১১:১১ পি.এম
রাউজানে টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
জিয়াবাজার এলাকার ভেঙে পড়া কাপ্তাই সড়ক সংস্কার করা হচ্ছে। ডাবুয়ায় এক শিশু বৃষ্টির জলাবদ্ধতার পানিতে পড়ে মারা গিয়েছে। যে সব এলাকায় পাড়ায় পানি ঢুকে পড়েছে, সেখানকার বসতঘর, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা সব কিছুই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও রান্নাবান্না সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কোথাও পানি উঠা-নামা করার কারণে মানুষের দুর্ভোগ তীব্র হয়ে উঠেছে। আজ বুধবারেও প্রবল বৃষ্টি অব্যাহত থাকে, ফলে পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, মঙ্গলবার ভোরে রাউজান পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ডাবুয়া খালের প্রবল স্রোতে একটি সেতু ধসে পড়ে। এ কারণে সড়কের একপাশে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। অপর দিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ ও যানবাহন চলাচল করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্প্রতি খালটির ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ও ব্লক বসানো হলেও প্রবল স্রোতের কাছে সেগুলো কাজ করেনি। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য খাল প্রশস্ত করার ফলে পানির প্রবাহ এবং স্রোতের বেগ বেড়ে যাওয়ায় সেতুটি ধসে পড়েছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী মোংলার পথে যাত্রা শুরু, স্থানীয়দের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়
চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের মদুনাঘাট ব্রিজের পূর্ব পাশে জিয়া বাজার সংলগ্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা আবারও সংকটের মুখে পড়েছে। খবর পেয়ে রাউজান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আলহাজ গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বিষয়টি গুরুত্বসহকারে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর নির্দেশনায় সওজের প্রকৌশলীরা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জরুরি সংস্কার কাজ শুরু করেন।
এদিকে, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কসহ উপজেলার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক স্থানে অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহন আটকা পড়েছে। হলদিয়া ভিলেজ সড়কের গর্জনীয়া রাবার বাগান ব্রিজ থেকে হলদিয়া আমতলী টিলা পর্যন্ত সড়ক চলাচলের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা দুর্ভোগে পড়েছেন। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চলমান থাকার কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয় ও কলেজে যাওয়া দেখা গিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাউজান পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড, চিকদাইর, ডাবুয়া, কদলপুর, পাহাড়তলী এবং উরকিরচর ইউনিয়ন। তাছাড়া, বিভিন্ন এলাকায় খাল ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। হালদা ও কর্ণফুলী নদীর পানিও বেড়ে গেছে। চৌমুহনী কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন বাজার এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে এবং কৃষকদের বীজতলা নষ্ট হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
উরকিরচর, বাগোয়ান, হলদিয়া, ডাবুয়া, নোয়াপাড়া, নোয়াজিষপুর, পূর্বগুজরা, পশ্চিম গুজরা, বিনাজুরি, চিকদাইর এবং পৌরসভার আরো বেশ কিছু এলাকার রাস্তা এবং ঘরবাড়ি পানির নিচে নিমজ্জিত হয়ে আছে, ফলে মানুষের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। ৯ নম্বর পাহাড়তলী ইউনিয়নের খাঁনপাড়া ও দাশপাড়ায় প্রবল স্রোতের কারণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে রাতেই উপজেলা প্রশাসন সেখানে পৌঁছে যায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. রাহাতুল ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে প্রায় ১০০টি পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন।
আরও পড়ুন: খুলনায় ২৭ বছরের যুবক তুষারের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার
উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি সাবের সুলতান কাজল জানান, সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশনায় ভাঙনকবলিত এবং পানিবন্দি এলাকায় খাদ্যসামগ্রী ও শুকনো খাবার বিতরণ অব্যাহত রয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবেন।
সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে রাউজান পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পানিবন্দি এবং দুস্থ পরিবারের মদ্ধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেন তরুণ সমাজসেবক এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ হাসান বাহাদুর। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে মানুষের খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেন।
স্থানীয় বাসিন্দা দূর্জয় দাশ সূর্য বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের ওপর দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ দাশপাড়াসহ আশেপাশের বসতঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। জান্নাত নামে এক গৃহবধূ বলেন, গত সোমবার থেকে ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। চুলায় আগুন জ্বলেনি। শুকনো খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। টয়লেটও পানির নিচে তলিয়ে গেছে।’
রাউজান পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মো. বাহাদুর নামের একজন বলেন, ‘ডাবুয়া খাল ভেঙে তাঁর এলাকার অর্ধশতাধিক বাড়িঘর পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবারের চুলা জ্বলছে না।’ অন্য দিকে পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সমাজসেবক মোহাম্মদ আলী সুমন বলেন, বিভিন্ন এলাকার সড়ক ডুবে যাওয়ায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকেরা।
আরও পড়ুন: শেরপুর সীমান্তে হাতি-মানুষের সংঘাত নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন
রাউজান উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব ফিরোজ আহমদ বলেন, ‘দলের নেতাকর্মীরা সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশনায় প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি ভাঙনকবলিত সড়ক ও সেতু এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার কাজ চলছে।’
রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. রাহাতুল ইসলাম বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চিহ্নিত করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চিকদাইর খাল ভাঙার স্থানেও দ্রুত বাঁধ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন