প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুগের আধুনিকতার কারণে হাওরাঞ্চলের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী পেশা কয়াল ও কয়ালি যন্ত্রের যাঁতাকলে হারিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লাসহ পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা ও ঠাকুরকোনা উপজেলার কয়েকশ কয়াল বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। তাদের দিন কাটছে অত্যন্ত মানবেতর ও দুঃখ-কষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে।
এক হাতে ডান্ডি এবং অন্য হাতে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নিজস্ব ঢং ও সুর-ছন্দে কয়ালদের মুখে মুখে রচিত ধারাপাতের বুলি আওড়ানোর দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। ‘এগারে-এগ, দুয়ারে-দুই, তিনারে-তিন, চৌনারে-চার, পোঁণারে-পাঁচ, ছয়ারে-ছয়, সাঁতারে-সাত, আটারে-আট’ বুলিতে ১০০ মণ (আটশ পাল্লা) ধান মেপে পারিশ্রমিক বা কয়ালি হিসেবে কয়ালরা পেতেন এক মণ ধান।
ধান পরিমাপে কয়ালকে আরও দুজন সহযোগী সাহায্য করতেন। একজন পাল্লায় ধান তুলে দিতেন এবং কয়াল মাপার পর অন্যজন পাল্লা থেকে চটের বস্তায় ধান ভরে দেয়ার কাজ করতেন। প্রতি চার পাল্লা মাপার পর পাল্লা ও পাথর অদলবদল করা হতো। অর্থাৎ এক পাল্লায় পাথর আর অন্য পাল্লায় ধান তুলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষের আস্থা, বিশ্বাস ও স্বার্থ রক্ষা করতেন কয়াল। বছরের বারো মাসই ধান মাপা নিয়ে ব্যস্ত থাকা সেই কয়ালরা আজ কর্মহীন ও বেকার। গৃহস্থের গোলাঘর, মাড়াখলা, মোকাম কিংবা আড়ত- সর্বত্র দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ধান মেপেই একসময় জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা।
কয়ালি পেশার শুরুতে তারা সনাতন পদ্ধতিতে সের হিসেবে ধান পরিমাপ করতেন। গজারি কাঠের তৈরি সোজা সমান্তরাল ডান্ডিতে পাটের মুষ্টি, লোহার হাতলযুক্ত পাঁচসেরি পাথর আর পোক্ত বেতের শক্ত বুননের পাল্লা অনেক আগেই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। বেতের পাল্লার বদলে একসময় প্লাস্টিকের পাল্লা এলেও শেষ পর্যন্ত কেজির মাপও হার মেনেছে আধুনিক মিটারের কাছে। সের ও কেজির বাটখারা এবং দাঁড়িপাল্লাকে চিরবিদায় জানিয়েছে ওয়েইং স্কেল। মুদি দোকান, আড়ত, মোকাম থেকে শুরু করে কৃষকের ধানের গোলাঘরও এখন ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্রের দখলে।
বিলুপ্তপ্রায় এ ঐতিহ্যবাহী পেশা নিয়ে কথা হয় মধ্যনগর উপজেলার রংচি গ্রামের কয়াল আব্দুর নূরের সাথে। অতীতের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘মধ্যনগর, দিরাই, শাল্লাসহ বেশ কয়েকটি উপজেলার ধানের আড়তে বার্ষিক চুক্তিতে কাজ করতেন শত শত কয়াল। এখন কয়ালও নেই, কয়ালিও নেই। কৃষকের গোলাঘর থেকে শুরু করে মোকাম ও আড়ত- সবখানেই ওয়েইং স্কেলে ধান মাপা হয়। কৃষক, আড়তদার ও ফড়িয়াদের সবার ঘরেই এখন মিটার। ফলে আড়তদারের তালিকা থেকেও হারিয়ে গেছে কয়াল ও কয়ালি পেশা।’ আব্দুর নূরের মতো কয়েকশ কয়াল এখন বাধ্য হয়ে পেশা বদলে দিনমজুরির কাজ করছেন।
স্থানীয়রা জানান, অতীতে গ্রামের ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড় ও প্রান্তিক চাষিদের ধান বিক্রির জন্য নিজস্ব কয়াল থাকতেন। গোলাঘর থেকে চার-পাঁচ মণ থেকে শুরু করে শত মণ ধান বিক্রির সময় কয়ালদের ডাক পড়ত। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ধানের মোকাম ও আড়তে শত শত মণ ধান মাপতেন তারা। কিন্তু ডিজিটাল যুগে ওয়েইং স্কেলের দাপটে শত বছরের সেই ঐতিহ্য আজ পুরোপুরি বিলুপ্তির মুখে।
কয়ালদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না; কখনো শেখা হয়নি বইয়ের গণিতের ধারাপাত। স্বশিক্ষায় শিক্ষিত এই কয়ালরা পূর্বপুরুষদের গণনার বুলি মুখস্থ করেই বংশপরম্পরায় ধান মেপে সংসার চালাতেন। ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জের গ্রামীণ হাটবাজারে কৃষিনির্ভর বাজারব্যবস্থায় ধানের ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে গভীর আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন তারা।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী মাপের শুরুতে ‘এক’ ও ‘শূন্য’কে তারা অকল্যাণকর মনে করতেন। তাই একের পরিবর্তে ‘এগারে-এগ’ এবং শূন্যের পরিবর্তে ‘আটারে-আট’ বলতেন। পাঁচসেরি পাথরে আট পাল্লা ধান মাপলে এক মণ হতো। তবে আধুনিক যুগে ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্রের বহুল ব্যবহারের কারণে গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই কয়াল শ্রেণি এবং তাদের মুখনিঃসৃত মিষ্টি সুরের বুলি আজ বিলুপ্তির পথে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন