০৭:৫৬ এম
চারদিকে কোলাহল, হৈচৈ, হাসি-ঠাট্টার রমরমা পরিবেশ। দেখে বেশ ঈদ ঈদ আমেজের মতো লাগছে। লাগবে নাই বা কেন? ভার্সিটির প্রথম দিন বলে কথা! প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই ভার্সিটির প্রথম দিন নিয়ে থাকে হাজারো স্বপ্ন, থাকে আলাদা একটা অনুভূতি। এই অনুভূতি অন্য সব অনুভূতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
আঠারো বছর বয়সে যৌবনে পদার্পণের পর মানুষের জীবনে নানা ধরনের অনুভূতি নাড়া দেয়। আর সেই অনুভূতিগুলোর মধ্যে ভার্সিটির প্রথম দিন অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুভূতি।
ছোঁয়ার মনেও ভার্সিটির প্রথম দিন নিয়ে হাজারো অনুভূতি নাড়া দিয়েছিল। কত শত স্বপ্ন নিয়ে দুই বান্ধবী পা রেখেছিল ভার্সিটিতে।
আরও পড়ুন: এবার বিআরটি ভাঙতে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা
ছোঁয়া আর শশী দুই বেস্ট ফ্রেন্ড। দুজনেই স্কলারশিপের মাধ্যমে চান্স পেয়েছে এই ভার্সিটিতে। চট্টগ্রামের সবচেয়ে নামকরা ভার্সিটি। এই ভার্সিটিতে পড়া প্রতিটি ছেলে-মেয়েরই স্বপ্ন। এখানে চান্স পাওয়াটাও অনেক বড় ভাগ্যের ব্যাপার।
ছোঁয়া বরাবরই খুব ভালো ছাত্রী। গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া ছাত্রী। তার ফলাফল এতটাই ভালো ছিল যে, এইচএসসিতে ছোঁয়া চট্টগ্রাম বোর্ডের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। তার ফলাফল দেখে বিভিন্ন জেলার বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির জন্য ডাক এসেছিল। কিন্তু ছোঁয়া তার প্রাণপ্রিয় শহর চট্টগ্রামের বাইরে কোথাও যাবে না।
আর এই ভার্সিটিতে পড়া ছিল ছোঁয়ার স্বপ্ন। তাই যখন এই ভার্সিটি থেকে ভর্তির সুযোগ আসে, তখন কোনো কিছু না ভেবেই সে এখানে ভর্তি হয়ে যায়।
ছোঁয়ার বান্ধবী শশীও একই রকম মেধাবী। সেও চট্টগ্রাম বোর্ডের মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। তাই তার কাছেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির সুযোগ এসেছিল। কিন্তু শশীও চট্টগ্রামের বাইরে যাবে না এবং ছোঁয়ার সঙ্গ ত্যাগ করবে না—এই সিদ্ধান্তে একই ভার্সিটিতে ছোঁয়ার সঙ্গে ভর্তি হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: স্পিকার: আওয়ামী লীগের নেতারা মদ খায়, কর্মীরাও খায়, সব বাটপারের কারখানা
ক্যান্টিনে বসে বসে ছোঁয়া কল্পনায় বিভোর হয়ে ভাবতে লাগল—আজকের দিনটা এমন না হলেও পারত! কেন তার সাথেই এমন হতে গেল? আর কেউ কি ছিল না?
ছোঁয়ারা যখন ভার্সিটিতে আসে, তখন বিশাল ক্যাম্পাস দেখে দুই বান্ধবী নিজেদের কল্পনা-জল্পনার গল্প করতে করতে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এত বড় ভার্সিটির কোন দিকে তাদের ক্লাসরুম, সেটা নিয়ে দুই বান্ধবী চিন্তায় পড়ে যায়। কোন দিকে যাবে বুঝতে না পেরে সামনের দিকে এগোতে থাকে।
হঠাৎ তাদের চোখে পড়ে, একটি শিউলি গাছের নিচে গোল করে শান বাঁধানো উঁচু ঢিবির ওপর বসে আছে চার-পাঁচজন ছেলে-মেয়ের একটি গ্রুপ। সেখানে ছিল তিনজন ছেলে ও দুজন মেয়ে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তারা বেশ সিনিয়র।
ছোঁয়া আর শশীও সেদিকে এগিয়ে গেল। গিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে সালাম দিল।
আরও পড়ুন: সৌদি আরবে নিহত ওমরাহযাত্রী নাসরুল্লাহ বদরপুরির পরিবারের দায়িত্ব নিলেন ধর্মমন্ত্রী
— আসসালামু আলাইকুম। অনার্স প্রথম বর্ষের ক্লাসরুমটা কোন দিকে, একটু বলতে পারবেন প্লিজ?
ছোঁয়ার কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই গ্রুপের সবাই তাদের দিকে তাকাল। তারপর সবাই সমস্বরে সালামের জবাব দিল।
তাদের মধ্য থেকে সাব্বির জিজ্ঞেস করল,
— কী বলেছ, শুনতে পাইনি। আবার বলো?
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন ছিন্ন হবে না: সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী
— বলেছি, অনার্স প্রথম বর্ষের ক্লাসরুমটা কোন দিকে, একটু বলতে পারবেন প্লিজ?
— ওও, আচ্ছা! তোমরা ফার্স্ট ইয়ারের?
— জি। আসলে আমরা তো আজকে নতুন এসেছি, তাই ক্লাসরুমটা কোন দিকে সেটা বুঝতে পারছি না।
ছোঁয়ার কথা শুনে রোহান একটু মজার ছলে বলে উঠল,
আরও পড়ুন: রাঙামাটিতে সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা
— আহা! তুমি একা নও। ফার্স্ট ইয়ারের সবাই আজকে প্রথম এসেছে। এই যে দেখছো না, আমরা এখানে বসে আছি। কেন বসে আছি জানো?
ছোঁয়ার কাছে তাদের কথা বলার ভঙ্গিটা খুব একটা সুবিধার মনে হলো না। তবুও কিছু করার নেই। একবার যখন তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই। মাথা নিচু করেই ছোট করে উত্তর দিল,
— না।
তখন সাব্বির হেসে রোহানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
আরও পড়ুন: ইসরাইলের নির্বাচনে সম্ভাব্য ৪ পরিস্থিতি ২৭ অক্টোবর
— কিরে রোহান, আমরা এখানে কেন বসে আছি যেন?
রোহানও বেশ মজার মুডে আছে। সেও বলল,
— আরে বন্ধু, ফার্স্ট ইয়ারের সুন্দরী সুন্দরী মেয়েদের ভার্সিটিতে স্বাগতম জানাব বলেই তো বসে আছি। সঙ্গে ক্লাসরুমটাও দেখিয়ে দেব।
ছোঁয়া বেশ বুঝতে পারছে, ওরা তাদের সঙ্গে র্যাগিং করতে চাইছে। মাথার ওপর বড় ভাই-বোন না থাকলেও র্যাগিং সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা আছে তার। প্রতিবেশী বড় আপু-ভাইয়াদের কাছে শুনেছে, সঙ্গে সিনেমা ও টিভি সিরিয়াল তো আছেই।
তাই নিচের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে আবার অনুরোধ করল,
— প্লিজ, একটু বলে দিন না ক্লাসরুমটা কোন দিকে? বাকিটা আমরা খুঁজে নিতে পারব।
তখন মাহি ছোঁয়ার কাছে তার নাম জানতে চাইলো,
— নাম কী তোমার?
— ফাইজা আলম ছোঁয়া।
ছোঁয়া নামটা শুনেই তানু অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
— কী! তোমার নাম ছোঁয়া? ছোঁয়াছুঁয়ি—এটা আবার কেমন নাম? ছোঁয়া মানে কী? কাউকে ছুঁয়ে দেওয়া! এই নামের সঙ্গে সঙ্গে সত্যি কারও মন, শরীর কিছু ছুঁয়ে দাওনি তো আবার? দেখো আবার, এই ভার্সিটিতে এসে সব ছেলেদের মন-প্রাণ ছুঁয়ে দিয়ো না যেন!
তানুর কথা শুনে ছোঁয়া চোখ বন্ধ করে কথাগুলো হজম করে নিল। তানুর এমন কথাবার্তা শুনে আদনান ও মাহি তাকে থামাতে চাইলো। কিন্তু তানু না থেমে কিছু একটা ভেবে হেসে হেসে বলল,
— যাই হোক, মিস ছোঁয়া ছুঁয়ে, কাজের কথায় আসি। আমরা তোমাকে বলতে পারি ক্লাসরুমটা কোন দিকে। তবে একটা শর্ত আছে। যদি মানো, তাহলে আমরা নিজেরাই গিয়ে তোমাদের ক্লাসরুমে পৌঁছে দিয়ে আসব।
এই কথা বলে তানু হাসতে লাগল।
— কী শর্ত?
তানু বলল,
— তোমার নাম তো ছোঁয়া। আই মিন, ইংরেজিতে ‘টাচ’, তাই তো? ‘টাচ’ দিয়ে একটা গান আছে, শুনেছ?
তানু গানের নাম করে তাকে নাচানোর শর্ত দিল। তারপর বলল,
— এই গানে তোমাকে নাচতে হবে। যদি নাচতে পারো, তাহলে আমি নিজে গিয়ে তোমাদের ক্লাসরুমটা দেখিয়ে দেব। কিরে, কী বলিস সবাই? দেখবি নাকি আমাদের মিস টাচ ওরফে ছোঁয়ার নাচ?
তখন সাব্বিরও তালে তাল মিলিয়ে বলল,
— আরে, দেখার জন্যই তো আজকে এখানে বসা। তা তুমি এমনিই নাচতে পারবে, নাকি স্পিকারের ব্যবস্থা করতে হবে?
এদিকে তাদের কথা শুনে ছোঁয়ার রাগ উঠে গেল।
‘এরা বলে কী? এত এত মানুষের সামনে ভরা ক্যাম্পাসে এখন আমি নাচ দেখাব? এদের মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে?’
ছোঁয়াকে চুপ থাকতে দেখে সাব্বির আবার বলল,
— কী হলো সুন্দরী? স্পিকারের ব্যবস্থা করব নাকি?
এবার ছোঁয়া রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না।
— আপনাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? এই ভরা ক্যাম্পাসে এখন আমি নাচ দেখাব আপনাদের? কী আবোল-তাবোল বলছেন, ভেবে বলছেন তো? আমি কোনো নাচ দেখাতে পারব না।
রোহান সাব্বিরকে বলতে লাগল,
— মামা, সুন্দরীর তো দেখছি হেব্বি রাগ!
ছোঁয়া এবার কটমট করে তাকিয়ে বলল,
— রাগের কী দেখেছেন? কিছুই দেখেননি এখনো। আমি নাচব না বলেছি, মানে আমি নাচব না। ব্যস, কথা এখানে শেষ।
তানু বলল,
— তা বললে তো হবে না ময়না। নাচ না দেখালে ক্লাসরুমে যাবে কীভাবে? ক্লাসরুমে যেতে হলে তো আমাদের সাহায্যই লাগবে।
ছোঁয়া রেগে কটমট করতে করতে বলল,
— দরকার নেই আপনাদের সাহায্য। আমরা নিজেরাই খুঁজে নিতে পারব। সামান্য একটা সাহায্য চাইতে এসে যদি নিজের মান-সম্মান জলাঞ্জলি দিতে হয়, তাহলে দরকার নেই এমন সাহায্যের। আপনারা সিনিয়র হয়ে জুনিয়রদের এভাবে স্বাগতম করেন? এভাবে সাহায্য করেন? তাহলে বলব, আপনাদের সাহায্য আপনাদের কাছেই রাখুন। ধন্যবাদ।
এই বলে ছোঁয়া শশীর হাত ধরে তানুর পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিল। ঠিক তখনই তানু পা দিয়ে ল্যাং মেরে দিল ছোঁয়াকে।
ছোঁয়া আচমকা পায়ের সঙ্গে কিছু একটা বাধায় তাল সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে। মাটিতে অনেক কংক্রিটের গুঁড়া এবং ছোট-বড় ভাঙা কাঁচের টুকরো পড়ে থাকায় ছোঁয়ার হাত ও হাঁটুতে বেশ ভালোভাবেই কাঁচের টুকরো ঢুকে গেল।
ছোঁয়া ব্যথায় ‘আহ্’ বলে কুঁকড়ে উঠল।
এদিকে ছোঁয়াকে পড়ে যেতে দেখে গ্রুপের সবাই হুঁ হুঁ করে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম। এতক্ষণ চারদিক থেকে মানুষজন তামাশা দেখছিল। ছোঁয়াকে পড়ে যেতে দেখে তারাও হাসাহাসি শুরু করে দিল। একজন মানুষও এগিয়ে এসে ছোঁয়াকে তুলল না।
বিষয়টি ছোঁয়ার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ছিল। আঠারো বছর বয়সের মধ্যে এমন অপমানের মুখোমুখি তাকে কখনো হতে হয়নি।
ছোঁয়াকে পড়ে থাকতে দেখে শশী দৌড়ে গিয়ে তাকে টেনে তুলল। লজ্জা, অপমান আর রাগে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছোঁয়া তানুর সামনে গিয়ে তার গালে সপাটে একটি চড় বসিয়ে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে সবার হাসি থেমে গেল। যেন পুরো ক্যাম্পাসে হঠাৎ নেমে এলো নীরবতা।
এদিকে ক্যাম্পাসে ঢুকেই ছোঁয়ার এমন কাণ্ড দেখে কোনো কিছু যাচাই-বাছাই না করেই আদর ছোঁয়াকে নিজের সামনে ঘুরিয়ে একটি থাপ্পড় মেরে দিল।
তানুকে থাপ্পড় মারার সময় ছোঁয়ার হাতে থাকা কাঁচের টুকরোগুলো আরও গভীরে ঢুকে যায়। একই সঙ্গে তানুর গালও ছোঁয়ার হাতে থাকা কাঁচের টুকরোয় কেটে যায়।
আদর আচমকা থাপ্পড় মারায় তাদের দুজনের কারও নিজের অবস্থার কথা খেয়াল ছিল না।
থাপ্পড় খেয়ে ছোঁয়া নিজের ব্যথা ভুলে গিয়ে কিছুক্ষণ আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইল। পরক্ষণেই কী হয়েছে বুঝতে পেরে বেশ ঝামেলা করল। তারপর রাগে হনহন করে তাদের সামনে দিয়ে ক্যান্টিনের দিকে চলে গেল।
বাইরে থেকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটলেও ছোঁয়ার হাত-পায়ের অবস্থা তখন খুব খারাপ। অনবরত রক্ত পড়ছিল। ছোঁয়া যেদিক দিয়ে ক্যান্টিনে হেঁটে গেল, সেই রাস্তায় রক্তের ফোঁটা ফোঁটা দাগ পড়ে একটি লাইন তৈরি হয়ে গেল।
ছোঁয়ার সঙ্গে কী কী ঘটে গেল, এতক্ষণ ধরে আনমনে সেসবই ভাবছিল সে।
এদিকে শশী ছোঁয়ার হাত দুটো ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে ময়লা পরিষ্কার করে তাকে টেবিলে বসাল। নিজেও পাশে বসে পড়ল। তবুও ছোঁয়ার হাতের রক্ত থামছে না।
শশী আস্তে আস্তে ছোঁয়ার হাতের কাঁচের টুকরোগুলো বের করার চেষ্টা করছে। দুই-তিনটি বের করার সময় হাতে ব্যথা অনুভূত হওয়ায় ছোঁয়ার ধ্যান ভাঙল।
শশী এতক্ষণ কী বলেছে, কিছুই ছোঁয়ার কর্ণগোচর হয়নি।
ছোঁয়ার অবস্থা দেখে শশী কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
— ইশ্ ছোঁয়া, তোর তো হাতের অবস্থা খুব খারাপ। কাঁচ তো একদম ভেতরে ঢুকে গেছে। আমি তো পারছি না বের করতে।
ছোঁয়া খুব শক্ত একজন মেয়ে। তার জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে হলে হয়তো চিৎকার করে পুরো ক্যাম্পাস মাথায় তুলে ফেলত। কিন্তু ছোঁয়া শান্ত, চুপচাপ।
তার মুখ দেখলে কেউ বলবে না যে এই মেয়েটার একটু আগেই এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। উল্টো সে শান্তভাবে শশীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
— কাঁদিস না। ঠিক হয়ে যাবে। তুই আস্তে আস্তে বের করার চেষ্টা কর।
শশী তো বেকুব বনে গেল। ছোঁয়ার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বলল,
— কিরে ভাই, জখম হয়েছিস তুই। কষ্ট পাচ্ছিস তুই। আর সান্ত্বনা দিচ্ছিস আমাকে?
ছোঁয়া মুচকি হাসল।
শশী আবার বলতে লাগল,
— কেন ওদের সঙ্গে লাগতে গেলি? দেখ, নিজের কী হাল করেছিস। ভার্সিটিতে সিনিয়রদের সঙ্গে লাগার অপরাধে আমাদের সঙ্গে কী কী হতে পারে, তোর কোনো ধারণা আছে? আমরা তাদের চোখে পড়ে গেছি। তারা আমাদের শান্তিতে বাঁচতে দেবে না। যতদিন এখানে থাকব, ততদিন তারা আমাদের সঙ্গে নতুন নতুন কিছু না কিছু করতেই থাকবে। আমার তো ভেবেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে।
— থাম তো। ওরা বাঘ নাকি ভাল্লুক? এত ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি আছি না! আর ওদের প্রথমে আমি কিছু করেছি নাকি? ওরাই তো আমাকে র্যাগিং করেছে। সবার সামনে নাচতে বলেছে। তারপর মেয়েটাও আমাকে যেভাবে ফেলে দিয়েছে, সেগুলো দেখে কি আমি চুপ থাকব? আমাকে তো প্রতিবাদ করতেই হতো। তাই আমি শুধু হালকার ওপর ঝাপসা ডোজ দিয়েছি।
মানুষ বলে না, বাসরঘরে প্রথম রাতেই বিড়াল মারতে হয়। ঠিক সেরকম—ভার্সিটিতে র্যাগিং করলে প্রথম দিনেই সিনিয়রকে মারতে হয়। আমি অন্য পাঁচটা মেয়ের মতো নই, এটা প্রথম দিনেই বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি ছিল। ওরাও বুঝুক, সবাইকে র্যাগিং করা যায় না।
সিনিয়ররা জুনিয়রদের সবসময় মুরগি ভাবে। এবার বুঝতে পারবে, সবাই মুরগি হয় না। কেউ কেউ বাঘিনীও হয়।
সব সময় প্রতিবাদী আর সাহসী মেয়ে হয়ে থাকবি। তাহলে শুধু ওরা কেন, এই ভার্সিটির কেউই কিছু বলার সাহস পাবে না। ভয় পাস না, আমি আছি।
তবে ওই ব্যাটা ঠিক করেনি। কোত্থেকে এসেই থাপ্পড় মেরে দিল! ব্যাটা আস্ত একটা বেয়াদব। ব্যাটাকে আমি পড়ে দেখে নেব, সুযোগ পেলে।
— এই ছোঁয়া, চুপ চুপ! তুই কাকে বেয়াদব বলছিস? তুই জানিস উনি কে?
— কে উনি? কোনো নেতা-খেতার ছেলে নাকি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে?
শশী বলল,
— উনি তার থেকে কমও নন। উনার নাম আদর আহমেদ চৌধুরী। এই ভার্সিটির টপার। সঙ্গে রাজনৈতিক দলের লিডার। বর্তমানে এই ভার্সিটিতে মাস্টার্স করছেন। প্রিন্সিপাল স্যারের আদর্শ ছাত্র। সব স্যার-ম্যাডামের প্রিয় ছাত্র। সব জুনিয়র ছেলেদের প্রিয় বড় ভাই। সবাই উনার কথায় ওঠে আর বসে।
তুই যে এখানে বসে বসে উনাকে বেয়াদব বলেছিস, দেখিস, এই কথাটা চোখের পলক ফেলার আগেই উনার কাছে পৌঁছে গেছে। ভাইরাস যেমন বাতাসে ছড়ায়, ঠিক তেমন।
উনার অনেক ক্ষমতা। পুরো ভার্সিটি উনার হাতের মুঠোয়।
ছোঁয়া ভেংচি দিয়ে বলে উঠল,
— এহ্, আসছে আমার আদর আহমেদ বাঁদর! একদম আদর্শ ছাত্র! এই জন্যই তো তার গ্রুপের সবাই একেকটা বদের হাড্ডি। এতই যদি ধোয়া তুলসীপাতা হতো, তাহলে ওইখানে বসে বসে র্যাগিং করত না।
এই তুই থাম তো প্লিজ। এত ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি আছি না। ওই বাঁদর কী করবে, দেখে নেব।
বাই দ্য রেলওয়ে, উনার নাম তুই কিভাবে জানলি? আর তার সম্পর্কে এত কিছু জানলি কীভাবে? তুই তো আজকেই প্রথম আসলি। তাছাড়া তুই তো আমার সঙ্গেই ছিলি।
— আরে, আমার কাজিন যে এইখানে পড়ে, ভুলে গেছিস নাকি? আপু আদর ভাইয়াদের ক্লাসেই পড়ে। আপুর কাছে কত শুনেছি। ছবিও দেখেছি। শুনেছি ভাইয়া নাকি ভার্সিটির সব মেয়েদের ‘ক্রাশ বয়’। আজকে সরাসরি দেখে আমি নিজেই ক্রাশ খেয়ে ফেলেছি। উফফ! আই অ্যাম জাস্ট ফিদা!
শশীর কথা শুনে ছোঁয়ার রাগ উঠে গেল। ধমক দিয়ে বলল,
— এই বেয়াদব, তুই থামবি? আমার সেবাযত্ন করতে বসেছিস, নাকি ওই আদর আহমেদ বাঁদরের গুণগান গাইতে? আরেকটা উল্টাপাল্টা কথা বললে তোর গালেও একটা থাপ্পড় লাগিয়ে দেব। ঠিকমতো কাজ কর।
ছোঁয়ার ধমক খেয়ে চুপ হয়ে গেল শশী।
হঠাৎ ছোঁয়ার পেছনে তাকাতেই শশী দেখল, আদর তার দলবল নিয়ে ক্যান্টিনে ঢুকছে। আর ঢুকেই তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
তাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে শশীর চোখ ছানাবড়া। গলা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম। হাত-পা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেছে।
জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভেজাতে ভেজাতে শশী বলল,
— ছোঁয়া, তুই যা যা বলেছিস, সব মনে হয় উনার কানে চলে গেছে। ওই দেখ, আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে!
লেখিকা: মমতাজ নাহার মনিকা
.
.
.
.
.
*চলবে...*
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন