০৮:২৮ এম
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসন, রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষ একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সেই স্বপ্ন ছিল গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন, শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির। জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধুমাত্র একটি সরকারের পতনের আন্দোলন ছিল না; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব এখন নির্বাচিত সরকারের। তবে রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এই বিপুল প্রাণহানি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার যেন আর কখনো ফিরে না আসে। গণতন্ত্র শুধু নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে নাগরিকের মর্যাদা, সমান অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের নিশ্চয়তা।
পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল অতীতে একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কোনো অনভিজ্ঞ রাজনৈতিক দলের সরকার নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে ধারণা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা সরকারের জন্য যেমন সুবিধা, তেমনি দায়িত্বও অনেক বেশি। রাষ্ট্র পরিচালনার জটিলতা সম্পর্কে অজ্ঞতার অজুহাত দেওয়ার সুযোগ তাদের নেই। জনগণ সরকারকে বিচার করবে অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, বরং বর্তমান কর্মকাণ্ড, সততা, দক্ষতা এবং বাস্তব অর্জনের ভিত্তিতে।
আরও পড়ুন: বাদীর লাশ ফেলার হুমকির পর এবার হামলা এজেআর কুরিয়ারের গাড়িতে
দেশের সংকটময় রাজনৈতিক উত্তরণ এবং নির্বাচনি পরিবেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থাকে কার্যকর এবং স্বনির্ভর করে তোলা, যাতে সশস্ত্র বাহিনী তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং জাতীয় প্রতিরক্ষায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ দায়িত্ব ও এখতিয়ারের মধ্য থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে। নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। মানুষ চায় নিরাপদ জীবন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সহনীয় মূল্য, কর্মসংস্থান, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা। বাংলাদেশ বিগত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাংকের ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ছিল প্রায় ৪০০ মার্কিন ডলার, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২,৫০০ ডলারের বেশি হয়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, অর্থ পাচার, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা দেশের অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ধারাবাহিক সংস্কার।
সুশাসনকে সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা, নিরপেক্ষতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ সুশাসনের প্রধান ভিত্তি। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রীয় পদ কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা বা ক্ষমতা প্রদর্শনের স্থান নয়; এটি জনগণের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং ফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে হবে। শুধু বক্তৃতা, ঘোষণা কিংবা রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে জনগণের আস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যাপক রদবদলের প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি রাষ্ট্রের দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নতুন সরকারকে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, দেশপ্রেম, দক্ষতা এবং পেশাগত সাফল্য হতে হবে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। দলীয় পরিচয় কখনোই যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এগুলো জনগণের প্রতিষ্ঠান।
প্রধানমন্ত্রীকে এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে গঠনমূলক সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না। কোনো সরকার কিংবা নেতা সব বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের সমালোচনার মধ্যেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ থাকতে পারে। সরকারকে সেগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। ক্ষমতার চারপাশে শুধু প্রশংসাকারী, সুবিধাবাদী এবং তোষামোদকারীদের উপস্থিতি নেতৃত্বকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নেতারা যখন অপ্রিয় সত্য শোনা বন্ধ করেন, তখনই তাদের ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, দুর্নীতি এবং জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গুরুতর অপরাধের অভিযোগের নিষ্পত্তি ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা যেন বিচার এড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি না করে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের প্রশ্নেও এই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তবে বিচার অবশ্যই হতে হবে প্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন আদালতের মাধ্যমে; রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা সমষ্টিগত শাস্তির ভিত্তিতে নয়। অপরাধীর পরিচয় যা-ই হোক, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই অতীতের দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটানো সম্ভব।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আমাদের জন্য যেমন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জও বাড়িয়েছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালিত হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা, সার্বভৌমত্ব এবং বাস্তব সহযোগিতার ভিত্তিতে। কোনো বিদেশি শক্তির অযৌক্তিক প্রভাব কিংবা চাপের কাছে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া যাবে না। সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্যিক ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জাতীয় অগ্রাধিকারে থাকতে হবে। আঞ্চলিক ইতিহাস থেকে নেতৃত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে মূল্যবান শিক্ষা নেওয়া যায়। ১৯৬৫ সালে স্বাধীনতার পর লি কুয়ান ইউয়ের নেতৃত্বে সিঙ্গাপুর সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েও দক্ষ প্রশাসন, শিক্ষায় বিনিয়োগ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করে। হংকংয়ের অর্থনৈতিক উত্থানেও দক্ষ প্রশাসন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আইনের শাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, দূরদর্শী নেতৃত্ব জাতীয় পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি; তবে সেই পরিবর্তন স্থায়ী করতে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও ধারাবাহিক নীতি।
আরও পড়ুন: জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি থাকলেও মিলছে না: শামা ওবায়েদ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে ইতিহাস সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। তার বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় পরিচয়, স্বনির্ভরতা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নীতির ইতিবাচক দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় সাহসী এবং বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তার চারপাশে থাকতে হবে পরীক্ষিত, দেশপ্রেমিক, যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং স্বাধীনভাবে মতামত দিতে সক্ষম ব্যক্তিদের। ক্ষমতার কাছাকাছি আসা নতুন পরিচিত কিংবা সুবিধাবাদী ব্যক্তিরা যেন অযৌক্তিক প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং দলীয় নেতাদের বক্তব্য ও আচরণেও সংযম অপরিহার্য। অহংকার, উসকানিমূলক বক্তব্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনগণের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির প্রবণতা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে নানা তকমা দিয়ে অপমান বা হয়রানির সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য, অপপ্রচার এবং সহিংসতায় উসকানি মোকাবিলায় আইনসম্মত ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সরকারের সমালোচনার অধিকার অবশ্যই অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ ও ১৯৮২ সালের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সংঘাত ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কতটা দুর্বল করতে পারে। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারি, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি হস্তক্ষেপ, সাইবার আক্রমণ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে প্রকৃত হুমকি মোকাবিলায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সবশেষে রাজনৈতিক দলগুলোকে উপলব্ধি করতে হবে, গণতন্ত্র মানে যেকোনো মূল্যে অবিলম্বে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা নয়। বিরোধী দলের দায়িত্ব সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা, বিকল্প নীতি প্রস্তাব করা এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করতে হবে। ক্ষমতার লোভে দেশকে অস্থিতিশীল করা কিংবা জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশ সবার, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও সবার। তাই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও জাতীয় ঐক্য, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামনে প্রতিহিংসা, কর্তৃত্ববাদ, দুর্নীতি ও দলীয় আধিপত্যের পুরোনো চক্র ভেঙে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগানোর প্রধান দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উপলব্ধি করতে হবে, তার সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন থাকবে, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে এবং প্রতিটি নাগরিক নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাবে। ইতিহাসের শিক্ষা হলোÑক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু সুশাসনের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের আস্থা এবং রাষ্ট্রের জন্য রেখে যাওয়া ইতিবাচক অবদান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন সাহসী নেতৃত্ব, দায়িত্বশীল রাজনীতি, দক্ষ প্রশাসন এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐক্য। ব্যক্তির চেয়ে দল, দলের চেয়ে দেশÑএই নীতিই হোক নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা
আরও পড়ুন: সড়ক-ফুটপাতে হকার বসলেই মামলা ও মালামাল ক্রোক: ডিএসসিসি প্রশাসক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন