ঢাকা শনিবার, ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ০৮ই কার্তিক, ১৪৩৩বঙ্গাব্দ ১৩ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
শনিবার, ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ইং ০৮ই কার্তিক, ১৪৩৩বাং

সুশাসনের প্রয়োজন, ক্ষমতার নয়


সুশাসনের প্রয়োজন, ক্ষমতার নয়

২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসন, রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষ একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সেই স্বপ্ন ছিল গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন, শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির। জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধুমাত্র একটি সরকারের পতনের আন্দোলন ছিল না; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব এখন নির্বাচিত সরকারের। তবে রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এই বিপুল প্রাণহানি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার যেন আর কখনো ফিরে না আসে। গণতন্ত্র শুধু নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে নাগরিকের মর্যাদা, সমান অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের নিশ্চয়তা।

পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল অতীতে একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কোনো অনভিজ্ঞ রাজনৈতিক দলের সরকার নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে ধারণা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা সরকারের জন্য যেমন সুবিধা, তেমনি দায়িত্বও অনেক বেশি। রাষ্ট্র পরিচালনার জটিলতা সম্পর্কে অজ্ঞতার অজুহাত দেওয়ার সুযোগ তাদের নেই। জনগণ সরকারকে বিচার করবে অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, বরং বর্তমান কর্মকাণ্ড, সততা, দক্ষতা এবং বাস্তব অর্জনের ভিত্তিতে।

আরও পড়ুন: বাদীর লাশ ফেলার হুমকির পর এবার হামলা এজেআর কুরিয়ারের গাড়িতে

দেশের সংকটময় রাজনৈতিক উত্তরণ এবং নির্বাচনি পরিবেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থাকে কার্যকর এবং স্বনির্ভর করে তোলা, যাতে সশস্ত্র বাহিনী তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং জাতীয় প্রতিরক্ষায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ দায়িত্ব ও এখতিয়ারের মধ্য থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে। নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। মানুষ চায় নিরাপদ জীবন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সহনীয় মূল্য, কর্মসংস্থান, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা। বাংলাদেশ বিগত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাংকের ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ছিল প্রায় ৪০০ মার্কিন ডলার, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২,৫০০ ডলারের বেশি হয়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, অর্থ পাচার, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা দেশের অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ধারাবাহিক সংস্কার।

সুশাসনকে সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা, নিরপেক্ষতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ সুশাসনের প্রধান ভিত্তি। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রীয় পদ কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা বা ক্ষমতা প্রদর্শনের স্থান নয়; এটি জনগণের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং ফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে হবে। শুধু বক্তৃতা, ঘোষণা কিংবা রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে জনগণের আস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যাপক রদবদলের প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি রাষ্ট্রের দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নতুন সরকারকে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, দেশপ্রেম, দক্ষতা এবং পেশাগত সাফল্য হতে হবে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। দলীয় পরিচয় কখনোই যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এগুলো জনগণের প্রতিষ্ঠান।

প্রধানমন্ত্রীকে এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে গঠনমূলক সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না। কোনো সরকার কিংবা নেতা সব বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের সমালোচনার মধ্যেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ থাকতে পারে। সরকারকে সেগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। ক্ষমতার চারপাশে শুধু প্রশংসাকারী, সুবিধাবাদী এবং তোষামোদকারীদের উপস্থিতি নেতৃত্বকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নেতারা যখন অপ্রিয় সত্য শোনা বন্ধ করেন, তখনই তাদের ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, দুর্নীতি এবং জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গুরুতর অপরাধের অভিযোগের নিষ্পত্তি ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা যেন বিচার এড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি না করে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের প্রশ্নেও এই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তবে বিচার অবশ্যই হতে হবে প্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন আদালতের মাধ্যমে; রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা সমষ্টিগত শাস্তির ভিত্তিতে নয়। অপরাধীর পরিচয় যা-ই হোক, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই অতীতের দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটানো সম্ভব।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আমাদের জন্য যেমন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জও বাড়িয়েছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালিত হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা, সার্বভৌমত্ব এবং বাস্তব সহযোগিতার ভিত্তিতে। কোনো বিদেশি শক্তির অযৌক্তিক প্রভাব কিংবা চাপের কাছে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া যাবে না। সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্যিক ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জাতীয় অগ্রাধিকারে থাকতে হবে। আঞ্চলিক ইতিহাস থেকে নেতৃত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে মূল্যবান শিক্ষা নেওয়া যায়। ১৯৬৫ সালে স্বাধীনতার পর লি কুয়ান ইউয়ের নেতৃত্বে সিঙ্গাপুর সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েও দক্ষ প্রশাসন, শিক্ষায় বিনিয়োগ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করে। হংকংয়ের অর্থনৈতিক উত্থানেও দক্ষ প্রশাসন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আইনের শাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, দূরদর্শী নেতৃত্ব জাতীয় পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি; তবে সেই পরিবর্তন স্থায়ী করতে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও ধারাবাহিক নীতি।

আরও পড়ুন: জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি থাকলেও মিলছে না: শামা ওবায়েদ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে ইতিহাস সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। তার বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় পরিচয়, স্বনির্ভরতা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নীতির ইতিবাচক দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় সাহসী এবং বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তার চারপাশে থাকতে হবে পরীক্ষিত, দেশপ্রেমিক, যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং স্বাধীনভাবে মতামত দিতে সক্ষম ব্যক্তিদের। ক্ষমতার কাছাকাছি আসা নতুন পরিচিত কিংবা সুবিধাবাদী ব্যক্তিরা যেন অযৌক্তিক প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং দলীয় নেতাদের বক্তব্য ও আচরণেও সংযম অপরিহার্য। অহংকার, উসকানিমূলক বক্তব্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনগণের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির প্রবণতা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে নানা তকমা দিয়ে অপমান বা হয়রানির সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য, অপপ্রচার এবং সহিংসতায় উসকানি মোকাবিলায় আইনসম্মত ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সরকারের সমালোচনার অধিকার অবশ্যই অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ ও ১৯৮২ সালের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সংঘাত ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কতটা দুর্বল করতে পারে। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারি, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি হস্তক্ষেপ, সাইবার আক্রমণ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে প্রকৃত হুমকি মোকাবিলায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সবশেষে রাজনৈতিক দলগুলোকে উপলব্ধি করতে হবে, গণতন্ত্র মানে যেকোনো মূল্যে অবিলম্বে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা নয়। বিরোধী দলের দায়িত্ব সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা, বিকল্প নীতি প্রস্তাব করা এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করতে হবে। ক্ষমতার লোভে দেশকে অস্থিতিশীল করা কিংবা জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশ সবার, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও সবার। তাই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও জাতীয় ঐক্য, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামনে প্রতিহিংসা, কর্তৃত্ববাদ, দুর্নীতি ও দলীয় আধিপত্যের পুরোনো চক্র ভেঙে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগানোর প্রধান দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উপলব্ধি করতে হবে, তার সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন থাকবে, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে এবং প্রতিটি নাগরিক নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাবে। ইতিহাসের শিক্ষা হলোÑক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু সুশাসনের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের আস্থা এবং রাষ্ট্রের জন্য রেখে যাওয়া ইতিবাচক অবদান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন সাহসী নেতৃত্ব, দায়িত্বশীল রাজনীতি, দক্ষ প্রশাসন এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐক্য। ব্যক্তির চেয়ে দল, দলের চেয়ে দেশÑএই নীতিই হোক নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা

আরও পড়ুন: সড়ক-ফুটপাতে হকার বসলেই মামলা ও মালামাল ক্রোক: ডিএসসিসি প্রশাসক

[email protected]

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

টানা দুই হারে সিরিজ হাতছাড়া বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

স্পোর্টস ডেস্ক

শনিবার, ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:২৯ এম


টানা দুই হারে সিরিজ হাতছাড়া বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল আফগানিস্তানের বিপক্ষে চার ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ জিততে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও তারা ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। শেষ দুই ম্যাচে পরাজয়ের ফলে সিরিজটি তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়।

শুক্রবার সিরিজের চতুর্থ ও শেষ ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ৪ উইকেটে হেরেছে আফগানিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কাছে। প্রথম দুই ম্যাচে যথাক্রমে ৩৩ রানে এবং সুপার ওভারে জয়লাভ করেছিল বাংলাদেশ। তৃতীয় ম্যাচে আফগানিস্তান ৪৩ রানে জয়লাভ করে সিরিজের ব্যবধান কমায়। শেষ ম্যাচটি জিতে আফগানিস্তান সিরিজ ২-২ সমতায় শেষ করে।

ওমানের আল আমেরাত ক্রিকেট গ্রাউন্ডে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং শুরু করে বাংলাদেশ। অধিনায়ক ফরিদ হাসানের হাফ সেঞ্চুরির সাহায্যে তারা ৫০ ওভারে ৯ উইকেটে ২১৯ রান সংগ্রহ করে। চার নম্বরে ব্যাটিং করতে নেমে ফরিদ ৪টি চারে ১৪৫ বল খেলে ৮২ রান করেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রহ করেন আলআমিন হোসেন রনি ও রবিউল ইসলাম অনিক, যারা ২৯ রান করে। এছাড়া আহসান আল মুমিনের ব্যাট থেকে আসে ২৩ রান।

আফগানিস্তানের আমির হামজা ও সোহেল খান ৩টি করে উইকেট নেন। জবাবে আফগানিস্তান সুবহান জাখাইল ও তাহির সারওয়ারির জোড়া হাফ সেঞ্চুরির মাধ্যমে ১১ বল বাকি থাকতে জয়লাভ করে। সুবহান ৬০ রান এবং তাহির অপরাজিত ৬৭ রান করেন। বাংলাদেশের আল আমিন ২ উইকেট নেন।

সূত্র: বাসস

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

পাতায়ায় বাংলা খাবারের চাহিদা বাড়লেও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে বাংলাদেশি কর্মীরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শনিবার, ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:২৯ এম


পাতায়ায় বাংলা খাবারের চাহিদা বাড়লেও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে বাংলাদেশি কর্মীরা

থাইল্যান্ডের পর্যটননগরী পাতায়ায় বাংলাদেশি খাবারের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সেখানে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না বাংলাদেশি কর্মীরা। হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, আসিয়ানভুক্ত দেশের নাগরিকেরা বেশি সুবিধা পাওয়ার কারণে বাংলাদেশিরা কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে, ঢাকা এবং ব্যাংককের মধ্যে শ্রমবিষয়ক চুক্তির মাধ্যমে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানাচ্ছেন প্রবাসীরা।

পাতায়া, রাজধানী ব্যাংকক থেকে সড়কপথে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, রাতভর পর্যটকদের জন্য অপেক্ষা করে। এখানে সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ, হাঁটা, কেনাকাটা এবং অবসর কাটানোর নানা আয়োজন রয়েছে, যা এই শহরটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশি ও ভারতীয় খাবারের স্বাদ দিতে পাতায়ায় বেশ কিছু রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশিদের পরিচালিত বিভিন্ন খাবারের প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। পাতায়ার কারি হেভেন রেস্তোরাঁর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মানসুরা আলম সনি জানান, ‘বাংলাদেশ থেকে অনেকে থাইল্যান্ডে এসে পাতায়ায় ঘুরতে আসেন। তাদের খাবার নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে সব জায়গায় হালাল খাবার পাওয়া যায় না। তাদের কথা ভেবেই এখানে ১০ বছর আগে রেস্তোরাঁটি গড়ে তুলেছি। আগে আমার তিনজন কর্মী ছিলেন, এখন আছেন আটজন।’

শখের বশে গড়ে তোলা এসব রেস্তোরাঁর খাবার ও আতিথেয়তায় অতিথিরা মুগ্ধ। আগে থেকে জানালে পর্যটক ও অতিথিদের চাহিদা অনুযায়ী খাবার পরিবেশন করা সম্ভব। একজন পর্যটক মন্তব্য করেন, ‘এখানে খেতে এলে মনে হয়, রেস্তোরাঁয় নয়, নিজের বাসায় খাচ্ছি। খাবার খুব ভালো।’

কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কর্মী আনার প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় রেস্তোরাঁগুলোতে অন্য দেশের নাগরিকদের নিয়োগ দিতে হচ্ছে। কারি হেভেন রেস্তোরাঁর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, ‘আমরা নেপালি ও বার্মিজ কর্মী রাখি। কারণ, তারা এলে থাইল্যান্ডে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটসহ তাদের পেছনে বছরে মাত্র চার থেকে পাঁচ হাজার বাত খরচ হয়। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কর্মী আনতে পারি না, কারণ কর দিতে হয় অনেক বেশি। একটি ওয়ার্ক পারমিটের জন্য সারা বছর চার ধরনের কর দিতে হয়। এতে আমাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। এ কারণে বাংলাদেশ থেকে কোনো কর্মী আনি না।’

এই পরিস্থিতিতে, ঢাকা ও ব্যাংককের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সহজে কাজের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানাচ্ছেন প্রবাসীরা। তাদের মতে, এতে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং দেশে প্রবাসী আয়ও বাড়ানো সম্ভব হবে।

পাতায়ার প্রাণো কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে থাইল্যান্ডের শ্রমবিষয়ক কোনো চুক্তি নেই। এ ধরনের চুক্তি হলে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পর্যায়ের কর্মীরাও এখানে আসতে পারতেন। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে যারা আসেন, তাদের বেশিরভাগই ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে কাজ করেন। তারা নিচের স্তরের কাজ করতে পারেন না। বাংলাদেশে শ্রমিকের অভাব নেই, অন্যদিকে এখানে শ্রমিকের সংকট রয়েছে। আমরা এই ব্যবধানকে কাজে লাগাতে পারি।’

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

মাতারবাড়ী বন্দর যেন ভারতের স্বার্থে না হয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শনিবার, ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:৩০ এম


মাতারবাড়ী বন্দর যেন ভারতের স্বার্থে না হয়

জাপানের প্রস্তাবিত আঞ্চলিক বাণিজ্য করিডোর একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। মাতারবাড়ী বন্দর ব্যবহার করতে দিলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাবে?

একটি গভীর সমুদ্রবন্দর দেশের সমৃদ্ধির পথ খুলে দিতে পারে। তবে সেই বন্দরের উপযোগিতা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর—বন্দরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, খরচ কত, আর সুবিধা কারা পায়? মাতারবাড়ীর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

‘দ্য হিন্দু’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপান এই বন্দরকে কেন্দ্র করে একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন গড়তে আগ্রহী। এটি বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের আগেই এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু প্রতিবেদনে বাণিজ্যিক শর্ত স্পষ্ট করা হয়নি। খরচ কীভাবে ভাগ হবে, তাও বলা নেই। বাংলাদেশ কী সুবিধা পাবে, সেটিও অস্পষ্ট।

এই না-বলা কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের একটি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। অন্যরা যেমন জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বাজার নিয়ে দর-কষাকষি করে, বাংলাদেশকেও একই মনোভাব নিয়ে প্রবেশাধিকার নিয়ে দর-কষাকষি করতে হবে। সরকারকে একটি বিষয় বুঝতে হবে—যেকোনো চুক্তির কারণে বাংলাদেশ বোঝা বইবে, আর ভারত কৌশলগত সুবিধা পাবে, তা ব্যাপক জনরোষ তৈরি করতে বাধ্য।

সংযোগ যখন আধিপত্যের হাতিয়ার

প্রতিবেশী অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সংযোগ হলেই যে আধিপত্য তৈরি হয়, তা নয়। একটি সুপরিকল্পিত বন্দর বাংলাদেশের রপ্তানিকারক ও প্রতিবেশী দেশগুলো—দুই পক্ষই ব্যবহার করতে পারে। এতে বাংলাদেশ অনেক লাভবান হতে পারে। বেশি কার্গো এলে জাহাজ চলাচল, লজিস্টিকস ও বিনিয়োগ বাড়তে পারে।

সমস্যা তৈরি হয় অসম ক্ষমতার ভিত্তিতে গড়া সহযোগিতায়। ধরা যাক, বাংলাদেশ আর্থিক ও পরিবেশগত দায়ের বড় অংশ নিল। আর ভারত কিছু না দিয়েই সস্তায় ও নির্ভরযোগ্যভাবে বন্দর ব্যবহার করল। তখন মাতারবাড়ী ভারতীয় আধিপত্যের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

চুক্তির শর্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি, তাই এটিকেই নিশ্চিত কিছু ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আধিপত্য মানেই ভূখণ্ডের মালিকানা নয়। বড় প্রতিবেশীর স্বার্থ যখন ছোট প্রতিবেশীর অবকাঠামো ও ব্যয়নীতি ঠিক করে দেয়, তখনো আধিপত্য তৈরি হতে পারে। বন্দর বাংলাদেশের এখতিয়ার ও নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। কিন্তু এর অর্থনৈতিক বিকাশের দিক অন্যরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

তাই কিছু প্রশ্নের উত্তর দরকার। যেমন প্রবেশাধিকারের নীতি কে ঠিক করবে? শুল্ক বা দাম কে নিয়ন্ত্রণ করবে? অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরিতে কে বিনিয়োগ করবে? বাংলাদেশ কি নিজের শুল্ক ও নিরাপত্তাবিধি কার্যকর করতে পারবে? বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হলে কী পরিবর্তন করার সুযোগ থাকবে?

খরচ কে বহন করবে

‘জাপানের অর্থায়নে’ কথাটির অর্থ স্পষ্ট করা দরকার। ঋণ নিয়ে অর্থায়ন করলে পরিশোধের দায় তৈরি হয়। এর মানে এই নয় যে, খরচ জাপান বহন করছে। জাইকার সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকার মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প (২)-এর জন্য ১০৫ দশমিক ৩৬২ বিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত ঋণচুক্তি করে। ঋণের শর্তগুলো হলো—পরিশোধের মেয়াদ ৩০ বছর। গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর। প্রকল্পের বার্ষিক সুদের হার ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং পরামর্শক সেবার জন্য আলাদা অতিরিক্ত হার।

এটি মাত্র একটি ঋণ। এটি প্রকল্পের মোট খরচ নয়। এই ঋণ পরিশোধের দায় বাংলাদেশের। বন্দরের আয় এই বোঝা কমাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু আয় অপর্যাপ্ত হলে ঝুঁকিতে পড়বে সরকারি খাত।

তাই প্রস্তাবিত আঞ্চলিক ব্যবস্থায় তিনটি বিষয় আলাদা করতে হবে—১. বাংলাদেশের নিজের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। ২. বিদেশি ট্রানজিট সেবা দিতে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অবকাঠামো। ৩. সেই ট্রানজিটের কারণে সৃষ্ট পরিচালন ব্যয়।

কিছু ভারতীয় কোম্পানি বন্দর ব্যবহার করবে বলে ভারতকে বাংলাদেশের বন্দরের পুরো নির্মাণ খরচ দিতে হবে, এমন নয়। একইভাবে শুধু ভারতের বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশকে বাড়তি সড়ক, রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো, শুল্ক ভবন বা অন্যান্য স্থাপনা বানাতে হবে, এটাও ঠিক নয়।

এসব খরচ মেটাতে হবে আগে থেকে ঠিক করা ব্যবস্থায় বা অন্য কোনো পূর্বসম্মত পদ্ধতিতে।

সরকারকে পুরো অর্থায়ন-পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। এতে থাকতে হবে দেশীয় বিনিয়োগ, ঋণ, পরিচালন ব্যয় ও বাস্তবসম্মত আয়ের প্রাক্কলন। বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের আলাদা আলাদা সুনির্দিষ্ট সংখ্যা-পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে একটি বড় অঙ্ক দেখালে চলবে না।

ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ কী পাবে

প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর নেই। বাংলাদেশকে ‘সেভেন সিস্টার্স’-এ যাওয়ার পথ হিসেবে ব্যবহার করার বিনিময়ে ভারত ঠিক কী দেবে? সম্ভাব্য লাভ অনেক; কিন্তু সম্ভাবনা মানেই তা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নয়।

বন্দর ফি, পরিবহন আয়, গুদামভাড়া ও লজিস্টিকস সেবার আয় বাংলাদেশের হতে পারে। জাহাজ-সংযোগ ও শিল্প বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরাও লাভবান হবেন। তবে এসব লাভ নির্ভর করে কার্গোর পরিমাণ, মূল্য, অংশগ্রহণ ও বাজারে প্রবেশাধিকারের ওপর।

বাণিজ্যিকভাবে ন্যায্য একটি চুক্তিতে নিচের বিষয়গুলো থাকা উচিত :

ট্রানজিট থেকে আয় শুধু আকর্ষণীয় রাজনৈতিক শিরোনামের জন্য ঠিক করা উচিত নয়। শুল্ক অতিরিক্ত বেশি হলে কার্গো আসা কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত কম হলে বাংলাদেশের ভূগোলের অর্থনৈতিক মূল্য বিদেশি ব্যবহারকারীদের হাতে চলে যাবে। বাজার কত শুল্ক সইতে পারবে এবং বাংলাদেশের কত আদায় করা দরকার, তা স্বাধীন বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঠিক করতে হবে।

আসল মাপকাঠি হলো নিট জাতীয় লাভ। হিসাব করতে হবে এসব বাদ দিয়ে—পরিচালন ব্যয়, ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, পরিবেশগত বিবেচনা, অন্য খাতে সরকারি অর্থ ব্যবহারের হারানো সুযোগ।

করিডোর মানেই শিল্পোন্নত অর্থনীতি নয়

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন ধারণাটি ভালোভাবে বোঝা দরকার। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পণ্য গেলেই বাংলাদেশে শিল্প গড়ে ওঠে না। একটি কনটেইনার বন্দর হয়ে সড়ক ধরে চলে যেতে পারে। পথে দেশের ভেতরে খুব সামান্য মূল্য সংযোজন হয়।

মাতারবাড়ী শিল্পায়নের মাধ্যম হতে হলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ লাগবে। বিনিয়োগ দরকার শিল্প, সরবরাহ-শৃঙ্খল, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও উদ্যোক্তা তৈরিতে। সরকারকে প্রশ্ন করতে হবেÑকারখানা কে বানাবে? দক্ষ শ্রমিক কে নিয়োগ দেবে? উচ্চমূল্যের উৎপাদন-ধাপের লাভ কে পাবে?

সীমান্তের ওপারে যদি উৎপাদন বাড়তে থাকে আর বাংলাদেশ শুধু ট্রানজিট পথ হয়ে থাকে, তাহলে লাভের ভাগাভাগি অসম থেকে যাবে। তাই জাপানের ভূমিকা মাপতে হবে বাংলাদেশের উৎপাদন-সক্ষমতায় তার বিনিয়োগ দিয়ে।

চুক্তিতে যা লিখিত থাকতে হবে

বাণিজ্যিক চলাচলের ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। চুক্তিতে স্পষ্ট করে নির্ধারণ করতে হবে—পণ্যের ধরন, পরিদর্শন প্রক্রিয়া, দায়বদ্ধতা, বীমা, পরিবেশগত বিষয় ও বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি।

বাণিজ্যিক ট্রানজিট যেন গোপন নিরাপত্তাগত সুবিধা বা প্রবেশাধিকারের উৎস হয়ে না যায়।

বাংলাদেশের আরো কিছু অধিকার স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকা উচিত—জরুরি অবস্থায় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার, নিজের আইন প্রয়োগের অধিকার এবং নির্দিষ্ট বিরতিতে শুল্ক পর্যালোচনার অধিকার।

এসব সুরক্ষা থাকলে বাণিজ্য অনির্ভরযোগ্য হয়ে যায় না। স্পষ্ট নিয়ম বরং বাণিজ্যকে শক্তিশালী করে, আবার সার্বভৌমত্বও রক্ষা করে। দুর্বলতা আসে অস্পষ্টতা থেকে, বিশেষ করে যখন এক পক্ষের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি।

মাতারবাড়ী বন্দর একাধিক অংশীদারের বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ব্যবসার জন্যও খোলা থাকা উচিত। একটিমাত্র দেশের কার্গোর ওপর নির্ভর করলে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে যেতে পারে। রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটলে প্রত্যাশিত আয়ও ঝুঁকিতে পড়বে।

সরকারকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে

অসম চুক্তি নিয়ে জনরোষের সম্ভাবনা উপেক্ষা করলে সরকার বড় ভুল করবে। নাগরিকদের কিছু বিষয় জানার অধিকার আছে। যেমন : বিদেশিদের ব্যবসায়িক স্বার্থে সরকার কেন ঋণ নেবে? কেন সেই ঋণের গ্যারান্টি দেবে? বিনিময়ে দেশ কতটা কাজ ও অর্থ পাবে?

কোনো প্রকল্পে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে সরকারের উচিত জনগণকে চুক্তির শর্ত জানানো, যথাযথ সমীক্ষা করা এবং সংসদে আলোচনার সুযোগ দেওয়া।

প্রকাশিত বিবরণে থাকতে হবে রাজস্বের পরিমাণ, ঋণ, খরচের ভাগ এবং কার্গো প্রত্যাশামতো না এলে কী প্রভাব পড়বে।

আরো কিছু বিষয় আছে। যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হবে এবং যারা পরিবেশগত পরিবর্তনের ক্ষতি সইবে, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। তাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

ভারত কেন প্রবেশাধিকার চায়, তা বোঝা সহজ। জাপান কেন এই অঞ্চলে শিল্প-নেটওয়ার্ক চায়, তাও বোঝা সহজ। বাংলাদেশকেও নিজের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ঠিক করতে হবে। যে প্রস্তাব দুই পক্ষের জন্য লাভজনক নয়, তা নতুন করে ভেবে দেখতে হবে। ভারতের সঙ্গে ভালো কূটনৈতিক সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে, কিছু না পেয়ে শুধু দিয়ে যেতে হবে।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের সাভানা স্টেট ইউনিভার্সিটি ব্যবসা, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

২০২৮ সালের শুরুতেই অলিম্পিক ক্রিকেটের বাছাই পর্ব শুরু হবে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

স্পোর্টস ডেস্ক

শনিবার, ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:৩২ এম


২০২৮ সালের শুরুতেই অলিম্পিক ক্রিকেটের বাছাই পর্ব শুরু হবে

১২৪ বছর পর ক্রিকেট অলিম্পিকের মঞ্চে ফিরে আসছে। ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে অংশগ্রহণের জন্য দলগুলোর বাছাই পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ২০২৮ সালের শুরুতেই। পূর্বে ২০২৭ সালে এই প্রতিযোগিতার আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সূচিতে পরিবর্তন এনে অলিম্পিক শুরুর ছয় মাসেরও কম সময় আগে নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সদস্য দেশগুলোর কাছে যে হালনাগাদ সূচি পাঠানো হয়েছে, তাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সূচিতে অলিম্পিক বাছাই পর্বের পাশাপাশি ২০২৮ সালের পুরুষ ও নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২০২৯ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (ডব্লিউটিসি) ফাইনালের সময়ও উল্লেখ রয়েছে। ২০২৯ ডব্লিউটিসি ফাইনাল ৮ থেকে ১২ জুন ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হবে।

লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগে ৬টি করে দল অংশগ্রহণ করবে। অলিম্পিক বাছাইপর্বের ভেন্যু এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে জানা গেছে, প্রতিটি বিভাগে ৮টি করে দল খেলবে। সরাসরি জায়গা করে নেওয়া দল ছাড়া, র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষে থাকা সাতটি দল এবং ক্যারিবীয় আঞ্চলিক বাছাইয়ের চ্যাম্পিয়ন দলকে নিয়ে বাছাইপর্ব গঠন করা হবে।

১৯০৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের পর এই প্রথমবার ক্রিকেট অলিম্পিকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগেই সরাসরি খেলার সুযোগ পেতে পারে, তবে এজন্য আইসিসির শর্ত পূরণ করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে টি-টোয়েন্টি র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১৫ এর মধ্যে থাকতে হবে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ১৩ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৪
জোহর ১১:৪৪
আসর ০৩:৪৮
মাগরিব ০৫:২৫
ইশা ০৬:৩৭
সূর্যোদয় : ০৬:০০ সূর্যাস্ত : ০৫:২৫
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%