০২:০২ পি.এম
সার সংকট মোকাবেলার জন্য সারা দেশে নতুন করে বিসিআইসির সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ দলের নেতাকর্মীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। ডিলার নিয়োগের সময় নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। দলের নেতাদের স্ত্রী, অনার্স পড়ুয়া কন্যা, ছেলে, শ্বশুর, ফুফাতো ভাই, ভাতিজা, শ্যালক এবং অন্যান্য স্বজনদের নামে সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, দলীয় অফিসকে সার ডিলারের গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করার প্রমাণও পাওয়া গেছে। এই মারাত্মক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির ঘটনা রংপুরের আট উপজেলায় ঘটেছে।
রংপুর-১ আসনের এমপি রায়হান সিরাজী গত রোববার রংপুর ডিসি সম্মেলনকক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা উপেক্ষা করে "বানরের পিঠা ভাগের মতো" বণ্টন করা হয়েছে। এটি দলীয়করণের একটি লজ্জাজনক উদাহরণ। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এসব অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। এর ফলে সার সংকট নিরসনের এই উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
পীরগঞ্জ উপজেলায় যাদের সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে উপজেলা বিএনপি সভাপতির স্ত্রী, যুবদলের সভাপতি, ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি এবং ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। পীরগঞ্জের ১ নম্বর চৈত্রকোল ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগ পেয়েছে মেসার্স রাজিব ট্রেডার্স, যার মালিক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রাজিবুল হাসান। ২ নম্বর ভেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের বিএনপি সভাপতির চাচাত ভাই তৌহিদুল ইসলাম, ৩ নম্বর বড়দরগা ইউনিয়নের বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, ৪ নম্বর কুমেদপুর ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি মোশাররফ হোসেন, ৫ নম্বর মদনখালি ইউনিয়নে পেয়েছেন রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলামের ভাতিজা মাজহারুল আনোয়ার। ৬ নম্বর ইউনিয়নে জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলামের বোন জামাই মো. নুরুজ্জামান, ৭ নম্বর বড় আলমপুর ইউনিয়নে ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. বাদশা মিয়া, ৮ নম্বর রায়পুর ইউনিয়নে পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদুন্নবী চৌধুরী পলাশের স্ত্রী মোছা. ফাহিমা আক্তার খানম, ৯ নম্বর পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বিএনপি সভাপতি মামুনুর রশিদ বাদলের স্ত্রী মোছা. শাহানা খানম, ১০ নম্বর শানেরহাট ইউনিয়নে ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নুর মোহাম্মদ খান, ১১ নম্বর পাঁচগাছি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. ইকরামুল হক, ১৩ নম্বর রামনাথপুর ইউনিয়নে পীরগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সভাপতি মো. আনিছুর রহমান, ১৪ নম্বর চতরা ইউনিয়নে ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নুর মোহাম্মদ মণ্ডল, ১৫ নম্বর কাবিলপুর ইউনিয়নের বিএনপির সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান, মেসার্স দিগন্ত ট্রেডার্স, প্রো. মোছা. দৌলতুন নাহার, যিনি মিঠিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক রায়হান প্রধানের স্ত্রী। পৌরসভা বিএনপির সভাপতি সাইফুল আজাদ মণ্ডল তার স্ত্রীর নামে লাকি বেগমের নামে সারের ডিলার নিয়োগ নিয়েছেন, অলিন ট্রেডার্সের নাম দিয়ে।
আরও পড়ুন: শ্বশুরের মৃত্যুর এক দিন পর মারা গেলেন পুত্রবধূ
পাঁচগাছী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি একরামুল হক উপজেলা বিএনপি অফিসকে সারের গোডাউন হিসেবে দেখিয়েছেন মেসার্স আজমল ট্রেডার্সের নামে।
পীরগাছা উপজেলায় একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ৯টি ইউনিয়নের তালিকায় বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদকসহ তাদের স্ত্রী, অনার্স পড়ুয়া কন্যা, ছেলে, শ্বশুর, ফুফাতো ভাইসহ স্বজনদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী, একজন ইউনিয়ন সভাপতির অনার্স পড়ুয়া কন্যা, একজন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকর শ্বশুর, সিনিয়র সহসভাপতির ছেলে, একজন সাধারণ সম্পাদকের ফুফাতো ভাইয়ের নাম রয়েছে। তালিকায় পীরগাছা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অনন্তরাম গ্রামের মোছা. সুলতানা ফেরদৌসির নামও রয়েছে, যিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী। অন্নদানগর ইউনিয়ন জগজীবনের জয়িতা আক্তার জিনি, যিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের বাংলা চতুর্থ বর্ষের অনার্সের শিক্ষার্থী।
মিঠাপুকুরে খোড়াগাছ ইউনিয়নের ডিলারশিপ পেয়েছেন ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আইয়ুব আলী, ভাংনীতে পেয়েছেন ইউনিয়ন সভাপতি মাহবুব আলম, কাফ্রিখালে পেয়েছেন ইউনিয়ন সভাপতি মোকলেছার রহমান, বালুয়া মাসিমপুরে পেয়েছেন ৬নং ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি মোজাফফর হোসেন, বড়বালায় পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাবুল ইসলামের ছেলে মোস্তাফিজর রহমান, মিলনপুরে পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সম্পাদক রবিউল ইসলাম, গোপালপুরে পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোতাহারুল ইসলাম নিক্সন পাইকারের স্ত্রী রেহেনা পারভীন, দুর্গাপুরে পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী ভাই আল আমিন সরকার, বড় হযরতপুরে পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর খালাতো ভাই মিরাজ আহমেদ, মির্জাপুরে পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হামিদ মিয়া এবং ইমাদপুরে পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সম্পাদক আব্দুল হান্নান মিয়া।
গংগাচড়া উপজেলায় বেতগাড়ী ইউনিয়নে মেসার্স মাহি ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী রুহুল কুদ্দুস, যিনি বেতগাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রিপন মিয়ার ছোট ভাই। কোলকোন্দ ইউনিয়নে এম এম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. গোলাম রব্বানী, যিনি উপজেলা বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক। বড়বিল ইউনিয়নে রাহি অ্যান্ড রাদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোছা. রুজিনা, যিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলীর স্ত্রী। গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নে মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোছা. মোসলেমা বেগম, যিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাঁদ সরকারের স্ত্রী। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নে তিস্তা করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী মোছা. জহুরা বেগম, যিনি বিএনপির উজেলার সাবেক সভাপতি ওয়াহেদুজ্জামান মাবুর স্ত্রী এবং জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শরীফ নেওয়াজ জোহার মা। গজঘণ্টা ইউনিয়নে মেসার্স এলএন্ডকে ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. লোকমান হোসেন, যিনি গজঘণ্টা ইউনিয়নের বিএনপির সহসভাপতি। মর্নেয়া ইউনিয়নে মেসার্স অনিমা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আমিরুল ইসলাম, যিনি মর্নেয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। আলমবিদিতর ইউনিয়নে মেসার্স লাবিবা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুর রউফ বুলু, যিনি আলমবিদিতর ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক। নোহালী ইউনিয়নে মেসার্স স্বপন সার ঘরের স্বত্বাধিকারী মো. মশিউর রহমান, যিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাঁদ সরকারের ভাগিনা। একই ধরনের চিত্র রংপুর সদর, রংপুর মহানগর, বদরগঞ্জ পৌরসভা, হারাগাছ পৌরসভা, তারাগঞ্জ, কাউনিয়া, বদরগঞ্জ উপজেলায়ও দেখা গেছে।
আরও পড়ুন: নেছারাবাদে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় দুজন
এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, সরকারের কর্মকর্তারা এই ঘটনায় জড়িত। তারা বলতে পারবেন কে ডিলারশিপ পেয়েছে।
রংপুর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান, যিনি এই কমিটির সভাপতি, বলেছেন, সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। আমাদের কাছে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য প্রস্তাবিত তিনটি নামের তালিকা নীতিমালার যোগ্যতার ভিত্তিতে কৃষি মন্ত্রণালয় চেয়েছিল, যা উপজেলা বাছাই কমিটি সম্পন্ন করেছে। আমরা শুধু সেই তালিকা ঢাকায় পাঠিয়েছি, সেখান থেকে চূড়ান্ত তালিকা করে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন