০৩:২৯ পি.এম
দেশের গ্রামীণ নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার পরিস্থিতি একটি গবেষণায় উদ্বেগজনকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা নারীদের মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন। অন্যদিকে, পুরুষদের মধ্যে এই হার ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মানে হলো, নারীদের রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার হার পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিশেষ করে, মাঝারি মাত্রার রক্তস্বল্পতায় নারীদের ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় ১১ দশমিক ৫৩ গুণ বেশি।
গবেষণাটি চট্টগ্রাম বিভাগের চারটি গ্রামীণ ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা প্রাপ্তবয়স্কদের তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিচালিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস’-এ গত ১০ অক্টোবর প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার তথ্য পাওয়া ৪৫৯ জনের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন।
গবেষণায় নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতায় আক্রান্তের হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে ২৭ শতাংশ মৃদু, ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ মাঝারি এবং ২ দশমিক ৬ শতাংশ তীব্র রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন।
আরও পড়ুন: চক্ষু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন সমন্বিত সচেতনতা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নারীদের মৃদু রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় ২ দশমিক ৫১ গুণ এবং মাঝারি রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি ১১ দশমিক ৫৩ গুণ বেশি। এছাড়া, স্বাভাবিক ওজনের মানুষের তুলনায় কম ওজনের ব্যক্তিদের মাঝারি মাত্রার রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩ দশমিক ৪২ গুণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের রক্তস্বল্পতার পেছনে অন্যতম কারণ হলো পুষ্টিহীনতা, মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, কম বয়সে বিয়ে ও মাতৃত্ব। গর্ভাবস্থা এবং সন্তান জন্মদানের সময় শরীরে পুষ্টির চাহিদা বেড়ে গেলেও অনেক নারী প্রয়োজনীয় আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ খাবার পান না, যার ফলে রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়ে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আফসানা হাবিব শিউলী গণমাধ্যমকে বলেন, "নারীদের পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাবার নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য পুষ্টিবিষয়ক শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।"
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, সব রক্তস্বল্পতার কারণ আয়রনের অভাব নয়। ফলেট ও ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, সংক্রমণ এবং বংশগত রক্তরোগের কারণেও এ সমস্যা হতে পারে। তাই রক্তস্বল্পতা শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
আরও পড়ুন: হামের টিকা বিতরণে অনিয়মের তদন্তে তিন সদস্যের কমিশন গঠন
গবেষণার সহগবেষক ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, "গ্রামীণ নারীদের নিয়মিত রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে কিশোরী, সন্তান ধারণের বয়সী নারী ও গর্ভবতীদের। পাশাপাশি আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের বড়ি গ্রহণ এবং চিকিৎসার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "খাবারের তালিকায় মাছ, মাংস, ডিম, ডাল ও শাকসবজি রাখতে হবে। আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি-যুক্ত ফল খেলে শরীরে আয়রন শোষণে সহায়তা হয়। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নিরাপদ মাতৃত্ব এবং সন্তান জন্মদানের মধ্যে যথেষ্ট বিরতি নিশ্চিত করাও জরুরি।"
অন্যদিকে, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সালাহউদ্দিন শাহ গণমাধ্যমকে জানান, "চট্টগ্রাম অঞ্চলে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্তের হার বেশি। তাই রক্তস্বল্পতার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।"
তবে গবেষণাটির ফলাফল দেশের সব নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ, তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে এবং হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার তথ্য পাওয়া ৪৫৯ জনকে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে রাখা হয়েছিল। গবেষণায় রক্তস্বল্পতার সব সম্ভাব্য কারণও আলাদাভাবে নির্ণয় করা হয়নি।
আরও পড়ুন: হাম উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো চারজনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১ হাজার ৪৯ জন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন