১১:৫৩ এম
যুক্তরাজ্যে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে প্রতিবাদে অংশগ্রহণের জন্য ৪০০ জনের বেশি মানুষ জড়ো হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। আগামী ৩১ অক্টোবরের এই কর্মসূচির মাধ্যমে তারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রতিবাদ জানাতে চান। একই দিনে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে একই ধরনের কর্মসূচি পালনের কথাও রয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা হাতে প্ল্যাকার্ড বহন করবেন, যাতে লেখা থাকবে, ‘আমি গণহত্যার বিরোধিতা করি। আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি।’ কর্মসূচির আয়োজক সংগঠন ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এটি তাদের সর্বশেষ গণপ্রতিবাদ।
যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকে প্রকাশ্যে গোষ্ঠীটিকে সমর্থন জানানোর অভিযোগে ৩ হাজার ৮৫০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস।
আরও পড়ুন: সৌদির বিরুদ্ধে এপস্টেইন নথি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে হুথিরা
আসন্ন বিক্ষোভের গুরুত্ব রয়েছে। গত জুনে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত সরকারের পক্ষে রায় দিয়ে হাইকোর্টের আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। হাইকোর্টের ওই রায়ে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে বেআইনি বলা হয়েছিল। আগামী ৪ ও ৫ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি হওয়ার কথা। গোষ্ঠীটির সহপ্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরি এই আপিল করেছেন।
ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বাইরে গোষ্ঠীটির আগের এক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী তেরেসার সঙ্গে আলজাজিরা কথা বলেছিল। সাবেক শিক্ষক তেরেসা এখন আন্দোলনকর্মী। নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আলজাজিরাকে তেরেসা বলেন, ‘গাজার জন্য এভাবে প্রতিবাদ করতে পারা সম্মানের বিষয়।’ তার মতো আরো অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সংগীতশিল্পী দল ম্যাসিভ অ্যাটাকের রব ডেল নাজা, ৯৪ বছর বয়সি মানবাধিকার আইনজীবী মার্গারেট ওয়েন, সাবেক সরকারি উপদেষ্টা জোনাথন পোরিট এবং রেভারেন্ড সু পারফিট।
কেন মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ
আরও পড়ুন: কিমের নির্দেশ: বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
আয়োজকেরা মনে করেন, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ কাজ করে থাকতে পারে। এই বিষয়টি সামনে আনতেই তারা লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভের পরিকল্পনা করেছেন।
স্কটল্যান্ডে ট্রাম্পের টার্নবেরি গলফ মাঠে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কর্মীদের রং ছিটানোর একটি ঘটনার পর গোষ্ঠীটিকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ওই কর্মকাণ্ডকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদক্ষেপের প্রশংসা করেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চলার সময় জানা যায়, ২০২৫ সালের মার্চে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিয়ে ট্রাম্প ও স্টারমারের মধ্যে দুই দফা ফোনালাপ হয়েছিল। স্টারমার স্কটল্যান্ডের পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রেপ্তারের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য চেয়েছিলেন এবং ট্রাম্পকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন।
নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে ট্রাম্পের ছেলে এরিক ট্রাম্প স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনির সঙ্গে বৈঠক করেন। তথ্য অধিকার আইনে প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ওই বৈঠকে টার্নবেরির প্রতিবাদের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের প্রতিরক্ষায় ৩ বছরে ১১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র: আব্বাস আরাগচি
হ্যালোইন উপলক্ষে ৩১ অক্টোবরের এই বিক্ষোভের তিন দিন আগে গ্লাসগোর হাইকোর্টে টার্নবেরির ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারসংক্রান্ত শুনানি হওয়ার কথা। ওই ঘটনায় সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। সরকারি কৌঁসুলিরা এখন তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সাজা দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছেন। সমালোচকেরা এই পদক্ষেপকে ‘সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
একই সপ্তাহে ওয়াশিংটনও প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। ডিফেন্ড আওয়ার জুরিসের দাবি, এর ফলে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই চালানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারছেন না আম্মোরি।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি বাড়ছে
এ সপ্তাহে অভিনেতা পল মেসকাল, জেসি বাকলি ও সুসান সারান্ডন এবং সম্প্রচারক গ্যারি লিনেকারসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। নিউ স্টেটসম্যান সাময়িকীর প্রচ্ছদে প্রকাশিত ওই চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকারের কাছে ‘কঠোর’ আইনটি প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: ক্রিপ্টোকারেন্সি কেলেঙ্কারির অভিযোগে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের মামলা খারিজ
আন্দোলনকারীদের দাবি, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার ফলে আইরিশ ঔপন্যাসিক স্যালি রুনির বইয়ের যুক্তরাজ্যে বিক্রিও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। রুনি গোষ্ঠীটির সমর্থক।
তবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েলের স্ত্রী ও লেখক সারাহ হেলম প্রকাশ্যে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি সমর্থন জানালেও লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ডিফেন্ড আওয়ার জুরিসের মতে, এ ঘটনা দেখায় যে নিষেধাজ্ঞা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা শামি চাকরাবর্তীও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। এলবিসি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক এই ছায়া অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, নিষেধাজ্ঞাটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে হাস্যকর করে তুলছে। কোনো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, ‘আমি কী বলছি, তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। নইলে আমাকেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে।’
আরও পড়ুন: মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কানাডার কিছু পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার ট্রাম্পের
সরকারের যুক্তি, পাল্টা বক্তব্য
ব্রিটিশ সরকারের যুক্তি, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সদস্যরা প্রতিরক্ষা স্থাপনায় ঢুকে পড়া ও সম্পদের ক্ষতিসাধনের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। ইসরাইলি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাও এসব ঘটনার লক্ষ্যবস্তু ছিল।
সরকারের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে গোষ্ঠীটিকে নিষিদ্ধ করার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
আপিল আদালত প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে গোপন সেল বা ছোট ছোট গোপন দলের মাধ্যমে পরিচালিত একটি সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
আরও পড়ুন: যুক্তরাজ্যে তিন দিনের জরুরি রসদ রাখার পরামর্শ
তবে ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস বলেছে, তাদের প্রতিবাদ সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। সংগঠনটির এক মুখপাত্র বলেন, ‘এই গণপ্রতিবাদ এবং এর পর যে গণগ্রেপ্তার হতে পারে, তা সুপ্রিম কোর্টের শুনানির মাত্র কয়েক দিন আগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারগুলোকে সামনে নিয়ে আসবে।’
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন