০৭:০৩ পি.এম
সহজে পরিবহনযোগ্য এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য, লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁত হওয়া এবং তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম খরচ; এইভাবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাগণ ইরানের তৈরি নতুন মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র 'খাইবার শেকান'কে বর্ণনা করেছেন। সাধারণত, নির্দিষ্ট গতিপথের কারণে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করা সহজ হলেও সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে একাধিক খাইবার শেকান সফলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। এই ঘটনা প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করতে তেহরান তাদের সামরিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। আঘাত হানার শেষ মুহূর্তে গতিপথ পরিবর্তন, গতির নিয়ন্ত্রণ এবং মাঝ আকাশে কৌশলগত চাল খাটাতে সক্ষম এই খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা প্রাচীর ভেঙে দিতে পারদর্শী হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, কম খরচের ড্রোন এবং সাধারণ গতিপথের ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি জটিল আক্রমণ কৌশলের অংশ হিসেবে ইরান এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে।
এই ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথম উন্মোচন করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ২০২২ সালে। 'ফাতেহ' গোত্রের কঠিন জ্বালানি চালিত এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাম সপ্তম শতাব্দীর খায়বারের যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতীক হিসেবে রাখা হয়েছে। সাধারণ তরল জ্বালানি ব্যবহার করা পুরনো ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর জন্য দীর্ঘ প্রাক-উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হওয়া, যা শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট বা রাডারে সহজেই ধরা পড়ে। কিন্তু কঠিন জ্বালানি ব্যবহারের ফলে খাইবার শেকান দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুত রাখা যায় এবং ট্রাক বা অন্যান্য যান থেকে দ্রুত উৎক্ষেপণ করা সম্ভব, যা সহজেই অবস্থান পরিবর্তন করতে দেয়।
আরও পড়ুন: ক্যালিফোর্নিয়ায় দাবানল, ৬ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরানো হচ্ছে
সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মহাকাশের উচ্চসীমা ছুঁয়ে নির্দিষ্ট পথ ধরে নিচে নেমে আসার কারণে সেগুলোর গতিপথ পূর্বনির্ধারণ করে ঠেকানো সম্ভব। তবে খাইবার শেকানের মূল শক্তি হলো এর বিচ্ছিন্নযোগ্য ওয়ারহেড। প্রায় ৫০০ কেজি ওজনের বিস্ফোরকবাহী এই অংশটিতে একটি ছোট ইঞ্জিন যুক্ত রয়েছে, যা চূড়ান্ত মুহূর্তে গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম। এছাড়া, এই কৃত্রিম উপগ্রহ-পরিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রটি চীনের বেইদু নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম ব্যবহার করে, ফলে আঘাত হানার সঠিকতা বেড়ে গেছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাইবার শেকানের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর উৎপাদন খরচ। ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য খরচ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র প্যাট্রিয়ট, থাড কিংবা এসএম-৬ ইন্টারসেপ্টরের যথেষ্ট কম। উদাহরণ স্বরূপ, একটি এসএম-৬ বা প্যাট্রিয়টের পিএসি-৩ ইন্টারসেপটর ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খরচ প্রায় ৪ থেকে ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়ে থাকে। এর ফলে পেন্টাগন মারাত্মক অর্থনৈতিক ও মজুদ সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে একটি সস্তা ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে গিয়ে। সেন্ট্রাল অ্যান্ড আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র (সিএসআইএস)-এর হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রতি ব্যবহৃত হওয়া প্যাট্রিয়ট, থাড এবং এসএম সিরিজের ইন্টারসেপ্টরের মজুদ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাবেক জেনারেল জোসেফ ভোটেটের মতে, ইরান প্রতিটি সামরিক হামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে নিজেদের প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর করে তুলছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন