০৯:০৫ পি.এম
লাহিজ গভর্নরেটের আল-মাকাতিনাহ রণাঙ্গনে তীব্র সংঘর্ষের ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত আটজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছে বলে শনিবার সরকার সমর্থিত ‘তুর আল-বাহাহ’ সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।
তাজ গভর্নরেটে ইয়েমেনী সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা তাইজের উপকণ্ঠে কয়েক দিনের প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর আল-আকরুদে ১২ জন হুতি যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। সেখানে সৌদি আরব সমর্থিত সরকারি বাহিনী হুতিদের অগ্রগতি রুখে দিয়েছে এবং তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে বলে দাবি করেছে।
তাইজের অন্যত্র সরকারি বাহিনী জানায়, তারা আল-শাকাব রণাঙ্গনে হুতিদের একটি আক্রমণ ব্যর্থ করে দিয়েছে। অপরদিকে সরকার সমর্থিত ‘হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্সেস’ আল-ওয়াজিয়াহ এলাকায় একটি ড্রোনের সাহায্যে হুতিদের একটি রসদবাহী যান ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া ‘সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডস’ লাহিজ সীমান্তের কাছে আল-মাদারিবাহ এলাকায় হুতিদের আস্তানায় লক্ষ্যভিত্তিক নিখুঁত হামলা চালানোর দাবি করেছে।
আরও পড়ুন: মুসলিমরা এখন নেতা বানাবে না, নিজেরাই নেতৃত্ব দেবে: ওয়াইসি
এদিকে, আল-জাওফ ও মারিবে সরকারি সেনা ও মিত্র 'পপুলার রেজিস্ট্যান্স' যোদ্ধারা তাদের আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। সামরিক কর্মকর্তারা জানান, আল-জাওফে হুতিদের সামরিক ঘাঁটি, ব্যারাক ও সেনা সমাবেশের ওপর কামান থেকে গোলাবর্ষণ ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে, সামরিক জোটের বিমানগুলো হুতিদের কমান্ড সেন্টার ও রসদ ডিপোতে বোমাবর্ষণ করেছে।
মারিবেও হুতিদের প্রতিরোধ লাইনে সরকারি বাহিনীর কামান ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটগুলো ধারাবাহিকভাবে গোলাবর্ষণ চালিয়েছে। গত মাসে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিরা (যাঁরা আনসারুল্লাহ নামেও পরিচিত) লোহিত সাগর উপকূলে সরকারের অনুগত বাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগত এলাকা দখল করার পর থেকেই ইয়েমেনের এই গৃহযুদ্ধ নতুন করে ভয়াবহ রূপ নেয়।
সৌদি আরব সমর্থিত সরকারি বাহিনী ক্ষয়ক্ষতির জবাবে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং পরবর্তীতে ‘ডন অব ইয়েমেন’ (ইয়েমেনের ভোর) অভিযান শুরু করে। এর মূল লক্ষ্য হলো ২০১৪ সালে হুতিদের দখলে চলে যাওয়া রাজধানী সানাসহ সমস্ত এলাকা পুনরুদ্ধার করা।
হেলিকপ্টার ধ্বংসের দাবি ও পাল্টাপাল্টি বিমান হামলা
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা নীতি ফাঁকা বুলি, দাবি বিরোধীদলীয় নেতা গাডি আইজেনকট
আকাশপথের যুদ্ধের বিষয়ে হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী হাজ্জাহ গভর্নরেটের আকাশে একটি সৌদি গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করেছে। বিমানটিকে তুর্কি নির্মিত ‘লেনটাটেক কারায়েল’ ড্রোন হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পর থেকে এটি এ ধরনের চতুর্থ ড্রোন যা তারা ধ্বংস করল।
হুতিরা আরও দাবি করে যে, তারা সৌদি আরবের সীমান্তপ্রদেশ নাজরানে একটি সৌদি ‘অ্যাপাচি’ হেলিকপ্টার গুলি করে ভূপাতিত করেছে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নাজরানে একটি এএইচ-৬আই স্কাউট হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে এবং এতে দুই জন ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া হুতি নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমগুলো সাদা গভর্নরেটের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ১০টি সৌদি বিমান হামলার খবর দিয়েছে।
অন্যদিকে আল-মুকাল্লা উপকূলের কাছে ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স’ (ইউকেএমটিও) সংস্থা জানিয়েছে, একটি স্পিডবোটে করে আসা অন্তত সাতজন সশস্ত্র ব্যক্তি একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এল এন জি)বাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। তারা ট্যাংকারটিকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছুড়লে জাহাজের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরা জবাবে সতর্কতামূলক দুটি ফাঁকা গুলি চালায়, যার ফলে হামলাকারীরা গতিপথ পরিবর্তন করে চলে যেতে বাধ্য হয়।
আরও পড়ুন: শিক্ষা, ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ: যুবসমাজ ইউরোপজুড়ে ফুঁসে উঠেছে
ঘনীভূত মানবিক বিপর্যয়
যুদ্ধক্ষেত্রের সংঘাতের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো বেসামরিক নাগরিকদের জীবন নিয়ে ঘোর সতর্কবার্তা জারি করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, ইয়েমেনে যুদ্ধ নতুন করে তীব্র হওয়ার পর থেকে ২,৩৩,০০০-এরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার মধ্যে কেবল তাইজ গভর্নরেটেই প্রায় ১,২১,০০০ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) সতর্ক করে বলেছে, তাইজ শহরটি বর্তমানে বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এখানকার ১২টি হাসপাতালে মাত্র চার দিনের জ্বালানি অবশিষ্ট রয়েছে এবং সার্জিক্যাল সামগ্রী পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। ক্রমবর্ধমান কলেরা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে অক্সিজেন ও জরুরি ওষুধের সংকট সেখানে চরম আকার ধারণ করেছে।
এই বাস্তুচ্যুতির সংকট এখন পূর্ব আফ্রিকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) নিশ্চিত করেছে যে ৪,০০০-এরও বেশি ইয়েমেনি শরণার্থী ইতোমধ্যেই ওই অঞ্চলে পৌঁছেছেন—যার মধ্যে জিবুতিতে ৩,৮০০ জন এবং সোমালিয়ায় প্রায় ২০০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। জিবুতির মার্কাজি শরণার্থী শিবিরে চিকিৎসকরা কলেরা প্রাদুর্ভাবের চিকিৎসা দিচ্ছেন বলেও জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর, যেখানে এখন পর্যন্ত ৩১ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
আরও পড়ুন: ফের অশান্ত ভারতের মণিপুর, মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনে নিহতদের লাশ রেখে বিক্ষোভ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন