১২:১৩ পি.এম
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলের আওতায়, ভোলা-বরিশাল ও শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে জাপানের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মিয়াগাওয়া কেনসেটসু কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
এই দুই সেতু প্রকল্পে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা (৩.৪৪ বিলিয়ন ডলার)। আশা করা হচ্ছে, এই সেতু প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক সংযোগে আমূল পরিবর্তন আসবে এবং অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য গতি সঞ্চার হবে। ২০৩৩ সালের মধ্যে সেতু দুটি নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে পিপিপি পদ্ধতির নিয়ম অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বাংলাদেশ সরকার বহন করবে।
সম্প্রতি, রাজধানীর এক হোটেলে অনুষ্ঠিত অষ্টম বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্ম সভায় জাপানি কোম্পানিটি এই দুটি সেতু নির্মাণে আগ্রহের কথা জানায়। বাংলাদেশ সেতু বিভাগ ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে যে, সভায় শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু ও বরিশাল-ভোলা সেতুকে বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের আওতায় নতুন প্রকল্প হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি পিপিপির মাধ্যমে বড় অবকাঠামোগত উদ্যোগ এগিয়ে নিতে উভয় সরকারের প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন।
আরও পড়ুন: গুটি কয়েক ব্যক্তির কারণে মাদ্রাসার শিক্ষকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ছড়াচ্ছে: শিশির মনির
সভায় দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, পিপিপি কর্তৃপক্ষের সিইও আশিক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিুরুল ইসলাম খান। জাপানি প্রতিনিধি দলে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা উনো ইয়োশিমাসা; বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি; জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের (এমএলআইটি) সহকারী উপমন্ত্রী ফুজিতা মাসাকুনি ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বিষয়ক সহকারী উপমন্ত্রী নাকায়ামা রেইকো।
এর আগে, প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সেতু প্রকল্পের জন্য মিয়াগাওয়া কেনসেটসু কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে নির্বাচন করেছিল জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা যায় যে, শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু প্রকল্প নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও আলোচনা করেছিল সরকার। সেতু বিভাগ ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, মিয়াগাওয়া এককভাবে অথবা আরও কয়েকটি জাপানি প্রতিষ্ঠান নিয়ে যৌথভাবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে।
তারা আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত করার আগে ট্রানজিশন পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হবে। এরপর সরকার রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) ইস্যু করবে। এটি একটি আনুষ্ঠানিক নথি, যা কোনো সংস্থা বা সরকার নির্দিষ্ট প্রকল্প বা সেবার জন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করতে ব্যবহার করে। আরএফপি জমা হওয়ার পর, মূল্যায়ন শেষে জাপানি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিতে যাবে সরকার।
বাংলাদেশে মিয়াগাওয়ার স্থানীয় অংশীদার হিসেবে কাজ করছে স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেড, যারা প্রকল্পের বিনিয়োগ পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা দিচ্ছে। স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটালের চেয়ারম্যান সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ বলেন, 'বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য আমরা অনেক বছর ধরে কাজ করছি। ভোলা-বরিশাল সেতু কেবল একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।'
আরও পড়ুন: আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের উদ্বোধনে পুলিশের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু
ভোলা-বরিশাল সেতু: এ দুটির মধ্যে বড় প্রকল্প ভোলা-বরিশাল সেতু। এর নির্মাণে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রস্তাবিত ১০.৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেতু। এটি দ্বীপজেলা ভোলা ও মূল ভূখণ্ড বরিশালের মধ্যে স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করবে। ২০২৪ সালের এক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সেতু বিনিয়োগ আকর্ষণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি আগামী ৩০ বছরে সেতুটি দেশের জিডিপিতে ০.৮৬ শতাংশ অবদান রাখবে। এছাড়া ভোলা থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের কাজও এই সেতুর মাধ্যমে সহজ হবে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, ২০৩৩ সালের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে।
শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু: দ্বিতীয় প্রকল্পটি শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু। মেঘনা নদীর ওপর নির্মিতব্য ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অবকাঠামোর ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। সেতুটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলাকে সরাসরি যুক্ত করবে। এর ফলে বর্তমান ফেরি ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্য বিকল্প তৈরি হবে। আশা করা হচ্ছে, সেতুটি চালু হলে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার কমে যাবে। এতে ঢাকার ওপর দিয়ে যাতায়াতকারী যানবাহনের চাপও কমবে। চাঁদপুরের হরিণা ফেরিঘাট ও শরীয়তপুরের সখিপুরের মধ্যে এই সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০৩২ সালের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালে এই প্রকল্পের জন্য একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে। গত বছর জরিপ প্রতিবেদন সম্পন্ন হয়েছে।
ভোলা-লক্ষ্মীপুর সেতু নিয়েও জাপানের আগ্রহ: পিপিপি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ভোলা-লক্ষ্মীপুর সেতু প্রকল্পও আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। জাপানি প্রতিনিধি দল প্রকল্পটির ব্যাপারে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারা একে আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, বাণিজ্য বৃদ্ধি ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, মেঘনা নদীর ওপর ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটে সেতু নির্মাণ হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। ভোলা-লক্ষ্মীপুর ফেরিঘাট খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১২টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ৯টিসহ মোট ২১ জেলার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃজেলা রুট।
পিপিপি কর্তৃপক্ষের সিইও আশিক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ-জাপান পিপিপি প্ল্যাটফর্ম বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মানসম্মত বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আরও পড়ুন: রায় নিয়ে বিরূপ মন্তব্য: ট্রাইব্যুনালে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেন ২ আওয়ামীপন্থি আইনজীবী
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার সভাটির সমাপ্তিতে জানান, এই প্ল্যাটফর্ম ও এর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর প্রতি বাংলাদেশ সরকারের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনরায় নিশ্চিত করেন। তারা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তার লক্ষ্যে উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতা আরও নিবিড় করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। সেইসাথে, তারা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উদ্যোগগুলো দ্রুততর করা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রসার ঘটানোর বিষয়েও একমত হয়েছেন।
অন্যান্য প্রস্তাব: কর্মকর্তারা জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগর উন্নয়নের প্রসারে জাপানি প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের আওতায় চট্টগ্রাম শহরে একটি ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করারও প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া, জাপানি কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশের পুরোনো রেলসেতুগুলোর আধুনিকায়নের প্রস্তাব নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে পিপিপি সহযোগিতার আরও সুযোগ তৈরি করবে।
বৈঠকের পর প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মে চলমান বেশ কয়েকটি মেগাপ্রকল্পের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কমলাপুর মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, আউটার রিং রোড প্রকল্প এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন স্থানীয় সেতু উন্নয়ন প্রকল্প।
আরও পড়ুন: আ.লীগের ৭ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত প্রতিবেদন জমা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন