০৯:১৭ পি.এম
ইরানকে এক সপ্তাহে যুদ্ধ করে ইরানকে ধ্বংস করতে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যখন চার মাসের যুদ্ধেও ইরানকে পরাজিত করতে পারেনি কিংবা হরমুজ প্রণালী নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। নতুন করে বন্ধ হতে যাওয়া লোহিত সাগরে বাব-আল মান্দেব প্রণালীও একপ্রকার বন্ধ হওয়ার পথে। সেই ইরান কে সামরিক শক্তি দিয়ে ধ্বংস করা তো দূরের কথা, তাদের নিজেদের যুদ্ধ করার সক্ষমতা কিংবা অস্ত্রভাণ্ডারে আর কয়দিন যুদ্ধ করা যাবে এমন বিষয় নিয়েও যখন প্রশ্ন উঠছে, এমন সময় ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বে মুসলিম নেতৃত্বাধীন একটি জোট গঠন কতটা যুক্তি সঙ্গত তা প্রশ্নের দাবি রাখে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সর্বোচ্চ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেনি। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এক সপ্তাহের ব্যবধানে ইরানের শক্তি-সামর্থ্য গুড়িয়ে দিয়ে জয় লাভের চেষ্টায় যুদ্ধ শুরু করেছিল সেখানে চার মাস ধরে চলা মারাত্মক প্রাণঘাতী যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে গোটা বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো বলছে বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে কারণ তাদের সামরিক শক্তির দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম এমন কথা স্বীকার করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ সরঞ্জাম এন্টিসেপ্টর মিসাইল সর্বাধুনিক টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় শেষের দিকে। এ কারণে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেষ্টা করা যুক্তরাষ্ট্রই যুদ্ধে ক্ষান্ত দিয়েছে কয়েকদিন থেকে, এর মধ্যে ইরানি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক স্টিল্থ ফাইটার জেট থেকে শুরু করে কোটি কোটি ডলার মূল্যের সামরিক ড্রোন, ড্রোন ঘাঁটি, বিমান ঘাঁটি, অস্ত্র গুদাম থেকে শুরু করে সবকিছুই তছনছ করে দিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে যা স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে প্রমাণিত সেখানে এই মুসলিম রাষ্ট্র গুলো কেন একটি নতুন জোট গঠন করতে যাচ্ছে যা ইরান বিরোধী? ইরান যখন সেখানে একাই বিশ্ব পরাশক্তিকে নাকানি চুবানি খাইয়েছে সেখানে এই জোট গঠন কতটা যৌক্তিক? পরোক্ষভাবে ইরানকে সহায়তাকারী রাশিয়া, চীন কিংবা উত্তর কোরিয়ার প্রসঙ্গটি যেহেতু প্রকাশ্য নয় তারপরেও ওপেন সিক্রেট একটা বিষয় যে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক সামরিক ও কৌশলগত ভূ রাজনৈতিক স্বার্থ থাকায় এখানে এই রাষ্ট্রগুলো ইরানকে যেকোন ভাবে সাহায্য করছে এবং হয়তো ভবিষ্যতেও করবে। যদি তেমনটি হয় তাহলে ইরান বিরোধী জোটে গিয়ে মুসলিম অপর উদীয়মান শক্তি গুলো কি নিজেরা নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনবে?
এমন একটি প্রেক্ষাপটে, যদি নতুন করে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর একটি অংশকে ইরানবিরোধী অবস্থানে সংগঠিত করার চেষ্টা হয়ে থাকে, তবে সেটিকে কেবল একটি আঞ্চলিক উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। বরং এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে না তার গ্যারান্টি কে দেবে? যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল কৌশলী সমর্থন দিয়ে দূর থেকে বসে দেখবে যে এক মুসলিম রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে আরো চৌদ্দটি মুসলিম রাষ্ট্র একত্রিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সাথে না পেরে ওঠার পরবর্তী আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণের অংশ বলেই মনে হতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো কিংবা এই জোটে নাম লেখানো রাষ্ট্রগুলো ইরানের সাথে মুসলিম দেশ হিসেবে যখন আলোচনার টেবিলে বসে পারস্পরিক আস্থা ও সমঝোতার পথ খোঁজার সুযোগ ছিল, তখন কেন নতুন বিভাজনের রাজনীতি? তবে কি মুসলিমরা শেষ পর্যন্ত নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনবে? কারণ ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের অপরাজেয় অবস্থা এমনটা মনে করিয়ে দেয় যে সেখানে ইরান ঐশ্বরিকভাবে সৃষ্টিকর্তা কতৃক প্রদত্ত কোন সহায়তা পাচ্ছে, তা না হলে দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতক ধরে একটি নিষেধাজ্ঞা পীড়িত দেশ পরাশক্তির বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করা সহজ কথা নয়-এটি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সমন্বয় ছাড়া অনুভব করা কঠিন ।
সেই পরিস্থিতিতে মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে আরও গভীর করে এমন কোনো ইরান বিরোধী জোট গঠন কিংবা এর উদ্যোগ কি শেষ পর্যন্ত মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকেই মুখোমুখি সংঘাতে ঠেলে দেবে নাতো? ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, অভ্যন্তরীণ বিভক্তির সুযোগই বাইরের শক্তির কৌশলগত সুবিধাকে আরও সুদৃঢ় করে। এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিশ্বের উদীয়মান মুসলিম শক্তিগুলোকে আর নতুন করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ধ্বংস করতে হবে না। এই সুযোগে নিজেরাই নিজেরা যুদ্ধ করে ধ্বংসর দিকে ধাবিত হবে এমন কূটনৈতিক কৌশল থেকে হয়তো এই জোট গঠনে ইন্ধন দিচ্ছে। বিষয়টি মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যদি এখনই বুঝতে না পারে তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ কি হবে একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই নির্ধারণ করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরাশক্তি বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের অবস্থানকে দুর্বল মনে করে কিংবা আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে কোথাও হামলা করে প্রত্যাশিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে পরবর্তী ধাপে আঞ্চলিক মিত্রদের সামনে এনে সংঘাতের নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সে দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য এই জোটকে কেউ কেউ মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে ধ্বংস করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন। এই ব্যাখ্যা সঠিক কি না, তা সময়ই বলে দেবে; তবে এমন প্রশ্ন উত্থাপনের যথেষ্ট রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে।
এই জোট গড়ার লক্ষ্যে প্রাথমিক বৈঠকে চল্লিশের বেশি (৪৩টি) রাষ্ট্রের অংশগ্রহণের খবর থাকলেও শেষ পর্যন্ত সীমিত সংখ্যক (১৪টি) দেশের নাম আলোচনায় এসেছে তার মধ্যে বাংলাদেশের নামটিও উঠে এসেছে। এটিও ইঙ্গিত দেয় যে বিষয়টি নিয়ে মুসলিম বিশ্বের মধ্যেই বেশিরভাগ মুসলিম রাষ্ট্র মিলে একক অবস্থান গড়ে ওঠেনি। যেমন মধ্যপ্রাচ্যেরই সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও ইরাক এই জোটে অংশগ্রহণ করেনি।
অন্যদিকে, ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার অবস্থানও মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। তারা সরাসরি নিজেদের অবস্থানকে ঠিক রাখতে যেহেতু ইরানকে সমর্থন দিচ্ছে ফলে ইরান বিরোধী কোনো নতুন সামরিক জোটের রাজনৈতিক বা সামরিক কার্যকারিতা যে ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আরেকটি নতুন ফ্রন্ট খুলে নিজেরা নিজেরাই ধ্বংস হবে কিনা বা তার ভবিষ্যৎ কতটা সুখকর হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যে কোনো নতুন সামরিক মেরুকরণ সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর ঝুঁকি বহন করে। একটি আঞ্চলিক সংঘাত খুব সহজেই বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে পারে। আর মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা যদি আরও বিস্তৃত হয়, তার অভিঘাত শুধু ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য, সমুদ্রপথ এবং এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এর প্রভাব অনুভব করবে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা করেছে। এমন একটি সময়ে, যখন দেশ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক জোটে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রশ্নে অত্যন্ত সতর্ক, সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন অপরিহার্য।
বাংলাদেশের দীর্ঘদিন থেকে যেমন ভাবে চলে এসেছে, যে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত—যুদ্ধ নয়, শান্তির পক্ষে অবস্থান; মেরুকরণ নয়, সংলাপের পক্ষে ভূমিকা; সংঘাত নয়, কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান। কারণ যুদ্ধের আগুন কখনো সীমান্ত মানে না। একবার দাবানল ছড়িয়ে পড়লে তার তাপ থেকে নিরাপদ থাকে না কোনো অঞ্চল, কোনো অর্থনীতি, এমনকি কোনো নিরপেক্ষ রাষ্ট্রও।
সুতরাং, হতে পারে এটা বিশ্ব পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু থেকে পরবর্তী চার মাস ধরে ক্রমাগত ইরানের কাছে পরাজয় থেকে সরে আসার রাস্তা তৈরি করা। যাতে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের পালিত সৌদি সহ অন্যান্য মুসলিম বা অন্যরাষ্ট্রগুলো মিলে এমন একটি যুদ্ধ ক্ষেত্র তৈরি করবে যাতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে সরে যেতে পারে এবং তার পরিবর্তে মুসলিম উদীয়মান শক্তি গুলো নিজেরা নিজেরাই যুদ্ধ করে ধ্বংস হয়ে যাবে। সম্ভাব্য এমন যে কোনো সামরিক জোটে অংশগ্রহণের আগে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের উচিত বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা। মুহূর্তের রাজনৈতিক হিসাব নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের একমাত্র মানদণ্ড। কারণ ভুল কৌশলগত সিদ্ধান্তের মূল্য একটি রাষ্ট্রকে বহু বছর ধরে বহন করতে হতে পারে এমন কথা বাংলাদেশের বর্তমান স্পর্শকাতর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলা মনে হয় অমূলক হবে না।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন