১০:২১ এম
খাদ্য ঘাটতির দেশে বাড়তি উৎপাদন কীভাবে সম্ভব হলো, সে বিষয়টি কি আমাদের জানা আছে? খাদ্যনিরাপত্তা এ দেশে চালের নিরাপত্তার সমার্থক। যে জাতির পাতে দিনে দুই থেকে তিনবার ভাত ওঠে, তাদের ভাতের হিসাব মেলানোর দায়িত্ব বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এর কাঁধে রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান ৫৭তম বর্ষে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর ‘পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করা এই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে সংসদীয় আইনের মাধ্যমে নতুন নাম পায়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভদিনে ব্রির কয়েকটি যুগান্তকারী সাফল্যের গল্প পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
গত সাড়ে পাঁচ দশকে ব্রির সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে চালের উৎপাদন চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। ব্রি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে মোট চালের উৎপাদন ছিল ৯ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন টনে। অর্থাৎ, চালের উৎপাদন গত সাড়ে ৫ দশকে বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। এই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিন গুণ, অথচ আবাদি জমি কমেছে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উন্নত জাত ও প্রযুক্তির হাত ধরে। ব্রির জাত চাষ করে কৃষকের ফলন ৪০ এবং আয় ৮৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
দেশি জাতের স্বল্প ফলনের সমস্যা থেকে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের বৈচিত্র্য কাঙ্ক্ষিত সমাধান এনে দিয়েছে। ব্রি এ পর্যন্ত ১২৭টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে ১১৭টি ইনব্রিড এবং ১০টি হাইব্রিড। ব্রি উদ্ভাবিত ২৩টি জাত ১৪টি দেশে চাষ হচ্ছে, যা দেশের গবেষণার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
আরও পড়ুন: বাগেরহাটে গলদা রেণুর সংকটে ৫৪ হাজার চিংড়িচাষির দিশাহারা অবস্থা
ব্রি উদ্ভাবিত কয়েকটি জাত দেশের কৃষির চেহারা বদলে দিয়েছে। বিআর৩, বিআর১১, বিআর৪৯, বিআর৮৭ এবং বিআর১০৩ আমন মৌসুমে; আর ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান১০২, ব্রি ধান১০৮ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৮ বোরো মৌসুমে দশকের পর দশক ধরে দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রেখেছে। উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা মোকাবিলায় আগাম পাকা ব্রি ধান৩৩ দরিদ্র কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন করলে এটি ১০০ দিনের মধ্যেই পাকে, যা মঙ্গা দূরীকরণে জাদুর কাঠি হিসেবে কাজ করেছে।
সাম্প্রতিক জাতগুলোয়ও বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। ব্রি ধান১১৪ ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী। ব্রি ধান১১৫ ভিটামিন-ই ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ। ব্রি ধান১১৬ গড়ে হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৬ টন ফলন দেয়। লবণসহিষ্ণু ব্রি ধান১১৭ উপকূলে হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৬ টন ফলন দিতে পারে এবং সম্পূর্ণ জীবনচক্রে ১০ ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করে। হাওরাঞ্চলের জন্য ঠান্ডাসহিষ্ণু ও আগাম জাত ব্রি ধান১১৮ উদ্ভাবিত হয়েছে। এ বছর আগাম বন্যায় প্রায় ১৪-১৫ লাখ টন বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই জাতের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। হাইব্রিডের মধ্যে ব্রি হাইব্রিড ধান৮ হেক্টরপ্রতি ১০ দশমিক ৫ থেকে ১১ টন এবং লবণসহিষ্ণু ব্রি হাইব্রিড ধান১০ অনুকূল পরিবেশে ৯ দশমিক ৭ থেকে ১০ দশমিক ৭ টন ফলন দিতে সক্ষম।
ব্রি বর্তমানে ধানের জাত উদ্ভাবনে প্রজনন কর্মসূচিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ৩২টি টার্গেট প্রোডাক্ট প্রোফাইল তৈরি হয়েছে এবং প্রজনন চক্র সাড়ে ৩ থেকে চার বছর কমানো হয়েছে। প্রায় চার হাজার জেনোটাইপের পূর্ণ জিনোম ফিঙ্গারপ্রিন্টিং সম্পন্ন হয়েছে। চার লাখেরও বেশি ফিক্সড লাইন উদ্ভাবিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ জাতের ভান্ডার হিসেবে কাজ করবে।
ব্রির দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগযন্ত্রে ৩০-৩৫ শতাংশ সার সাশ্রয় হয়, ফলন ৫-১২ শতাংশ বাড়ে এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে। সেচে সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় এডব্লিউডি ব্যবস্থা কৃষকের খরচ সাশ্রয় করছে।
আরও পড়ুন: শাজাহানপুরে হাইব্রিড মরিচ চাষে লাখপতি হলেন কৃষক রানা মিয়া
কৃষিযান্ত্রিকীকরণে ব্রি এ পর্যন্ত ৫৪টি যন্ত্র উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বীজ বপন, রোপণ, আগাছা দমন ও মাড়াইযন্ত্র এবং কম্বাইন হারভেস্টার। বীজ বপনের পাওয়ার সিড সোয়ারের দাম প্রায় ৮০ হাজার টাকা এবং এটি দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে দেশীয় কারখানায় তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষিযান্ত্রিকীকরণে আমদানিনির্ভরতা কমেছে। যন্ত্র উৎপাদনে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যুক্ত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
ডিজিটাল সেবায়ও ব্রি অনেকদূর এগিয়েছে। মাঠের পোকামাকড় ও রোগ পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। রয়েছে ধানের জাতের স্মার্ট প্রোফাইলিং অ্যাপ ও বাংলাদেশ রাইস নলেজ ব্যাংক।
ভালো জাত মাঠে পৌঁছাতে চাই মানসম্পন্ন বীজ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রি ১৩০টি জাতের নিউক্লিয়াস বীজ সংরক্ষণ করেছে এবং ২৩২ টন ব্রিডার বীজ উৎপাদন করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৫টি সিডনেট অংশীদারকে প্রায় ২০০ টন বীজ প্রতিবছরই বিতরণ করা হচ্ছে। ধানবিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তি ও জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে গত পাঁচ বছরে ব্রি মোট ৫১ হাজার ৪২০ জন অংশীজনকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যার মধ্যে কৃষক ৪২ হাজার ২০৪ জন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রি মোট ২৯টি পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছে। ব্রির অবদান অর্থনৈতিক বিচারেও লাভজনক। ধান গবেষণায় বিনিয়োগের প্রতিদান নিয়ে পাঁচটি গবেষণা হয়েছে। সেগুলোর হিসাবে, প্রতি এক টাকা বিনিয়োগে ফেরত এসেছে ২৬ থেকে ৫৪ টাকা।
দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে বছরে ১ দশমিক ১ ২ শতাংশ হারে, আবাদি জমি কমছে শূন্য দশমিক ২ ৪ শতাংশ হারে, আর তাপমাত্রা বাড়ছে প্রতি দশকে প্রায় শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ব্রির ভাষায়, খাদ্যনিরাপত্তা কোনো স্থায়ী অর্জন নয়; একে টেকসই করতে নিরন্তর প্রচেষ্টা দরকার।
আরও পড়ুন: এক কেজি গরুর মাংসের জন্য ৩ হাজার লাউ বিক্রি করতে হচ্ছে
ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা সুসংহত করার জন্য ব্রি কয়েকটি কৌশল হাতে নিয়েছে। কৃষকের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ টন ধরে দেশের চাহিদা মেটাতে অন্তত ৬ দশমিক ২৯ মিলিয়ন হেক্টর নিট আবাদি জমি রক্ষার কৌশল নিয়ে কাজ করছে ব্রি। গবেষণার অগ্রাধিকারে রয়েছে স্পিড ব্রিডিং, জিনোমিক প্রেডিকশন ও হ্যাপলোটাইপভিত্তিক প্রজননের মতো আধুনিক কৌশল। এ ছাড়া রয়েছে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর জাত, জলবায়ুসহিষ্ণুতা, যান্ত্রিকীকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্প্রসারণ। চলমান গবেষণায় সি৪ রাইস, জিনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে লবণাক্ততা-সহিষ্ণুতা ও ব্লাস্ট প্রতিরোধ এবং টু-লাইন হাইব্রিড প্রজনন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। উচ্চ আয়ের জন্য মূল্য সংযোজিত ধানজাত পণ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাইস ভ্যালু চেইন গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দিনে দিনে প্রতিষ্ঠানটির পরিধিও বাড়ছে। বর্তমানে ১৯টি গবেষণা বিভাগ এবং সদর দপ্তরের বাইরে ১১টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এছাড়া দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে আরো ছয়টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ছয়টি স্যাটেলাইট স্টেশন স্থাপনের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এতে স্থানভিত্তিক ধানের জাত উদ্ভাবন ও কৃষকের সমস্যার সমাধান আরো সহজ হবে।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর মধ্যে অপর্যাপ্ত জনবল, পদোন্নতি ও চাকরির মেয়াদ-সংক্রান্ত জটিলতা এবং গবেষণা বরাদ্দের অপ্রতুলতা উল্লেখযোগ্য। ব্রির অনুমোদিত ৩১৮টি বিজ্ঞানী পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৭১ জন। যে প্রতিষ্ঠানে প্রতি টাকা বিনিয়োগে বহুগুণ প্রতিদান পাওয়া যায়, সেখানে গবেষণা ও জনবলে বিনিয়োগ বাড়ানোই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
লেখক : কৃষিবিদ ও কৃষি সাংবাদিক
আরও পড়ুন: পিরোজপুরের কৃষকরা ভাসমান কৃষির মাধ্যমে বদলে দিচ্ছেন দৃশ্যপট
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন