০৪:১৫ পি.এম
শৈশবেই বাবাকে হারানোর পর শেফালী বেগমের পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল। পরিবারের আর্থিক সংকট এবং সংসারের দায়িত্বের চাপের কারণে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছিল তাকে। বিয়ে, স্বামী ও সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে করতে দীর্ঘ সময় কেটে গেছে। তবে শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্নটি কখনো হারিয়ে যেতে দেননি শেফালী। অবশেষে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করে তিনি এলাকায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ নক্তপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শেফালী বেগম। তিনি মকছেদুল আলম মঞ্জুর স্ত্রী। ৪৮ বছর বয়সে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে ২০২৬ সালের এইচএসসি (বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় তিনি জিপিএ ৩.৯৬ এবং ঐচ্ছিক বিষয়সহ জিপিএ ৪.২১ অর্জন করেছেন। তিনি গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শেফালী ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে তার ভালো ফলাফল ছিল। কিন্তু বাবাকে হারানোর পর পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বিয়ে হয়। এরপর স্বামীর সংসারে এসে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষতা উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম ‘ক্যানভাস’ এর যাত্রা শুরু
সংসার, স্বামী-সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব পালনের মধ্যেই শেফালীর জীবন কেটে গেছে। তবে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তাকে সবসময় তাড়িত করেছে। অবশেষে ২০২০ সালে স্বামী ও তিন সন্তানের অনুপ্রেরণায় আবারও পড়াশোনা শুরু করেন। সংসারের কাজ সামলে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০২৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় সফলতার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেন।
শুধু পড়াশোনা নয়, সামাজিক কর্মকাণ্ডেও শেফালী সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি টানা দুই মেয়াদে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
মায়ের এই অর্জনে পরিবারের সদস্যরাও আনন্দিত। তার মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুন বর্তমানে রংপুর সরকারি কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, ‘মায়ের এই অর্জন শুধু আমাদের পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, সমাজের অন্য নারী ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, শেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো বয়সেই স্বপ্ন পূরণ করা যায়।’
নিজের সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত শেফালী বেগম বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর গ্রামের কুসংস্কার রোধে আমার বিয়ে হয়। তখন আমি অষ্টম শ্রেণি পাস করেছি। এরপর সংসারজীবনে কাজের ব্যস্ততার কারণে আর পড়াশোনা করা হয়নি। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলোতে বরাবরই মেধাতালিকায় ছিলাম।’
আরও পড়ুন: জাবি ছাত্রীকে হেনস্তার অভিযোগে ইতিহাস পরিবহনের ১২ বাস আটক
তিনি আরও বলেন, ‘স্বামী ও সন্তানদের অনুপ্রেরণায় ২০২০ সালে আবার পড়াশোনা শুরু করি। ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২৯ পেয়ে পাস করি। আর ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হতে পেরে মনে হচ্ছে, জীবনের অনেক বড় একটি স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।’
শেফালীর স্বামী মকছেদুল আলম মঞ্জু বলেন, ‘আমার স্ত্রী পরিবারের কথা ভেবে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন পর হলেও নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন। এটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়। ভবিষ্যতেও তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথে পাশে থাকব।’
গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপ রায় বলেন, ‘দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছি। শেফালী বেগমের সাফল্য প্রমাণ করে, শিক্ষার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। প্রয়োজন শুধু প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়। তার সাফল্যে আমরা গর্বিত।’
৫২ বছর বয়সে শেফালী বেগমের এই অর্জন শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার কাছে হার না মানা, নিজের স্বপ্নকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার গল্প। তার এই সাফল্য সমাজের শিক্ষাবঞ্চিত নারীসহ সব বয়সী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
আরও পড়ুন: যবিপ্রবি ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি সামিউল, সাধারণ সম্পাদক শ্রেয়া
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন