০৮:২৬ পি.এম
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। দিনটি হয়তো একদিন ইতিহাসের পাতায় শুধু একটি যুদ্ধের সূচনাদিবস হিসেবে নয়, বরং বিশ্বব্যবস্থার এক দীর্ঘ অধ্যায়ের বাঁকবদলের দিন হিসেবেও লেখা হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত সামরিক আগ্রাসন যে লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল, যুদ্ধের বাস্তবতা এখন সেই হিসাবের সঙ্গে ক্রমেই বেমানান হয়ে উঠছে। ওয়াশিংটন ভেবেছিল তার বিপুল সামরিক শক্তি, আকাশ আধিপত্য, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ ইরানকে দ্রুত নতজানু করবে। কিন্তু ছয় মাসেরও বেশি সময় পর প্রশ্নটি এখন উল্টো দিকে ঘুরেছে—ইরানকে কতটা দুর্বল করা গেল, সেটি নয়; বরং এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিজের বিশ্ব নেতৃত্বের কতটা ক্ষয় ঘটাল?
এটাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
কারণ যুদ্ধ শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা কিংবা সামরিক ঘাঁটি দখলের হিসাব নয়। যুদ্ধ আসলে ক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা। আর একটি পরাশক্তির সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার পারমাণবিক বোমা নয়—বিশ্বকে এই বিশ্বাস করিয়ে রাখা যে সে যা বলে, শেষ পর্যন্ত তা করাতে পারে। ইরান সেই বিশ্বাসের জায়গাতেই আঘাত করেছে।
ইরান কি আমেরিকার ‘অপরাজেয়তার’ মিথ ভেঙে দিল? ইরান সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করেছে—এমন সরল দাবি করার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু ইরান যে আমেরিকাকে একটি দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত সংঘাতে আটকে দিয়েছে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত যুদ্ধলক্ষ্যের সবগুলোও এখনো অর্জিত হয়নি। বিপরীতে, তেহরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গায় চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে। হরমুজ তাই নিছক একটি জলপথ নয়। এটি বৈশ্বিক শক্তির শিরা।
বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই সরু জলপথ দিয়ে চলাচল করে। সেখানে ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা বাধা সৃষ্টি মানে শুধু আমেরিকার নৌবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ নয়—বিশ্ববাজার, জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা। যুদ্ধের পর হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে; বিশ্ব অর্থনীতিও তার অভিঘাত অনুভব করছে।
এখানেই ইরানের কৌশলগত সাফল্য।
আমেরিকার হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি সংকটকে সামরিক শক্তি দিয়ে নিজের অনুকূলে পরিণত করা যায় না। পরাশক্তির আসল পরাজয় কোথায়? আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নয়। বিপদটি আরও গভীরে—মিত্রদের আস্থার সংকটে।
যে দেশগুলো কয়েক দশক ধরে আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার নিচে ছিল, তারাই এখন নতুন করে হিসাব করতে শুরু করেছে—সংকটের মুহূর্তে Washington-এর ওপর কতটা নির্ভর করা যায়?
মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা-সমীকরণ ইতোমধ্যেই নড়বড়ে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন নিরাপত্তা সহযোগিতার উদ্যোগ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকান নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে সংশয় সেই পরিবর্তনের লক্ষণ। এটাই আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকেত।
কারণ সাম্রাজ্য শুধু অস্ত্র দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে অন্যদের সম্মতিতে। অন্য রাষ্ট্র যখন মনে করতে শুরু করে—‘আমেরিকা শক্তিশালী, কিন্তু আমেরিকার ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়’—তখন আধিপত্যের ভিতরে প্রথম ফাটল দেখা দেয়।
ইরান সেই ফাটলটি আরও প্রশস্ত করেছে।
২০২৯-৩০: আমেরিকাকে কি আর কেউ নেতা মানবে? আজই ঘোষণা করে দেওয়া যায় না যে ২০২৯ বা ২০৩০ সালে পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র আর আমেরিকার কথা শুনবে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এত সরল নয়। আমেরিকার অর্থনীতি, ডলার, প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি, বৈশ্বিক জোট এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে তার ক্ষমতা এখনো বিপুল। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
২০২৯-৩০ সালের পৃথিবীতে আমেরিকা কি আজকের মতো নিরঙ্কুশভাবে ‘নেতা’ হিসেবে বিবেচিত হবে? সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে।ইরান যুদ্ধ সেই সন্দেহকে ত্বরান্বিত করছে। একসময় ওয়াশিংটনের একটি নিষেধাজ্ঞা ছিল অর্থনৈতিক ভূমিকম্প। একটি সামরিক হুমকি ছিল যুদ্ধের পূর্বাভাস। একটি কূটনৈতিক নির্দেশ ছিল বহু দেশের নীতিনির্ধারণের ভিত্তি।
কিন্তু এখন পৃথিবী ক্রমেই বহুকেন্দ্রিক হচ্ছে। চীন নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিসর বাড়াচ্ছে। রাশিয়া পশ্চিমা চাপকে মোকাবিলা করার নিজস্ব পথ তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো খুঁজছে। আর ইরান দেখিয়ে দিচ্ছে—একটি রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক চাপের মুখেও প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারে এবং যুদ্ধের খরচ উল্টো প্রতিপক্ষের ঘাড়েও চাপিয়ে দিতে পারে।এটাই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় লক্ষণ।
হরমুজের যুদ্ধ আসলে কার বিরুদ্ধে? হরমুজে সংঘাত তাই কেবল ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়। এটি একটি পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা বনাম একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সংঘর্ষের প্রতীক। পুরোনো ব্যবস্থার যুক্তি—যার হাতে সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী, সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান এবং সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক নিষেধাজ্ঞা, শেষ কথা তার।
নতুন বাস্তবতার যুক্তি—যুদ্ধক্ষেত্রকে যদি এমনভাবে বদলে দেওয়া যায় যেখানে পরাশক্তির প্রতিটি আঘাতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য তাকে নিজেকেও দিতে হয়, তাহলে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব আর রাজনৈতিক বিজয়ের নিশ্চয়তা নয়।
ইরান সেই দ্বিতীয় যুক্তিটিই সামনে এনেছে।
হরমুজকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া মানে আমেরিকার জন্য শুধু সামরিক ব্যয় নয়; মিত্রদের ওপর চাপ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং ক্রমবর্ধমান যুদ্ধক্লান্তি। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতেও দেখা যাচ্ছে, সংঘাতটি এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে ওয়াশিংটনের জন্য বেরিয়ে আসার পথও সহজ নয়, আবার অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াও সহজ নয়।তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এ কেমন পরাশক্তি, যে যুদ্ধ শুরু করতে পারে, কিন্তু নিজের শর্তে যুদ্ধ শেষ করাতে পারে না?
প্রশ্ন হলো, আমেরিকা কি হেরে গেছে?
না—এখনই তা চূড়ান্তভাবে বলা না গেলেও অনুমান করা যাচ্ছে। কিন্তু আমেরিকার ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তিতে যে গভীর আঘাত লেগেছে, সেটি অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।ইরান হয়তো ওয়াশিংটনের পতন ঘটায়নি। কিন্তু ওয়াশিংটনের ভয়কে ছোট করেছে। আর বিশ্ব রাজনীতিতে ভয় কমে যাওয়া মানেই আধিপত্যের ক্ষয় শুরু হওয়া।
একটি রাষ্ট্র যখন বুঝে যায় যে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করলে শুধু ধ্বংসই অনিবার্য নয়, তখন সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কল্পনাশক্তি বদলে যায়। অন্য রাষ্ট্রগুলোও তখন একই প্রশ্ন করতে শুরু করে—‘আমরা কেন পারব না?’এই প্রশ্নটিই মার্কিন আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।
হরমুজ সেই প্রশ্নটি বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ্য করে দিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির আগ্রাসন যদি আমেরিকার শক্তির প্রদর্শন হয়ে থাকে, তাহলে তার পরবর্তী মাসগুলো হয়ে উঠেছে সেই শক্তির সীমাবদ্ধতার প্রদর্শনী।
ইরান হয়তো আমেরিকাকে পরাজিত করেনি।
কিন্তু আমেরিকাকে থামিয়ে দিয়েছে—এমন একটি জায়গায়, যেখানে একসময় কেউ তাকে থামানোর সাহস কল্পনাও করত না।
আর ইতিহাসে আধিপত্যের পতন সাধারণত একদিনে ঘটে না। প্রথমে ভাঙে ভয়। তারপর ভাঙে বিশ্বাস।তারপর ভাঙে আনুগত্য। আর শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে আধিপত্য।
হরমুজের উত্তাল জলরাশিতে আজ তাই শুধু তেলের ট্যাংকার ভাসছে না—ভাসছে মার্কিন বিশ্ব আধিপত্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও এক কঠিন প্রশ্ন:
আমেরিকা কি এখনো বিশ্বের নেতা, নাকি বিশ্ব ইতিমধ্যেই তার পরবর্তী নেতার সন্ধান শুরু করে দিয়েছে?
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন