০৪:২৮ পি.এম
দেশের পূর্বাঞ্চলের ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথের অধীনে চলাচলকারী আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ১৭০ কিলোমিটার রেলপথে মোট ৬ জোড়া আন্তনগর ট্রেন চলাচল করলেও এই পথে সব ধরনের লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে।
ফলে, আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর প্রতি স্থানীয় যাত্রীদের নির্ভরশীলতা বেড়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে লোকাল ট্রেনের চলাচল বন্ধ থাকায় মোট ৬টি রেলওয়ে স্টেশন বর্তমানে বন্ধ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের মতে, যদি লোকাল ট্রেন ও স্টেশনগুলো আবারও চালু করা যায়, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নত হবে। বিনা টিকেটে আন্তঃনগর ট্রেন ভ্রমণের সংখ্যা কমবে, যা সরকারের রাজস্ব বাড়াতে সহায়ক হবে। এতে সঙ্গে এসে যাবে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর চলাচলের জন্য বিরতি কমানোর বিষয়টিও।
আরও পড়ুন: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে রাজশাহী মহানগর বিএনপির জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন ও বেলুন উড়িয়ে দিবসের কর্মসূচির উদ্বোধন
সরেজমিনে অনুসন্ধান জানায়, ঢাকা-সিলেট রেলপথে আখাউড়া হয়ে চলাচলকারী চার জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে, যা আজমপুর, জয়ন্তিকা, কালনি, উপবন ও পারাবত ট্রেন। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম থেকে সিলেটের পথে উদয়ন ও পাহাড়িকা নামের দুই জোড়া ট্রেনও চালাচ্ছে। সব মিলিয়ে, মোট ৬ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করছে। কিন্তু ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে কোনো লোকাল ট্রেন চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে না।
এ অবস্থায়, এই পথে যাত্রীদের জন্য আন্তঃনগর ট্রেনগুলো একমাত্র নির্ভরতার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যে, আখাউড়া থেকে শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার এলাকায়, বাল্লা, কুশিয়ারা ও সুরমা মেইলসহ বেশ কয়েকটি লোকাল ট্রেন চলাচল করত। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণরূপে লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে ট্রেনগুলোর চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে মেরাশানী, সিঙ্গারবিল, কাশিমনগর, ইটাখোলা, লস্করপুর ও ভাতশালা রেলওয়ে স্টেশনের কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে, এই বন্ধ স্টেশনগুলো মুরগির ফার্ম অথবা গোয়াল ঘরে পরিণত হয়েছে। এ কারণে, বিনাটিকিটে আন্তঃনগর ট্রেন ভ্রমণের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনিভাবে বিপুল পরিমাণে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয়রা আবারও দাবি করেছেন, লোকাল ট্রেনগুলোর পুনরায় চালু হলে গ্রামাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্যগুলো সহজে বাজারজাত করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে।
আরও পড়ুন: সংস্কার হচ্ছে রেলপথ, নোয়াখালী রুটে চালু হচ্ছে নতুন ট্রেন
এদিকে, আখাউড়া উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের আজমপুর এলাকার বাসিন্দা আবুল কাশেম ভূঁইয়া জানান, একসময় এই রেলপথে বাল্লা, কুশিয়ারা ও সুরমা মেইলসহ বেশ কয়েকটি লোকাল ট্রেন চলাচল করত। ফলে, স্থানীয় কৃষকরা উৎপাদিত কৃষি পণ্য নিয়ে সহজে চলাচল করতে পারতেন। তবে লোকাল ট্রেনগুলো বন্ধ হওয়ায়, স্থানীয় যাত্রীদের জন্য আন্তঃনগর ট্রেন একমাত্র ভরসার জায়গা।
তিনি বলেন, ‘লোকাল ট্রেন বন্ধ, এবং লোকাল স্টেশনগুলোও বন্ধ রয়েছে। ফলে যাত্রীরা টিকিট কাটতে পারছেন না। তারা বাধ্য হচ্ছে বিনা পয়সায় ট্রেন ভ্রমণ করতে। আমরা এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাই।’
বন্ধ হওয়া ভারত সীমান্তবর্তী সিঙ্গারবিল রেলওয়ে স্টেশনের কাছে অবস্থিত স্থানীয় অধ্যাপক মো. ইয়াহিয়া বলেন, ‘এক সময় আমরা সিঙ্গারবিল স্টেশন থেকে ৫ টাকা ভাড়া দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে যাতায়াত করতাম। এখন এগুলো শুধু স্মৃতি।’
তিনি জানান, লোকাল ট্রেনগুলো বন্ধ থাকায় বিজয়নগর উপজেলার সাধারণ মানুষের উৎপাদিত ফল, সবজি ও কৃষি পণ্য বাড়তি ভাড়ায় পরিবহন করতে হচ্ছে। যদি লোকাল ট্রেনগুলো চালু হতো, তবে স্থানীয় কৃষকেরা অনেক বেশি উপকৃত হতেন। এ ছাড়া বন্ধ স্টেশনগুলো চালু থাকলে সাধারণ মানুষও টিকিট কেটে রেল ভ্রমণ করতে পারতেন। এভাবে সরকারের রাজস্বের পরিমাণ বাড়তো।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে শিক্ষা সফরের বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ২ জনের, আহত ৩০
মেরেশানি রেল স্টেশন এলাকার বাসিন্দা কাহার ভূঁইয়া জানান, ট্রেন এবং স্টেশনগুলো বন্ধ থাকার কারণে গ্রাম অঞ্চলের যাত্রীদের এখন আন্তঃনগর ট্রেনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সাধারণ যাত্রীরা আন্তঃনগর ট্রেনে বিনা পয়সায় ভ্রমণ করেই চলছেন। দক্ষিণবঙ্গের শিল্প ও কৃষির জন্য যা ক্ষতিকর বলেও দাবি করেন তিনি।
কাহার ভূঁইয়া আরও জানান, এক সময় তিনি মেরাসানী থেকে বিভিন্ন ফল বিক্রি করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, আশুগঞ্জ যেতেন। কিন্তু এখন তিনি পিকআপ এবং সিএনজি ব্যবহার করে ফল ও সবজির ব্যবসা করছেন। ট্রেনগুলো যাতে চালু হয়, তার জন্য তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
এদিকে, ঢাকা থেকে সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী ফারজানা ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত ট্রেনটি স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আজমপুর স্টেশনে যাত্রা বিরতি দিয়ে থাকে যা আশপাশের অন্তত পাঁচটি স্টেশনে ঘন ঘন যাত্রা বিরতি দেয়। এতে যাত্রা করার সময় যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনই যাত্রা অভিজ্ঞতা আঘাতহীন হয়ে পড়ছে।
ফারজানা বলেন, ‘এই পথে যদি লোকাল ট্রেনগুলো চালু থাকে, তাহলে ঘন ঘন এত যাত্রা বিরতি দিতে হতো না। স্থানীয় বাসিন্দারা লোকাল ট্রেন না থাকার কারণে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর যাত্রাবিরতি দাবি করছে। আমি মনে করি, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এজন্য সরেজমিন অনুসন্ধান করা উচিত।’
আরও পড়ুন: মাদক-অনলাইন জুয়া থেকে বিরত রাখতে খেলার বিকল্প নেই : প্রতিমন্ত্রী সোহেল মনজুর
ঢাকা থেকে সিলেটগামী পারাবত ট্রেনের যাত্রী লাবিব হাসান চৌধুরী জানান, আজমপুর থেকে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত মাত্র ৬০ কিলোমিটার অংশে অন্তত পাঁচটি স্টেশনে যাত্রা বিরতি দিচ্ছে ট্রেনগুলো। এতে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর গতি যেমন কমছে, তেমনিভাবে তারা লোকাল ট্রেনের মতো হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে যাত্রী কল্যাণ সংগঠনের সভাপতি মো. ইব্রাহিম খান সাদাত বলেন, ‘সারা পৃথিবীর মধ্যে ট্রেন হচ্ছে নিরাপদ পরিবহন। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আমরা দেখছি, নিয়মিত ট্রেন পরিষেবা অবনতির দিকে যাচ্ছে। আখাউড়া সিলেট রেলপথে লোকাল ট্রেনগুলোর বন্ধ হওয়ার ফলে স্থানীয় কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পাচ্ছেন না। পাশাপাশি, ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে আসা আন্তঃনগর ট্রেনযাত্রীদের ঘন ঘন যাত্রা বিরতির ফলে ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন