০২:২২ পি.এম
খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতালের বেসমেন্টে থাকা জেনারেটর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। সম্পূর্ণ হাসপাতালজুড়ে আমরা দেখতে পেয়েছি মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যদিও আতঙ্কের পাশাপাশি আগুন ও ঘন কালো ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাত সাড়ে ৯টায় এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অল্প সময়ের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা ওপরের কয়েকটি ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। ঘন কালো ধোঁয়া আগুনের চেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি করে।
ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে রোগীদের পাশাপাশি স্বজন ও কর্মরতদেরও সঙ্গিন অবস্থা হয়। জীবন বাঁচাতে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন। তবে এই চরম সংকটের রাতে খুলনাবাসী নানা মানবিক ঘটনার সাক্ষী হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে উঠে এসেছে সেই হৃদয়স্পর্শী গল্প।
আরও পড়ুন: উখিয়ায় ১৫ ঘণ্টা পরও জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
নাজনীন ঊর্মি নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গতকাল রাতটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের হতে পারত, কিন্তু সে আনন্দ এক নিমিষেই চরম বিষাদে আর আতঙ্কে রূপ নেয়। আমার ছোট বোন তখন ওটিতে, মাত্রই এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। ঠিক তখনই খবর এলো সিটি মেডিকেল হাসপাতালে আগুন লেগেছে। চারদিক তখন শুধু কালো ধোঁয়া, মানুষের ছোটাছুটি আর বাঁচার আকুল চিৎকার। বিদ্যুৎ চলে গেল, ওটির ভেতরে তখনও আমার বোনের সিজারিয়ানের সেলাই বাকি। এমন এক মৃত্যুভয়ের মুহূর্তেও ডাক্তাররা দেবদূতের মতো অনড় রইলেন। তারা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে, মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় আমার বোনের সেলাই শেষ করলেন। ডাক্তারদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘অন্যপাশে তখন আর এক মানবিক ও ভালোবাসার মহাকাব্য লিখছিলেন আমার বোনজামাই। সবাই যখন নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত, তিনি তখন সদ্যজাত ছোট্ট কলিজার টুকরোটাকে বুকে চেপে ওটির বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। আগুন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে জেনেও, নিজের জীবনের পরোয়া না করে প্রিয় মানুষটির কাছ থেকে এক বিন্দু সরেননি। স্ত্রীকে ও সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন পরম মমতায়। একেই বোধহয় বলে সত্যিকারের ভালোবাসা, একেই বলে প্রকৃত জীবনসঙ্গী। মৃত্যুর দুয়ার থেকে এক নতুন জীবনের স্পন্দন নিয়ে ফিরে এসেছে ওরা। আমাদের পরিবারের এক অলৌকিক আলো, আমাদের অগ্নি কন্যা।’
সংবাদকর্মী এম এ সাদি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লিখেছেন, ‘আগুনের চেয়ে ধোঁয়া বেশি হওয়ায় বাইরের চিত্র ধারণ করে হাসপাতালের মেইন গেট দিয়ে আমি প্রথম তলা থেকে ১৫ তলার ছাদ পর্যন্ত যাই সংবাদ সংগ্রহের জন্য। গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোর সামনে ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও হাসপাতালের কর্মচারীদের দেখতে পাই। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা রোগী উদ্ধারে হাসপাতালের নানা ফ্লোরে ছোটাছুটি করতে থাকে।’
তিনি আরও জানান, কেবিনের এক ওয়ার্ড বয় রোগী ও স্বজনদের মনোবল দিতে বলছিলেন, ‘আমি মরে গেলেও আপনাদের বিপদে ফেলে যাবো না। ধোঁয়া কমলেই আপনাদের নিচে নিয়ে যাবো।’ সেই ওয়ার্ড বয় সত্যিই তাদের ছেড়ে যাননি। এছাড়া খুলনার অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্স চালক বিনামূল্যে অসংখ্য রোগীকে বিভিন্ন হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: তাহিরপুরে প্রবাসীর স্ত্রী ও পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে উধাও নাজমুল, পরিবার উদ্বিগ্ন
এদিকে বেসরকারি গাজী মেডিকেল কর্তৃপক্ষ রাতেই সিটি মেডিকেল থেকে স্থানান্তরিত রোগীদের চিকিৎসা ফ্রি ঘোষণা করে। তুহিন ও মইন নামের দুজন স্বেচ্ছাসেবী বলেছেন, ‘একশ বা দুইশো টাকার জন্য যে অ্যাম্বুলেন্স চালকরা রোগীদের জিম্মি করে রাখে, তারা যেভাবে মানবসেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা আসলে সত্যিই আমাদের কাজের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’
সুমন রায় নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেছেন, খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজে যখন আগুন লেগে চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার, তখন আইসিইউর দায়িত্বে থাকা এক ডাক্তারের খোঁজ নিতে ফোন করেছিলেন তিনি। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো হাঁসফাঁস করা এক ভীষণ ব্যস্ত কণ্ঠ, ‘চারপাশে প্রচণ্ড ধোঁয়া, নিঃশ্বাস নেয়া কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবুও একটা রোগীও ইভাকুয়েট (নিরাপদে সরানো) করার আগে আমরা এখান থেকে নামছি না। আর মাত্র ৩টা রোগী বাকি আছে, ওদের সরিয়েই আমরা নামার চেষ্টা করব।’
ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তাদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় জনতা, রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অধিকাংশ রোগীকে নিরাপদে বের করে আনা সম্ভব হয়। গুরুতর ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে ‘দাদা ভাই বাহিনী’র বন্দুকযুদ্ধে ৫ জেলে উদ্ধার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন