০২:৪০ পি.এম
বাংলাদেশে নিয়োগ এবং বদলি বাণিজ্য দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একটি সংগঠিত দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্র সরকারি চাকরির পদোন্নতি এবং বদলিতে তদবির করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন সরকারের সময়কালেও এরা প্রশাসনের অন্দরমহলে প্রবেশ করে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে।
যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, তখন এই দালালরা সেই দলের লোক হয়ে যায়। তারা সহজেই নিজেদের রং পরিবর্তন করতে সক্ষম। এদের কারণেই প্রশাসনে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারের বদনাম হয়।
যে চাকরিজীবী কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পদে নিয়োগ পান, তার প্রধান কাজ হয়ে যায় ঘুষের টাকা উদ্ধার করা। ফলে নতুন পদে আসীন হয়ে তিনি জনগণের সেবা না করে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। যেহেতু তিনি ঘুষ দিয়ে চেয়ারে বসেছেন, তাই ওই সরকারি কর্মচারী জবাবদিহিতার উর্ধ্বে থাকেন। এভাবেই সরকারি অফিসে দুর্নীতি বিস্তৃত হয়।
আরও পড়ুন: ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে মরদেহ পরিবহনে বিপাকে স্বজনরা, রোগীরাও ভোগান্তিতে
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। দুর্নীতি প্রতিরোধে তারেক রহমান বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
এতে তিনি নিজে যেমন কৃচ্ছতার নীতি অনুসরণ করছেন, তেমনি সরকারের প্রতিটি স্তরে অপচয় বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তবে দুর্নীতি দমনে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর মধ্যে একটি হলো সরকারি অফিসে বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি চালু করা।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইতিমধ্যে কয়েকটি পদে লটারির মাধ্যমে বদলি পদ্ধতি কার্যকর করা হয়েছে। সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো লটারির মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার বদলি করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় বদলি প্রক্রিয়ায় ‘স্বচ্ছতা নিশ্চিত’ করতে সাব-রেজিস্ট্রারদের লটারির মাধ্যমে বদলি করছে। এর ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত এই পদে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এটি যে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ, তা প্রমাণিত হয়েছে।
অতীতে ভূমি অফিসের পদায়ন ছিল ঘুষের খনি। সাব-রেজিস্ট্রার পদ ঘিরে এখানে ঘুষ লেনদেন হতো। এই সাব-রেজিস্ট্রাররাই হলেন এই খাতের কালেক্টর, যারা জনগণের কাছ থেকে সরাসরি অর্থ আদায় করেন। এই টাকা পদ অনুযায়ী বণ্টন হতো সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। সাব-রেজিস্ট্রারের কিছু নির্দিষ্ট পদ ছিল, যেগুলো বিক্রি হতো নিলামে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
গুলশান, গাজীপুর, রূপগঞ্জ, কেরানীগঞ্জের মতো স্থানে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়নের জন্য কয়েক কোটি টাকা লাগতো। এই বদলি লটারির মাধ্যমে সরকার দুর্নীতি বন্ধে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে।
তবে সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নে দুর্নীতি হ্রাস পেলেও অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন বানিজ্য এখনো অব্যাহত রয়েছে। দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এখনো সক্রিয়।
শুধু সাব রেজিস্ট্রার নয়, সরকারি ব্যাংকের এমডি থেকে চিকিৎসক—সব সরকারি কর্মচারীদের বদলির ক্ষেত্রে তদবির এবং ঘুষ লেনদেনের প্রবণতা এখনো লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে নিম্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পছন্দের স্থানে বদলি হতে হলে দালালদের মাধ্যমে লেনদেনের রেওয়াজ অনেক পুরনো। কিছু লাভজনক পদ বিক্রি হয় কোটি কোটি টাকায়।
যে কর্মকর্তা বিপুল অঙ্কের অর্থ দিয়ে বদলি হন, তার প্রথম কাজ হয় বিনিয়োগের টাকা তোলা। এরপর তিনি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হন। সচিব থেকে শুরু করে নিম্ন স্তরের কর্মকর্তাদের লাভজনক পদ পেতে ঘুষ দিতে হয়। কর্মচারীদেরও লোভনীয় পদে যেতে উৎকোচ দিতে হয়। সরকারি চাকরিতে কিছু চিহ্নিত পদ রয়েছে, যেসব পদে টাকা ছাড়া পদায়ন অসম্ভব। আবার এলাকা ভেদে পদের দাম বাড়ে-কমে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এরকম অন্তত ২৫টি পদ আছে, যেখানে টাকা ছাড়া বদলি হওয়া সম্ভব নয়। দেশের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখানে দুর্নীতি হয় প্রধানত থানাকেন্দ্রিক। অতীতে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকার থানায় ওসি পদে আসতে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা খরচ করতে হতো। এখনো পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধুমাত্র ওসি নয়, এসব থানার কনস্টেবল পদে আসতেও গুনতে হয় লাখ টাকা।
একজন পুলিশ সদস্য যখন ঘুষ দিয়ে একটি পদে আসেন, তখন তিনি সৎ থাকবেন কিভাবে?
নিম্ন আদালতের বিচারকদের পদায়নেও হয় ঘুষ লেনদেন। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিচারকদের বদলিতে ঘুষ নেওয়ার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। এই সময় নিম্ন আদালতের বিচারক বদলিতে কোটি টাকার লেনদেন হয়। সবচেয়ে বেশি ঘুষ লাগে ঢাকা এবং তার আশপাশের এলাকায় পদায়নের জন্য।
ইউনূস আমলে সচিব পর্যায়ে পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে। ডিসি নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে জনপ্রশাসন সচিব বদলি হন। এই সময় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর পদায়ন বাণিজ্যের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংক, বীমা কোম্পানির এমডি হবার জন্য কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংকের এমডি নিয়োগ নিয়ে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী দালালের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ইত্যাদি বিভাগে নিম্ন পদের চেয়ে উচ্চ পদ অনেক ব্যয়বহুল। ২০২৩ সালে একটি প্রধান প্রকৌশলীর পদ শতকোটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়েছিল। এসব সরকারি দপ্তরে কিছু চিহ্নিত জেলা ও পদ আছে, যেসব পদে বদলি হওয়ার জন্য রীতিমতো নিলাম হয়।
চিকিৎসকদের পদায়নেও বাণিজ্য হয়। একজন চিকিৎসককে ঢাকায় বদলি হতে লাখ টাকা গুনতে হয়। ঢাকার বাইরে কোনো চিকিৎসক থাকতে চান না। কারণ সবকিছু ঢাকামুখী, ঢাকা কেন্দ্রিক। ইউনূস আমলে ৩ হাজার মেডিক্যাল অফিসার ও ৫০০ কর্মচারীর চেয়ার রদবদল করা হয়েছে। এত স্বল্প সময়ে অতীতে এমন বদলি হয়নি অধিদপ্তরে। বদলি হওয়া অনেক চিকিৎসক জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মস্থলে যোগ দেননি। তদবির করে ঢাকা এবং তার আশপাশে বদলি হয়েছেন। ফলে গ্রামে চিকিৎসক নেই।
ফলে বদলি ও পদায়ন বানিজ্যের কারণে, একদিকে যেমন একটি দুর্নীতিবাজ দালাল গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা গোটা সরকার পদ্ধতিকে কুলষিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত করছে, অন্যদিকে জনগণ সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
আশার কথা, তারেক রহমানের সরকার দুর্নীতির এই উৎসমুখ বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য সাব রেজিস্ট্রার বদলিতে প্রথমবারের মতো লটারি পদ্ধতি চালু করেছে। এটি একটি অসাধারণ উদ্যোগ। এর ফলে দেশের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত এই সেক্টরে দুর্নীতি অনেক কমে যেতে শুরু করেছে। যারা ঘুষ ছাড়া লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং লাভজনক এলাকায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, তারা আগের মতো বুভুক্ষের মতো দুর্নীতিতে নিমজ্জিত নন। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকছেন এবং জনগণের সেবায় মনোযোগী হয়েছেন।
লটারির মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার বদলি মাধ্যমে দুর্নীতি বন্ধে যে প্রশংসনীয় উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও অনুসরণ করতে পারে। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি কয়েকটি মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে পদায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। লটারির মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন করা হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।
বদলি বাণিজ্য বন্ধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে পদায়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংক, বীমার প্রধান নির্বাহী পদায়নের ক্ষেত্রেও যোগ্যদের ফিট লিস্ট করে লটারির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে কেবল দুর্নীতি কমবে না, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
আরও পড়ুন: কুড়িগ্রামে দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চার খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
সরকারের সেবামূলক সব প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতি অনুসরণ করে বদলি ও পদায়ন করতে পারে। যেমন ধরা যাক, জেলা প্রশাসক পদায়ন নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যদি ফিট লিস্টে থাকা যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করে যে, কোন জেলায় কে ডিসি পদে নিয়োগ পাবেন, তাহলে সহজেই বিতর্ক এড়ানো সম্ভব। একইভাবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা চিকিৎসক পদে বদলির ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি একটি সহজ সমাধান।
একজন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী যদি ঘুষ না দিয়ে একটি পদে বসেন, তাহলে একদিকে যেমন তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত হবেন না, অন্যদিকে তিনি জবাবদিহির আওতায় আসবেন। ভালো কাজ করে জনগণের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করবেন। এতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আবহ সৃষ্টি হবে।
তাহলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে লটারির মাধ্যমে পদায়ন ও বদলি। শুধু কয়েকটি সরকারি বিভাগে নয়, সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়ন বানিজ্য বন্ধ করতে পর্যায়ক্রমে লটারি পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। এটি বর্তমান সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানকে অনেকখানি সফল করতে পারে।
অদিতি করিম
লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল : [email protected]
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন