০২:৪৮ এম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চকচকে, মসৃণ এবং শিশিরভেজা ত্বকের ছবি দেখা যাচ্ছে। যেন মুখের ত্বক কাচের মতো উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ। এই আকর্ষণীয় সৌন্দর্যধারণার নাম ‘গ্লাস স্কিন’। কোরিয়ান সৌন্দর্যচর্চা থেকে উদ্ভূত এই প্রবণতা বর্তমানে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ত্বককে এমন ঝকঝকে করতে একাধিক টোনার, সিরাম, এসেন্স ও ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের পরামর্শ দেন অনেক সৌন্দর্যপ্রভাবক। কিছু সৌন্দর্যপ্রভাবক একই রুটিনে একাধিক স্তরে পণ্য ব্যবহারের ভিডিও প্রকাশ করছেন। তবে যে ত্বককে কাচের মতো উজ্জ্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেটি কি শেষ পর্যন্ত ত্বকের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে?
সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত এবং জটিল স্কিনকেয়ার রুটিনে ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা বা স্কিন ব্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে জ্বালা, ব্রণ, র্যাশ এবং বিভিন্ন ধরনের ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুন: ৩০ সেকেন্ডের অভ্যাসে মানসিক চাপ কমানো সম্ভব
কীভাবে জনপ্রিয় হলো ‘গ্লাস স্কিন’
‘গ্লাস স্কিন’ শব্দটি দক্ষিণ কোরিয়ার সৌন্দর্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। এটি এমন ত্বককে বোঝায়, যা অত্যন্ত মসৃণ, উজ্জ্বল এবং প্রায় ছিদ্রহীন দেখায়। ২০১০-এর দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ে ধারণাটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। তবে ২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৬ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে সৌন্দর্যপ্রভাবকেরা নিজেদের স্কিনকেয়ার রুটিনের ভিডিও প্রকাশ করতে থাকেন। সেখানে একাধিক পণ্য ব্যবহারের পাশাপাশি আঙুল বা বিউটি টুল দিয়ে মুখে আলতোভাবে চাপ দেওয়ার শব্দও অনেক দর্শকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। পরে অভিনেত্রী ও মডেলসহ বিভিন্ন তারকাও নিজেদের স্কিনকেয়ার রুটিন তুলে ধরায় প্রবণতাটি আরও ছড়িয়ে পড়ে।
বিপদ কোথায়?
আরও পড়ুন: খালি পেটে গরম পানির সঙ্গে মধু খেলে কী উপকারিতা হয়?
ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ব্যবহার ত্বকের যত্নে ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে একসঙ্গে অনেক পণ্য ব্যবহারের কারণে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ভিডিওতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ না থাকা ব্যক্তিরা ত্বকের যত্নের পরামর্শ দিচ্ছেন। ফলে এসব পরামর্শে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা তথ্য বাদ পড়ে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইউরোপিয়ান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি অ্যান্ড ভেনেরিওলজি কংগ্রেসে উপস্থাপিত এক গবেষণায় ‘গ্লাস স্কিন’ নিয়ে ভাইরাল ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা পাঁচটি কোরিয়ান স্কিনকেয়ার-সংক্রান্ত সার্চ শব্দের অধীনে জনপ্রিয় ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করেন। ৩৮টি ভিডিও বিশ্লেষণের পর দেখা যায়, প্রায় ৯৫ শতাংশ ভিডিওতে বিভ্রান্তিকর দাবি ছিল।
এর মধ্যে মাত্র একটি ভিডিওতে ত্বকে জ্বালাপোড়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল। মাত্র দুটি ভিডিওতে সূর্য থেকে ত্বক সুরক্ষার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। কোনো ভিডিওতেই কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিসের ঝুঁকি বা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়নি।
আরও পড়ুন: যমুনার বুকে চায়না বাঁধের রূপালী উপাখ্যান
প্রায় ৪৫ শতাংশ ভিডিওতে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পরামর্শ ছাড়াই একাধিক সক্রিয় উপাদান একসঙ্গে ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছিল। আর ৩২ শতাংশ ভিডিওতে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্লেষণ করা কোনো ভিডিওই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের তৈরি নয়।
বাস্তব অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়
টিকটকে একসময় ‘গ্লাস স্কিন গার্ল’ নামে পরিচিত ছিলেন গ্রেটা কোস্তিওলি। ত্বক স্বাভাবিকভাবেই শুষ্ক হওয়ায় কৈশোর থেকেই তিনি বেশি ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতেন। ‘গ্লাস স্কিন’ ট্রেন্ড জনপ্রিয় হওয়ার পর তিনি আরও বেশি পণ্য ব্যবহার শুরু করেন। একপর্যায়ে সাত স্তরে হাইড্রেটিং টোনার ব্যবহারের পদ্ধতিও অনুসরণ করেন।
শুরুতে এতে ভালো ফল পেয়েছিলেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাস্তব জীবন- দুই জায়গাতেই তার ত্বকের প্রশংসা হতে থাকে। কিন্তু পরে অতিরিক্ত পণ্য ব্যবহারের কারণে তার স্কিন ব্যারিয়ার বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
আরও পড়ুন: ‘ভালোবাসি’ বললেই কি যথেষ্ট? সম্পর্কে ৫টি বিষয়ও জরুরি
তার মুখে ছোট ছোট লালচে দানা দেখা দেয়, যা কয়েক দিন স্থায়ী হতো। অতিরিক্ত স্কিনকেয়ার চালিয়ে গেলে সেই দানাগুলো আরও তীব্র হয়ে উঠত। শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের স্কিনকেয়ার রুটিনের ধাপ কমাতে হয়।
‘ছিদ্রহীন’ ত্বক কি আদৌ সম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘গ্লাস স্কিন’-এর যে প্রায় ছিদ্রহীন ত্বকের ধারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখানো হয়, সেটি বাস্তবে অর্জন করা সম্ভব নয়। কারণ ত্বকের ছিদ্র বা পোরস জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং শুধু স্তরে স্তরে প্রসাধনী ব্যবহার করে এগুলো দূর করা যায় না। অতিরিক্ত পণ্য ব্যবহারের কারণে বরং কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস, রোসেশিয়া এবং ব্রণের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।
ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোনা গোহারা বলেন, ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে টানটান ভাব, চুলকানি, ব্যথা, প্রদাহ, খসখসে হয়ে যাওয়া এবং ত্বক লাল বা গাঢ় হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুন: প্রতিদিন কতগুলো ডিম খাওয়া নিরাপদ?
তাহলে কী করবেন?
ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিছুদিন স্ক্রাব, এক্সফোলিয়েটিং অ্যাসিড এবং রেটিনয়েড ব্যবহার বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ সময় হালকা, পিএইচ-নিরপেক্ষ এবং সাবানবিহীন ক্লিনজার এবং কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। স্কিন ব্যারিয়ার মেরামতে সহায়ক ক্রিমও ব্যবহার করা যেতে পারে। দিনের বেলায় সানস্ক্রিন ব্যবহার চালিয়ে যেতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের যত্নে জটিল রুটিনের প্রয়োজন নেই। সাধারণভাবে একটি মৃদু ক্লিনজার, ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি সক্রিয় উপাদান- যেমন রেটিনল, স্যালিসাইলিক অ্যাসিড অথবা ভিটামিন সি- ময়েশ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিন দিয়েই একটি সহজ রুটিন তৈরি করা যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের ত্বকের ধরন ও সহনশীলতা বোঝা। নতুন কোনো পণ্য একসঙ্গে অনেকগুলো না দিয়ে একটি করে ধীরে ধীরে ব্যবহার শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিদিন ৩০ বা তার বেশি এসপিএফের ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: ফেলে দেয়া ৬ হাজার প্লাস্টিক বোতলে নির্মিত পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন