০৯:৪২ পি.এম
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা থেকে শুরু করে সুদূর লন্ডনের টেমস নদী এবং বঙ্গোপসাগরের পানি ও বালু এক ছাদের নিচে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের পূর্ব আকচা গ্রামে এই ব্যতিক্রমী ‘নদী গ্যালারি’ গড়ে উঠেছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে গ্যালারিটি বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ইতিমধ্যে এটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও গ্যালারিটি পরিদর্শন করেন।
জেলা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে শান্ত পরিবেশে অবস্থিত ‘লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্য জাদুঘর’। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ হলো নদী গ্যালারি।
আরও পড়ুন: বিএনপি মতাদর্শীকে সরিয়ে আওয়ামী মতাদর্শীকে সংযুক্ত
জাদুঘরে প্রাচীন কৃষিসামগ্রী, শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র, মাদল, সানাই, একতারা ও দোতারাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া ব্রিটিশ আমলের হাতে লেখা দলিল, চিঠিপত্র, পুঁথি এবং জমিদারদের খাজনা আদায়ের রসিদও এখানে রয়েছে।
জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. শহীদ উজ জামান জানান, নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা, ইতিহাস ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এখানে বাংলাদেশের ৩২টি জেলার ৩৯৮টি নদ-নদী, যুক্তরাজ্যের টেমস নদী এবং সাতটি সাগরের পানি ও বালু কাচের জারে সংরক্ষণ করে প্রদর্শন করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে এটি একটি তৃণমূল লোকজ গ্যালারি হিসেবে শুরু হলেও বর্তমানে জাদুঘরটির পরিসর ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এখানে নদী গ্যালারির পাশাপাশি সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিবিষয়ক গ্যালারি এবং মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি রয়েছে। এছাড়া প্রাঙ্গণে প্রায় ৭০ ধরনের ফলের গাছ ও ১২০ ধরনের ঔষধি গাছও রয়েছে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে প্রতিদিন এখানে শিক্ষার্থী, গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীরা ভিড় করছেন।
আরও পড়ুন: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পাশে ছিলেন, তেমনি ২০২৪ সালের আন্দোলনেও তাঁরা পাশে ছিলেন : প্রতিমন্ত্রী সোহেল মনজুর
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থী লামিয়া আক্তার ও শাফিন ইসলাম গ্যালারিটি পরিদর্শনে আসেন। লামিয়া বলেন, "পাঠ্যপুস্তকে যা পড়েছি, এখানে এসে তার বাস্তব রূপ দেখলাম। এটি আমাদের কাছে একটি জীবন্ত পাঠশালা।"
শাফিন বলেন, "শুধু নদ-নদী নয়, এখানকার আদি মানুষের জীবনযাত্রা, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ব্যবহার্য সামগ্রী, প্রাচীন পালকি ও গরুর গাড়ি আধুনিক প্রজন্মের সঙ্গে অতীতের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।"
গ্যালারিটি দেখে গবেষক ও বিশিষ্টজনেরা মুগ্ধ হয়েছেন। ঠাকুরগাঁও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বলেন, "দেশে এ ধরনের জাদুঘর এটিই প্রথম। এটি নদী গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।"
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, "দেশের অন্য কোথাও এমন নদী গ্যালারি নেই। নিজে পরিদর্শনে গিয়ে অভিভূত হয়েছি।"
আরও পড়ুন: মেহেরপুরে শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের ব্যস্ততা
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সংস্কৃতিব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে মন্তব্য করেন, "অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে দেশের নদীগুলো অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। বাঙালির সভ্যতা ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নদী রক্ষা জরুরি। নদী গ্যালারি সেই সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।"
‘নদী বাঁচলে বাঁচবে প্রকৃতি’—এই বার্তাকে সামনে রেখে নদী, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন তুলে ধরছে গ্যালারিটি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন