১০:৩০ এম
আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইসরাইলি নীতিতে যে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে, তা সম্ভবত বাস্তবায়িত হবে না। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পুনরায় জয়ী হলে ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি দলের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট বা বিরোধী দলের অন্যান্য নেতারা ক্ষমতায় এলে ইসরাইলের কথাবার্তা ও মনোভাব কিছুটা নমনীয় হতে পারে। কূটনৈতিক আলোচনার পথও কিছুটা সহজ হতে পারে। তবে ইরান, লেবানন এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের প্রধান রাজনৈতিক দলের চিন্তাভাবনা অনেকটাই এক। তাই এই নির্বাচন তেল আবিবের সামগ্রিক আঞ্চলিক নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে বলে মনে হচ্ছে না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাসের হামলার পর তিন বছর কেটে গেছে। দেশটি এখনো যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে। একাধিক পশ্চিমা দেশের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। গাজা ও পশ্চিম তীরের ঘটনাবলির কারণে জর্ডান এবং মিসরের সঙ্গে উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। তবে এই নির্বাচনে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের ভূমিকা কী হবে, সে সম্পর্কে দুই ভিন্নধারার বিকল্প ভোটারদের সামনে নেই। নেতানিয়াহুকে হারানোর সুযোগ বিরোধীদের সামনে রয়েছে, তবে বিরোধী শিবিরের প্রধান নেতাদের চিন্তা-ভাবনা প্রায় এক। সামরিক শক্তি প্রয়োগ, ইরান, হিজবুল্লাহ ও হামাসকে হুমকি মনে করা এবং ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করার বিষয়ে তাদের মধ্যে নেতানিয়াহুর সঙ্গে খুব একটা পার্থক্য নেই।
অতএব, কে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, সেই প্রশ্নটি মোটেও গুরুত্বহীন নয়। নেতানিয়াহু বর্তমানে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতমার বেন-গভিরের মতো উগ্র ডানপন্থি শরিকদের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এই শরিকদের প্রভাব তাদের ভোটের হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি। তাদের চাপের কারণে বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করা এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিষয়গুলো এখন সরকারের মূল নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেতানিয়াহু পুনরায় জয়ী হলে এ ধরনের উগ্রপন্থি শক্তির রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও বাড়বে।
আরও পড়ুন: দাম্মামে বিমানবন্দরে হামলা, আহত দুই বাংলাদেশি প্রবাসী
তবে নেতানিয়াহু পরিবর্তিত হলে যে ইসরাইলের পুরো কৌশল বদলে যাবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। যে কৌশলের কারণে ইসরাইল আজ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে রয়েছে, তা হয়তো নেতানিয়াহু না থাকলেও বহাল থাকবে। আইজেনকোট, বেনেট বা বিরোধী দলের অন্য কোনো নেতার নেতৃত্বাধীন সরকার হয়তো উগ্র ডানপন্থিদের ওপর অতটা নির্ভরশীল হবে না। তারা আমেরিকার চাপকে বেশি গুরুত্ব দেবে এবং বক্তব্যে কিছুটা সতর্ক থাকবে। নেতানিয়াহু-পরবর্তী সরকার হয়তো ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হবে। গাজার পুনর্গঠনে তারা হয়তো আরও বেশি সহযোগিতার হাত বাড়াবে এবং জর্ডান ও মিসরকে কিছুটা কূটনৈতিক স্বস্তি দেবে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হিজবুল্লাহর হুমকি, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের মতো বড় বিষয়গুলোতে তাদের অবস্থানের তেমন কোনো পরিবর্তন হবে না।
১৯৯৩ থেকে ২০০০ সালের ‘ওসলো চুক্তি’র সময় থেকে ইসরাইলের মূলধারার রাজনীতি ডান দিকে সরে গেছে। নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বীরা ক্ষমতায় এলেও ইসরাইলি নীতির ধরন ও কৌশলে সামান্য পরিবর্তন আসবে। মূল দিকনির্দেশনা একই থেকে যাবে। সুইডিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক অ্যারন লুন্ডের মতে, নেতানিয়াহুর উত্তরসূরিরাও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় একই হাতিয়ার ব্যবহার করে আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলা করবেন। ইসরাইল তখনো দখল করা ভূখণ্ড ধরে রাখার চেষ্টা করবে, শত্রুদের দুর্বল করতে চাইবে এবং যেকোনো ধরনের ছাড়ের বিনিময়ে চড়া মূল্য দাবি করবে। লুন্ড ইউনিভার্সিটির ড. রুজবে পার্সিও এ বিষয়ে একমত। তার মতে, আইজেনকোট, বেনেট বা লাপিদের মতো প্রার্থীরা শুধুমাত্র সামরিক কৌশলের খুঁটিনাটি নিয়ে বিতর্ক করেন। যুদ্ধের মূল কৌশল বা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাদের মনে কোনো প্রশ্ন নেই। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সরকারগুলোও ভালো করেই বোঝে যে প্রধান প্রধান ইস্যুতে সব প্রার্থী একই পথ অনুসরণ করবেন।
গাজা ও পশ্চিমতীর
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, স্মোতরিচ ও বেন-গভিরের প্রভাবমুক্ত নেতানিয়াহু-পরবর্তী কোনো সরকারের কাজের পার্থক্য গাজায় দেখা যেতে পারে। এমন একটি সরকার গাজা পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় আরও বেশি সহযোগিতা করতে রাজি হতে পারে। বর্তমান অচলাবস্থা টিকিয়ে রাখার চেয়ে তারা হয়তো ফিলিস্তিনিদের কোনো একটি প্রশাসনের হাতে শাসনভার ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি মেনে নেবে। ওয়াশিংটন, কায়রো বা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে আগ্রহী অন্যান্য দেশের চাপের প্রতিও হয়তো সেই সরকার সাড়া দেবে। তবে এই পরিবর্তনের একটি সীমা থাকবে। হামাসের অস্ত্র সংবরণ, ইসরাইলের নিজস্ব নিরাপত্তার দাবি এবং গাজার শাসনব্যবস্থার মতো জটিল প্রশ্নের সমাধান করা মোটেও সহজ নয়। ৭ অক্টোবরের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা ইসরাইলের মূলধারার রাজনীতিকদের নেই। নতুন সরকার হয়তো উত্তেজনা কিছুটা কমাতে পারে, তবে তারা সামরিক নিয়ন্ত্রণ শেষ করবে না বা মূল সংঘাতের অবসান ঘটাবে না।
আরও পড়ুন: সৌদীর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে হামলা হুথিদের
পশ্চিমতীরের ক্ষেত্রে পরীক্ষাটি আরও কঠিন। নেতানিয়াহুর আমলে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ, বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার প্রক্রিয়া দ্রুত হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। মূল দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, পরোক্ষভাবে ফিলিস্তিনিদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলে তাদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করা। কম ডানপন্থি একটি সরকার হয়তো এসব নীতি বাস্তবায়নের গতি কিছুটা কমিয়ে দেবে এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে খানিকটা নিয়ন্ত্রণে রাখবে। কিন্তু তারা দখলদারিত্বের অবসান ঘটাবে না। এমনকি বিরোধী কোনো নেতাকেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সমর্থনে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে না।
জর্ডানের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ
পশ্চিমতীরের এই ক্রমাবনতি জর্ডানকে চরম উদ্বেগে ফেলেছে। জর্ডান নদীর ওপার থেকে ফিলিস্তিনিরা দলে দলে বিতাড়িত হলে তা জর্ডানের রাজতন্ত্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। কিংস কলেজ লন্ডনের ড. রব গেইস্ট পিনফোল্ড যেমনটি মনে করিয়ে দিয়েছেন, উগ্রপন্থি নীতি ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করার ঘটনা জর্ডানকে আতঙ্কিত করে তুলছে। তাদের ভয়, ইসরাইল হয়তো পুরো পশ্চিমতীর দখল করে নেবে এবং ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেবে। এর ফলে যে নতুন শরণার্থী সংকট তৈরি হবে, জর্ডানের বর্তমান দুর্বল অর্থনীতির পক্ষে তা বহন করা সম্ভব নয়। আম্মান এখন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে ভাবছে, পরবর্তী ইসরাইলি সরকার পশ্চিমতীরকে ধ্বংসের শেষ সীমা থেকে রক্ষা করতে পারবে কি না।
মিসরের মূল অবস্থান
আরও পড়ুন: জার্মানিতে ফ্রান্সের আদলে শিক্ষার্থীদের বড় গণবিক্ষোভের প্রস্তুতি
গাজায় যুদ্ধের কারণে সীমান্তে যেন নতুন করে শরণার্থী সংকট তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে চায় মিসর। ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে তাড়িয়ে মিসরের সিনাই উপদ্বীপে ঠেলে দেওয়ার কোনো পদক্ষেপকে কায়রো একেবারেই বরদাশত করবে না। এটি তাদের চূড়ান্ত সীমারেখা। পাশাপাশি মিসরীয় কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারী ও পুনর্গঠনকারী হিসেবে নিজেদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ধরে রাখতে চান। তুলনামূলক কম উগ্র ইসরাইলি সরকার কায়রোকে কাজ করার বাড়তি সুযোগ করে দিতে পারে। কিন্তু গাজার নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সংঘাত মিসরের সীমানায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
ইরান ও হিজবুল্লাহ
ইরানের মোকাবিলা করা এবং হিজবুল্লাহকে দুর্বল করে ফেলা—এ দুই বিষয়ে ইসরাইলের ভেতরে দলমত-নির্বিশেষে সবাই একমত। নেতানিয়াহু-পরবর্তী সরকার হয়তো ওয়াশিংটনের কথা একটু বেশি শুনবে অথবা রণকৌশলে কিছুটা সংযম দেখাবে। কিন্তু ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার মূল লক্ষ্য থেকে তারা সরে আসবে না। ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তেহরান নেতানিয়াহুর পরাজয়কে স্বাগত জানালেও গোপনে হামলা চালানো বা মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে ইসরাইলের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের আশা করে না।
ওয়াশিংটন অনুঘটক
আরও পড়ুন: আইআরজিসির ৭ জাহাজে হামলা, মার্কিন ঘাঁটিতে ধ্বংসের হুমকি
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের ওপর। উগ্র ডানপন্থিদের ছাড়া একটি সরকার গঠন করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাদের সঙ্গে কাজ করা অনেক সহজ হবে। তারা আমেরিকার কূটনৈতিক প্রস্তাবেও বেশি সাড়া দেবে। পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের যে ক্ষতি হয়েছে, তা হয়তো কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে ইসরাইল সম্পর্কে মার্কিন জনগণের মনোভাবে একধরনের স্থায়ী পরিবর্তন এসে গেছে। তেল আবিবে শুধু সরকার বদলালেই সেই পরিবর্তন রাতারাতি উল্টে দেওয়া সহজ হবে না।
২৭ অক্টোবরের পর কী বদলাবে
নির্বাচনের পর ইসরাইল হয়তো এমন একটি সরকার পাবে, যাদের কথাবার্তা অতটা উগ্র হবে না। তারা ওয়াশিংটন ও প্রতিবেশী দেশগুলোর কথা কিছুটা মন দিয়ে শুনবে। তবে এই পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যদি তারা পশ্চিমতীরে বসতি সম্প্রসারণ, গাজার পুনর্গঠন এবং ইরান নীতিতে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আনে। নেতানিয়াহুর পরাজয় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভ্যন্তরীণ সংঘাতগুলোর সমাধান করবে না কিংবা ইসরাইলের আন্তর্জাতিক একাকিত্ব দূর করবে না। ইসরাইলের প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের কাছে নির্বাচনে কে জিতল, তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ২৭ অক্টোবরের পর বাস্তবে কী ঘটতে যাচ্ছে।
দ্য নিউ অ্যারাব অবলম্বনে জুলফিকার হায়দার
আরও পড়ুন: ইইউ’র শীর্ষ মানবাধিকার পুরস্কার জিতল আইসিসি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন