০৫:১১ এম
বিছানার পাশে রাখা পানির গ্লাস এবং সকালে এক ফোঁটাও পানি না খেয়ে তা ফেলে দেওয়া, বাইরে থেকে দেখলে এটি সম্পূর্ণ অর্থহীন এবং অপচয়কারী অভ্যাস মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আচরণ অযৌক্তিক হলেও, মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বিছানার পাশে গ্লাস রাখা পানি তৃষ্ণা মেটানোর চেয়ে অনেক বেশি গভীর গুরুত্ব বহন করে।
গবেষকদের মতে, মানুষ প্রায়শই পরিবেশের ছোট ছোট উপাদানের ওপর নির্ভর করে নিজেদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কমাতে এবং প্রস্তুতির ভাব তৈরি করতে। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো সরাসরি কোনো সমস্যা সমাধান না করলেও, এগুলো মস্তিষ্ককে বার্তা দেয় যে, তারা আগাম সব ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত।
মনোবিজ্ঞানে ‘সেফটি কিউ’ বা নিরাপত্তা সংকেত বলতে এমন সচেতন লক্ষণ বোঝায়, যা মনের ভেতরের ভয় বা অনিশ্চয়তা কমাতে সাহায্য করে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে যে, চেনা এবং পুনরাবৃত্তিমূলক এই অভ্যাসগুলো মানসিক চাপের মোকাবিলায় সহায়ক। বিছানার পাশে রাখা পানির গ্লাসটি অবচেতনভাবে মস্তিষ্ককে শান্ত রাখতে সহায়তা করে। এটা এক নীরব বার্তা দেয়, ‘যদি হঠাৎ তৃষ্ণা পায় বা অস্বস্তি হয়, তবে সমাধান হাতের নাগালের মধ্যে রয়েছে।’
আরও পড়ুন: ‘পর্যটন মেলা, ২০২৬’ বৃহস্পতিবার শুরু, প্রযুক্তি ও টেকসই পর্যটন নিয়ে আলোচনা
দিনের আলোতে বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও, রাতের অন্ধকার মানুষের চিন্তাভাবনাকে বদলে দেয়। সব কোলাহলে যখন থমকে যায়, তখন মস্তিষ্ক দিন শেষে অসমাপ্ত কাজগুলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি প্রস্তুত করে রাখা মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।
নিদ্রা গবেষকদের মতে, ঘুমানোর সময় মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সতর্কতা কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ নিজেদের শোবার ঘরকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক আচরণ করে থাকে। বারবার দরজার তালা পরীক্ষা করা বা পরিচিত জিনিসপত্র নির্দিষ্ট স্থানে গুছিয়ে রাখা এই আচরণের অংশ। বিছানার পাশে পানির গ্লাসটিও একইভাবে কাজ করে, এটি হয়তো রাতের সব অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে না, তবে সম্ভাব্য শারীরিক অস্বস্তির একটি বড় দুশ্চিন্তা দূর করে।
অতিরিক্ত, অনেকেই ভাবেন, পানি যদি পান না করা হয়, তাহলে কেন এই নিয়ম মেনে চলা? যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউট’-এর গবেষণা প্রমাণ করে যে, স্বাস্থ্যকর ঘুমের জন্য শোবার ঘরের পরিবেশ এবং ঘুমানোর আগের নিয়ম অত্যন্ত জরুরি। যখন মানুষ অনুভব করে তাঁর চারপাশের পরিবেশ তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তখন ঘুম গভীর ও ভালো হয়। পানির গ্লাসটি হয়তো কখনো স্পর্শ করা হয় না, কিন্তু এর উপস্থিতিই মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে শোবার ঘরকে একটি ভৌগোলিক স্থান হিসেবে দেখা হয় না; এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ। মানুষ চারপাশের পরিবেশ বার বার মূল্যায়ন করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। যখন পরিবেশ নিরাপদ মনে হয়, তখনই মস্তিষ্ক বিশ্রাম নিতে প্রস্তুত হয়। এই প্রেক্ষাপটে, পানির গ্লাসটি একটি প্রতীকী সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
আরও পড়ুন: ডিকশনারি ডটকমের বর্ষসেরা শব্দ ‘ম্যাক্সিং’, জনপ্রিয় হলো কিভাবে
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই অভ্যাসের আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এর ব্যবহার না হওয়া। নিরাপত্তামূলক আচরণের কার্যকারিতা এর ‘ব্যবহার’ এর চেয়ে ‘উপস্থিতি’-র ওপর বেশি নির্ভর করে। শুধুমাত্র দ্রুত পৌঁছানোর সাহস নিয়ে, এটি একটা নিরাপত্তা সঙ্কেত। পরিশেষে বলা যায়, বিছানার পাশে রাখা পানি ফেলে দেওয়া অপচয় নয়, এটি মানুষের মানসিক শান্তির একটি কৌশল। এটি প্রমাণ করে, মানব মস্তিষ্ক প্রস্তুতি এবং সুরক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। রাতের অন্ধকারের গোপনে, পানির গ্লাসটি যেন এক নীরব প্রতিজ্ঞা, যেকোনো প্রয়োজনে প্রস্তুত।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন