০৩:০৯ এম
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি কাঠামোগত সমঝোতা চুক্তি যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসানের সম্ভাবনা তৈরি করলেও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর আগে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল, সেখানে সহজে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভারসাম্যকেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তনের পথে ঠেলে দিয়েছে।
যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। এতে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো নতুন বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।
আরও পড়ুন: শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মাইকিং, পুলিশ দুইজনকে আটক করেছে
স্বল্পমেয়াদে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো কয়লার ব্যবহার বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তির দিকে ঝুঁকছে বিশ্ব। পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সম্ভাবনাও জোরালো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈদ্যুতিক ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের সহজলভ্যতা এই রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করছে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদনে বায়ু ও সৌরশক্তি প্রথমবারের মতো গ্যাসকে ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৩ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন, ব্যারেল ৮০ ডলার।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলোর সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়ার পর আমিরাত ওপেক প্লাস জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা ভবিষ্যতে তেলের বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
আরও পড়ুন: ভারত থেকে আসা ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি
একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। যুদ্ধের সময় রাশিয়ার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার ফলে দেশটি তেল রপ্তানি থেকে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ পেয়েছে।
অন্যদিকে ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও গায়ানাও তেল উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা যায়।
বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার অবস্থানে রয়েছে চীন। সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন, ব্যাটারি, ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার উৎপাদনে দেশটি ইতোমধ্যে বিশ্বে শীর্ষস্থান দখল করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীনের ভূমিকা বাড়লে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেইজিংয়ের কৌশলগত প্রভাব আরও বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান একাধিকবার এই নৌপথে চলাচলকারী জাহাজের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যা ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ঝুঁকি হিসেবে থেকে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: যুবদল নেতা সাকের হত্যার বিচার দাবি করে সংবাদ সম্মেলন
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, যুদ্ধ শেষ হলেও এই নৌপথে আগের মতো নিরবচ্ছিন্ন ও নিশ্চিন্ত বাণিজ্যিক চলাচল আর ফিরে নাও আসতে পারে। ফলে পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচ দীর্ঘমেয়াদে বৃদ্ধি পেতে পারে।
যুদ্ধের সময় কাতারের গ্যাসক্ষেত্র, সৌদি আরবের পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হামলার শিকার হয়। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে পর্যটন ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া দেশগুলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিয়েছে। সংস্থাটি চলতি বছরের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়েছে।
আরও পড়ুন: মন্ত্রিপরিষদ সচিব জ্ঞানেশের কাছে দুই কমিশনারের চিঠি ফেরত পাঠালেন
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সুদের হার বৃদ্ধির প্রবণতা আবারও দেখা দিয়েছে। এতে সরকারি ঋণের বোঝা বাড়বে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র হতে পারে। এশিয়ার অনেক দেশ ইতোমধ্যে জরুরি আর্থিক সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর দ্বারস্থ হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে এমন এক পথে ঠেলে দিয়েছে যেখানে প্রবৃদ্ধি হবে তুলনামূলক ধীর, মূল্যস্ফীতি থাকবে বেশি এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়বে। যুদ্ধ শেষ হলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত বহু বছর ধরে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি, বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
আরও পড়ুন: বোদায় দেড় লাখ টাকাসহ এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আটক, পরে মুক্তি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন