিজানুর রহমান অহিদ। তাদের বিরুদ্ধে কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ না করেই সংশ্লিষ্ট মালিক সমিতির নেতৃত্ব দাবি করে স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের আরও অভিযোগ, দুই সংগঠনের প্রভাবকে কেন্দ্র করে নগর ও আশপাশের বিভিন্ন রুটে ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের হয়রানি করা হচ্ছে। আলফা, টেম্পো, অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। ভাড়া নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে যাত্রীদের চালকদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ানোর ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অন্যদিকে বাসশ্রমিকদের অভিযোগ, রহমতপুর, বানারীপাড়া, উজিরপুর, সানুহার ও গৌরনদীসহ বিভিন্ন রুটে মহাসড়কে থ্রি-হুইলার ও সিএনজি চলাচল করছে। বাসের সামনে এসব যানবাহন থামিয়ে যাত্রী তোলায় বাসের যাত্রীসংখ্যা ও আয় কমছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে শ্রমিকদের ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি তাদের।
গত সোমবার বানারীপাড়া এলাকায় বাসের সামনে থ্রি-হুইলার থামিয়ে যাত্রী ওঠানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনায় বরিশাল থেকে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বাস চলাচল বন্ধ থাকে। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এর পরদিন মঙ্গলবার সকালে রহমতপুর এলাকায় থ্রি-হুইলার শ্রমিকদের বিরুদ্ধে দুটি বাসের চালককে মারধরের অভিযোগ ওঠে। আহত দুই চালককে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে বাসশ্রমিকরা আবারও কর্মবিরতির ঘোষণা দেন।
তাদের দাবি ছিল, চালকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কসহ অন্যান্য মহাসড়কে অবৈধভাবে চলাচলকারী মাহিন্দ্রা ও থ্রি-হুইলার বন্ধ করা।
এরপর মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে দূরপাল্লাসহ বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। আটকা পড়ে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন। বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষমাণ যাত্রীরাও পড়েন চরম ভোগান্তিতে। জরুরি প্রয়োজনে অনেক যাত্রীকে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বিকল্প যানবাহনে গন্তব্যে যেতে হয়।
বরিশাল মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাছরিন বলেন, নথুল্লাবাদ বাস ও টেম্পোস্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যক্তিরা বিএনপির কোনো পদধারী নেতা নন। সংসদ সদস্যের ভাই হওয়ার প্রভাব দেখিয়ে তারা স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, এমন কর্মকাণ্ড বিএনপি কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
নথুল্লাবাদ বাসশ্রমিক আরজু মৃধার অভিযোগ, সংসদ সদস্যের দুই ভাইয়ের একজন বাস মালিক সমিতি এবং অপরজন আলফা-থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন। একই পরিবারের দুই ভাই দুটি সংগঠনের নেতৃত্বে থাকার পরও বিরোধের স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।
আরেক বাসশ্রমিক মো. রাশেদ বলেন, বিরোধ দিন দিন বাড়ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে যাত্রী দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
তবে আলফা-থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান অহিদ বলেন, দুই ভাইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকলে তা পারিবারিক পর্যায়ে থাকবে, রাস্তায় এর প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই। চলমান সমস্যা সংগঠনকেন্দ্রিক। তিনি বাবুগঞ্জ-মীরগঞ্জ রুটে পুরোনো বিরোধের কারণে বাস চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়টিও স্বীকার করেন।
বাস মালিক সমিতির সভাপতি মোশারেফ হোসেন বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে বাস মালিক এবং আলফা-থ্রি-হুইলার মালিক-শ্রমিকদের বৈঠকের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। বিকেল ৫টার পর সব রুটে বাস চলাচলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুই ভাই একই পরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও কেন বারবার এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে—এ বিষয়ে তিনি এটিকে সাংগঠনিক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
বরিশাল জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার জানান, সোমবারের ঘটনার পর দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছিল। মঙ্গলবার আবারও বিরোধের জেরে বাস চলাচল বন্ধ হলে দুপুর আড়াইটার দিকে উভয় পক্ষকে নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করা হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টার আলোচনার পর বিরোধ মীমাংসা করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় না জড়ানোর বিষয়ে উভয় পক্ষকে অঙ্গীকার করানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, ভবিষ্যতে যাত্রীদের কোনো ধরনের হয়রানি বা পরিবহন অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৈঠকের পর বিকেল ৫টা থেকে বরিশালের বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, সাময়িক বৈঠক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে এ ধরনের অচলাবস্থা আবারও দেখা দিতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ যাত্রী ও পরিবহনসেবার ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন