০২:৫৩ পি.এম
দিনাজপুর, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ : দিনাজপুর মহারাজার ঐতিহাসিক রাজ সিংহাসন বর্তমানে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। পর্যটকরা ঢাকা জাদুঘরে মহারাজার সিংহাসন সম্পর্কিত তথ্য জানতে পারছেন।
দিনাজপুর রাজ দেবত্বর স্টেটেট এজেন্ট মি. রনজিৎ সিংহ গতকাল মঙ্গলবার বাসস’কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি আরও জানান, এই জেলা শহরের নিকটবর্তী রাজবাড়ী দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় ছিল, যেখানে ঝোপঝাড় ও ময়লা আবর্জনার স্তুপ জমে গিয়েছিল। বর্তমান জেলা প্রশাসক ও রাজ দেবত্বর স্টেটের ট্রাস্টি মো. রফিকুল ইসলাম এর প্রচেষ্টায় রাজবাড়ীর সেই অবস্থা পরিবর্তন করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। যা বাইরের পর্যটকদের রাজবাড়ী পরিদর্শনে আকৃষ্ট করছে।
আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানিকগঞ্জ থেকে সুজন সাহা গ্রেপ্তার
জেলা প্রশাসক জানান, বর্তমানে দিনাজপুর রাজবাড়ী পরিদর্শনে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন ঘটছে এবং তারা সুন্দর ও মনোরম পরিবেশ দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন।
এই সুন্দর পরিবেশে সম্প্রতি শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উৎসাহ দেখা গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, অতীতে জেলার লোকজন ও নতুন প্রজন্ম আগ্রহ নিয়ে এই শহরের দিনাজপুর রাজবাড়ী দেখতে যেতো, কিন্তু সেখানে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরত। রাজবাড়ীতে একমাত্র একটি মন্দির ছাড়া কিছুই গোছালো ছিল না। দরবার হল, আয়না ঘর এবং অন্যান্য কক্ষগুলো ভেঙে পড়েছিল। পুকুর পাড়ে একটি ছোট বাসা অক্ষত থাকলেও তা ধংসের দ্বারপ্রান্তে ছিল। রাজবাড়ীর ভিতরে মাদকের আখড়া ও মাদকাসক্ত ছেলেদের আড্ডা বসতো।
তিনি বলেন, বর্তমানে এসব অনৈতিক কার্যক্রম জেলা প্রশাসক তথা রাজ দেবত্বর স্টেটের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দূর করা হয়েছে। রাজবাড়ী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। ঐতিহাসিক অবকাঠামোগুলোর মূল বিষয়বস্তু ঠিক রেখে সংস্কার করে একটি অবস্থানে নিয়ে আসা হয়েছে। এখন প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা রাজবাড়ী পরিদর্শন করে নিজেদের আত্মতৃপ্তি অনুভব করছেন।
আরও পড়ুন: নওগাঁ জেলা পুলিশের ঝটিকা অভিযান গত সন্ধ্যায় মহাদেবপুরের ০৯ লক্ষ ১৩ হাজার টাকা ছিনতাই, রাতের মধ্যেই ৩ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার ও ছিনতাইকৃত ০৯ লক্ষ ৩ হাজার টাকা উদ্ধার
দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন বাসস’কে জানান, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা জীবনে তার জন্মভূমি দিনাজপুরের ঐতিহাসিক রাজবাড়ী নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছেন, যা দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া তিনি দেশের বাইরে বা দেশের ভিতরে সেমিনারে অংশগ্রহণ করলে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক রাজবাড়ীর ইতিহাস তুলে ধরেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, রাজবাড়ীর ঐতিহাসিক স্থানগুলো সরকারিভাবে সংরক্ষণ করে পর্যটকদের নজরে আনা। বর্তমান জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে রাজবাড়ী তার বাস্তব রূপ পেতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, যদি রাজবাড়ীটি সংরক্ষণে পূর্ণাঙ্গ পর্যটনের আওতায় আনা যায়, তবে প্রতিদিন পর্যটকরা এখানে ভিড় করবে। এই খাত থেকে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হবে।
তবে এসব বিষয়ে সরকারের দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের এবং জেলা প্রশাসনের আগ্রহ প্রয়োজন এবং বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে।
রাজবাড়ী নিয়ে কোনো সংরক্ষণ বা পর্যটন নগর গড়ে তোলার পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত করা হয়নি। ফলে রাজবাড়ীর সম্পদ বেদখল হয়ে যাচ্ছে এবং রাজবাড়ীর অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। দীর্ঘদিন ধরে রাজবাড়ীর জমিতে অবৈধ দখলদাররা পাকা ভবন নির্মাণ করে বসবাস করছে। এ ধরনের অভিযোগ শহরের অসংখ্য মানুষের মধ্যে রয়েছে।
আরও পড়ুন: দুদক মহাপরিচালকের কাছে বরিশালের বাকেরগঞ্জের সাবেক কৃষি অফিসার রাসেল সিকদারসহ তিন জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ
দিনাজপুর হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক রতন সিংয়ের অভিযোগ, রাজবাড়ীর রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের উদাসীনতার কারণে সম্পদ একের পর এক দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে ঐতিহাসিক রাজবাড়ী বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তিনি দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, রাজবাড়ীর অস্তিত্ব রক্ষায় নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের সহযোগিতায় রাজবাড়ীর জবর দখলকারীদের বিতাড়িত করতে হবে। নইলে ঐতিহাসিক নিদর্শন বিলীন হয়ে গেলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দেখার কিছুই থাকবে না। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারেক রহমান দেশের ইতিহাস সংরক্ষণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ করা হলে এক রাজবাড়ী দিয়েই দিনাজপুরের ইতিহাস তুলে ধরা সম্ভব হবে। তুলে ধরা যাবে যে, দিনাজপুর দুই দিন আগের কোনো শহর নয়। হাজার বছর ধরে দিনাজপুর নামেই এই শহর পরিচিতি লাভ করে আসছে। আজ আমাদের দিনাজপুরের পরিচিত ধান-লিচু, কয়লা কিংবা পাথরের একটি জেলা হিসেবে। কিন্তু তুলে ধরা যেত এই জেলার আভিজাত্যের কথা।
কিন্তু তা না হয়ে কী হয়েছে? দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে, এখনও ঠিকমতো সংস্কার হয়নি রাজবাড়ীটি। রাজবাড়ীটি দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হতে পারতো। সেখানে একটি কক্ষে সংরক্ষণে থাকতো এই জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং আভিজাত্যের কথা।
আরও পড়ুন: সাদামাটির স্বর্গভূমি দুর্গাপুর: অতীত, আদিবাসী জীবন ও আগামীর উন্নয়ন ভাবনা
নতুন প্রজন্মকে পাঠ্য বইয়ের কোনো এক লাইনে বলা হলে যে, দিনাজপুর এক সময় প্রাচীন রাজ্য পুন্ড্রবর্ধনের একটি অংশ ছিল, তা বোঝানো যেত। কিন্তু রাজবাড়ীতে জাদুঘর স্থাপন কিংবা সেখানে এর ইতিহাস তুলে ধরলে অনেক বেশি বোঝানো যেত।
গুপ্ত ও পাল যুগের বিভিন্ন নিদর্শন দিনাজপুরের ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়। লক্ষৌতির রাজধানী দেবকোটের অবস্থান ছিল দিনাজপুরে। রাজবাড়ি মহারাজার গড়া দিনাজপুরে ঐতিহাসিক ৫টি দিঘির নামকরণ সাগর হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে রয়েছে, রামসাগর, মাতা সাগর, আনন্দ সাগর, সুখ সাগর ও জুলুম সাগর। রাম সাগর সারাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক জলভাগ ও নান্দনিক জলাশয় হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।
এই মহারাজার গড়া উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন দিনাজপুর কাহারোল উপজেলায় অবস্থিত কান্তনগর কান্তজি মন্দির এবং একই সাথে নয়াবাদ মসজিদ। এই কান্দজি মন্দিরের শতাধিক একর জমি এখন ভূমি দস্যুদের দখলে চলে গেছে।
দিনাজপুর মহারাজার ঐতিহাসিক সিংহাসনটি বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সিংহাসনটি হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি। দিনাজপুর থেকে সাড়ে ৪শ’ কিলোমিটার দূরে রাজধানীতে এসে জানা যাচ্ছে যে, দিনাজপুর রাজবাড়ীর সিংহাসন এখনো অক্ষত রয়েছে। এর সাথে আরো কিছু নিদর্শন বর্তমানে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন, তাই ভাঙা রাস্তায় পড়ছে নতুন পিচ!
দিনাজপুর সদর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. লোকমান হাকিম বাসস’কে জানান, তিনি সম্প্রতি ঢাকা জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সেখানে দিনাজপুর মহারাজার রাজ সিংহাসন দেখে কিছুটা খারাপ লেগেছে। তিনি বলেন, "আমি না হয় রাজধানীতে এসে এসব কিছু দেখতে পাচ্ছি। হাজারো নতুন প্রজন্ম এসব দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে, নতুন প্রজন্ম এসব ইতিহাস সম্পর্কে জানতে। নিশ্চয়ই একদিন নিজ জেলায় এমন কিছু গড়ে উঠবে, যেখানে এই জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য আভিজাত্য তুলে ধরা হবে। নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে তার জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য কি ছিল।"
দিনাজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপি’র সভাপতি অ্যাড. মো. মোফাজ্জল হোসেন দুলাল বাসস’কে বলেন, বিগত সময় যে সরকার দেশ পরিচালনা করেছে, তারা দেশের ইতিহাস সংরক্ষণ তো করেইনি বরং এসব ধংস করে গেছে। বর্তমান বিএনপি সরকার এসব ঐতিহাসিক স্থান ও নিদর্শন সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন