সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং
০৫:২৫ এম
সার্বিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনে জয় অর্জন করেছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন। রোববার অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুসিচ। এই ফলাফল বলকান অঞ্চলের দেশটিতে নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করবে। খবর রয়টার্সের।
জনতাবাদী ও জাতীয়তাবাদী নেতা ভুসিচ ২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট হিসেবে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।
দুর্নীতি এবং ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগে প্রায় দুই বছর ধরে চলা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে গত সেপ্টেম্বরে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন তিনি। ২০২৪ সালে নোভি সাদ শহরে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর এই আন্দোলন আরো জোরালো হয়ে ওঠে।
টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ভুসিচ বলেন, “এটা স্পষ্ট যে আমরা এই নির্বাচনে হেরে গেছি। শিক্ষার্থীদের তালিকা জয়ী হয়েছে।”
তার এই ঘোষণার পরপরই রাজধানী বেলগ্রেডের রাস্তায় আনন্দ-উল্লাস শুরু হয়। পরে সেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। গাড়ির হর্ন, মানুষের নাচ এবং শিক্ষার্থীদের “বিজয়” ও “তার খেলা শেষ” স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজপথ।
প্রায় ৬০ লাখ মানুষের দেশ সার্বিয়ায় এই জয়কে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের পরাজয়ের ঘটনার সঙ্গে এর তুলনা করা হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার অভাবের প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্যও সার্বিয়ার এই ফল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
প্রাথমিক ফলের ভিত্তিতে ভুসিচ জানান, ২৫০ আসনের সংসদে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকা ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে। তার দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) পেতে পারে ১০৫টি আসন।
বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাদোমির সাজিচ শিক্ষার্থীদের সদর দপ্তর থেকে বলেন, “প্রিয় সার্বিয়া, আজ রাতে জনগণের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। আজ রাতে আমরা বিজয় উদ্যাপন করছি, আগামীকাল ভবিষ্যৎ গড়ব।”
রেকর্ড ভোটার উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের জয়
রোববার ভোটগ্রহণের দিন দেশটির বিভিন্ন শহর ও জনপদের ভোটকেন্দ্রগুলোতে নজিরবিহীন দীর্ঘ সারি দেখা যায়। এমনকি বেলগ্রেডে ভোট দিতে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় ভুসিচকেও।
জরিপ সংস্থা ও নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছায়। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর এটিই দেশটিতে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি।
ভোটার কাতরিনা পেত্রোভিচ বলেন, “এত বেশি ভোটার উপস্থিতি আমাকে অবাক করেনি। কারণ, গত দুই বছরে বড় ও শক্তিশালী একটি গণআন্দোলন গড়ে উঠেছে।”
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকার সময় শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করে আবার প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন ভুসিচ। ক্ষমতাসীন নেতা হিসেবে তার অবস্থান ছিল শক্তিশালী। ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অনেকেই এত দ্রুত তার পরাজয় স্বীকারের বিষয়টি কল্পনাও করেননি।
ভুসিচের সমর্থকেরা তার সরকারের সময়ে অর্থনীতির আধুনিকায়ন এবং নতুন মহাসড়ক, রেলপথ, স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণের কৃতিত্ব তুলে ধরেন।
পরাজয় স্বীকার করলেও ভুসিচ বলেন, “কিছু ব্যবসায়ী, কিছু মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। কিন্তু আমাদের সংগঠন শক্ত অবস্থানে রয়েছে। আমরা ঐক্যবদ্ধ, শক্তিশালী এবং বিরোধী দলে থাকার অভিজ্ঞতা আমাদের আছে।”
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা এবং কুমিল্লার মধ্যে রেল যোগাযোগকে আরও সহজ ও দ্রুততর করার উদ্দেশ্যে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই প্রস্তাবিত রেলপথটি কুমিল্লা থেকে দাউদকান্দি, শ্যামপুর, ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে কুমিল্লা যাতায়াতের দূরত্ব কমানোর পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
নতুন রেলপথটির নাম ‘কুমিল্লা–ঢাকা নতুন রেলপথ’। এটি প্রচলিত রেলপথের বিকল্প হিসেবে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, রেলপথটির বড় অংশ উড়ালপথে নির্মাণ করা হবে এবং এতে কোনো লেভেল ক্রসিং থাকবে না।
বর্তমানে কুমিল্লা থেকে আখাউড়া, ভৈরব বাজার ও টঙ্গী হয়ে ঢাকায় যেতে হয়। নতুন রেলপথ চালু হলে বিদ্যমান পথের তুলনায় দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে যাবে। ফলে রাজধানীর সঙ্গে কুমিল্লার যোগাযোগ আরও দ্রুত হবে এবং চট্টগ্রামমুখী রেল চলাচলেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন রেলপথ চালু হলে ঢাকা–লাকসাম–চট্টগ্রাম রুটে যাত্রার সময় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টায় নেমে আসতে পারে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী রেলের বহরে নতুন কোচ ও ইঞ্জিন যুক্ত করা হবে। এতে ২৬০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ, ৩০টি লোকোমোটিভ, ২০০টি মিটারগেজ ক্যারেজ, চারটি হুইল লেদ এবং চারটি রিলিফ ট্রেন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই বিষয়টি নিশ্চিত করে কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, কুমিল্লা–ঢাকা সরাসরি নতুন রেললাইন স্থাপনের দাবিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তার মতে, নতুন কর্ড লাইন চালু হলে কুমিল্লার মানুষের রাজধানীকেন্দ্রিক যাতায়াত সহজ হবে। কুমিল্লায় বসবাস করেও ঢাকায় গিয়ে নিয়মিত অফিস করার সুযোগ তৈরি হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জুলহাস উদ্দিনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে। এই সাক্ষাৎ রোববার (২৫ অক্টোবর) বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি টেক্সটাইল শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং দেশের টেক্সটাইল খাতের চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, "দেশের টেক্সটাইল শিল্পের চাহিদা পূরণে শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে তাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে।" এতে দেশের দক্ষ জনশক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বাড়বে।
রাষ্ট্রপতি দেশের টেক্সটাইল শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা পূরণে তুলার দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি কৃষকদের উৎসাহিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং কৃষি ও টেক্সটাইল খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি পাট, আনারসের পাতা ও কলাগাছসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস থেকে তন্তু সংগ্রহ এবং সিনথেটিক সুতা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকালে প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশে বুটেক্সের ভূমিকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি, ‘বিসিএস (টেক্সটাইল)’ নামে পৃথক ক্যাডার সৃষ্টি, বাজেট সম্প্রসারণ এবং ঢাকার পূর্বাচলে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার জন্য জমি বরাদ্দসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
রাষ্ট্রপতি প্রতিনিধিদলের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তিনি উত্থাপিত বিষয়গুলো সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন এবং সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এ সময় উপাচার্য আগামী বছরের মার্চ মাসে বুটেক্সের দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরকে সভাপতিত্ব করার আমন্ত্রণ জানান। রাষ্ট্রপতি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আশ্বাস দেন।
প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন বুটেক্সের ফ্যাকাল্টি অব টেক্সটাইল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বিজনেস স্টাডিজের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব, ফ্যাকাল্টি অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক শিল্পী আক্তার, ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক ড. হাসিনা আখতার, ফ্যাকাল্টি অব টেক্সটাইল কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক ড. রাশেদা বেগম দিনা এবং ফ্যাকাল্টি অব ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. লামইয়া জাহির। এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বুটেক্সের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা ইসলাম তুলি উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব ও প্রেস সচিবও উপস্থিত ছিলেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ মোহাম্মদপুর থানার ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মাসুম খান রাজেশকে গ্রেফতার করেছে।
গ্রেফতারটি ঘটেছে রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে, মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকা থেকে।
ডিএমপির গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, রাজেশের বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে, যার জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এছাড়া, সম্প্রতি ডিএমপির প্রকাশিত চাঁদাবাজের তালিকায় রাজেশের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
যুগের আধুনিকতার কারণে হাওরাঞ্চলের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী পেশা কয়াল ও কয়ালি যন্ত্রের যাঁতাকলে হারিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লাসহ পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা ও ঠাকুরকোনা উপজেলার কয়েকশ কয়াল বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। তাদের দিন কাটছে অত্যন্ত মানবেতর ও দুঃখ-কষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে।
এক হাতে ডান্ডি এবং অন্য হাতে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নিজস্ব ঢং ও সুর-ছন্দে কয়ালদের মুখে মুখে রচিত ধারাপাতের বুলি আওড়ানোর দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। ‘এগারে-এগ, দুয়ারে-দুই, তিনারে-তিন, চৌনারে-চার, পোঁণারে-পাঁচ, ছয়ারে-ছয়, সাঁতারে-সাত, আটারে-আট’ বুলিতে ১০০ মণ (আটশ পাল্লা) ধান মেপে পারিশ্রমিক বা কয়ালি হিসেবে কয়ালরা পেতেন এক মণ ধান।
ধান পরিমাপে কয়ালকে আরও দুজন সহযোগী সাহায্য করতেন। একজন পাল্লায় ধান তুলে দিতেন এবং কয়াল মাপার পর অন্যজন পাল্লা থেকে চটের বস্তায় ধান ভরে দেয়ার কাজ করতেন। প্রতি চার পাল্লা মাপার পর পাল্লা ও পাথর অদলবদল করা হতো। অর্থাৎ এক পাল্লায় পাথর আর অন্য পাল্লায় ধান তুলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষের আস্থা, বিশ্বাস ও স্বার্থ রক্ষা করতেন কয়াল। বছরের বারো মাসই ধান মাপা নিয়ে ব্যস্ত থাকা সেই কয়ালরা আজ কর্মহীন ও বেকার। গৃহস্থের গোলাঘর, মাড়াখলা, মোকাম কিংবা আড়ত- সর্বত্র দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ধান মেপেই একসময় জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা।
কয়ালি পেশার শুরুতে তারা সনাতন পদ্ধতিতে সের হিসেবে ধান পরিমাপ করতেন। গজারি কাঠের তৈরি সোজা সমান্তরাল ডান্ডিতে পাটের মুষ্টি, লোহার হাতলযুক্ত পাঁচসেরি পাথর আর পোক্ত বেতের শক্ত বুননের পাল্লা অনেক আগেই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। বেতের পাল্লার বদলে একসময় প্লাস্টিকের পাল্লা এলেও শেষ পর্যন্ত কেজির মাপও হার মেনেছে আধুনিক মিটারের কাছে। সের ও কেজির বাটখারা এবং দাঁড়িপাল্লাকে চিরবিদায় জানিয়েছে ওয়েইং স্কেল। মুদি দোকান, আড়ত, মোকাম থেকে শুরু করে কৃষকের ধানের গোলাঘরও এখন ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্রের দখলে।
বিলুপ্তপ্রায় এ ঐতিহ্যবাহী পেশা নিয়ে কথা হয় মধ্যনগর উপজেলার রংচি গ্রামের কয়াল আব্দুর নূরের সাথে। অতীতের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘মধ্যনগর, দিরাই, শাল্লাসহ বেশ কয়েকটি উপজেলার ধানের আড়তে বার্ষিক চুক্তিতে কাজ করতেন শত শত কয়াল। এখন কয়ালও নেই, কয়ালিও নেই। কৃষকের গোলাঘর থেকে শুরু করে মোকাম ও আড়ত- সবখানেই ওয়েইং স্কেলে ধান মাপা হয়। কৃষক, আড়তদার ও ফড়িয়াদের সবার ঘরেই এখন মিটার। ফলে আড়তদারের তালিকা থেকেও হারিয়ে গেছে কয়াল ও কয়ালি পেশা।’ আব্দুর নূরের মতো কয়েকশ কয়াল এখন বাধ্য হয়ে পেশা বদলে দিনমজুরির কাজ করছেন।
স্থানীয়রা জানান, অতীতে গ্রামের ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড় ও প্রান্তিক চাষিদের ধান বিক্রির জন্য নিজস্ব কয়াল থাকতেন। গোলাঘর থেকে চার-পাঁচ মণ থেকে শুরু করে শত মণ ধান বিক্রির সময় কয়ালদের ডাক পড়ত। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ধানের মোকাম ও আড়তে শত শত মণ ধান মাপতেন তারা। কিন্তু ডিজিটাল যুগে ওয়েইং স্কেলের দাপটে শত বছরের সেই ঐতিহ্য আজ পুরোপুরি বিলুপ্তির মুখে।
কয়ালদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না; কখনো শেখা হয়নি বইয়ের গণিতের ধারাপাত। স্বশিক্ষায় শিক্ষিত এই কয়ালরা পূর্বপুরুষদের গণনার বুলি মুখস্থ করেই বংশপরম্পরায় ধান মেপে সংসার চালাতেন। ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জের গ্রামীণ হাটবাজারে কৃষিনির্ভর বাজারব্যবস্থায় ধানের ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে গভীর আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন তারা।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী মাপের শুরুতে ‘এক’ ও ‘শূন্য’কে তারা অকল্যাণকর মনে করতেন। তাই একের পরিবর্তে ‘এগারে-এগ’ এবং শূন্যের পরিবর্তে ‘আটারে-আট’ বলতেন। পাঁচসেরি পাথরে আট পাল্লা ধান মাপলে এক মণ হতো। তবে আধুনিক যুগে ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্রের বহুল ব্যবহারের কারণে গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই কয়াল শ্রেণি এবং তাদের মুখনিঃসৃত মিষ্টি সুরের বুলি আজ বিলুপ্তির পথে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ