০৩:১২ পি.এম
একটু বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই। হুইলচেয়ারে বসে বাড়ির আঙিনা পেরিয়ে খোলা বাতাসে যাওয়ার সুযোগটুকুও মেলে না। কারণ, নিজেদের দাঁড়াতে পারেন না, আবার বাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো চলাচলের উপযোগী রাস্তাও নেই। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রায় সব কাজেই অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। এভাবেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, দারিদ্র্য আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিন কাটছে মানিকগঞ্জের একই পরিবারের চার ভাই-বোনের। তাদের মধ্যে দুই বোন সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। বৃদ্ধা মায়ের চোখে এখন একটাই প্রত্যাশা— সন্তানদের একটু স্বস্তির জীবন এবং বাড়িতে যাতায়াতের একটি রাস্তা।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দীঘি ইউনিয়নের ভাটবাউর গ্রামের এই পরিবারে আট ভাই-বোনের মধ্যে চারজনই খর্বাকৃতির। তাঁরা হলেন মোছা. হাবিয়া (৬৪), মোছা. মেহেরজান (৫৮), ইজ্জত আলী (৫২) ও সিরাজ আলী (৪৮)। তাঁদের মধ্যে হাবিয়া ও মেহেরজান নিজেরা দাঁড়াতে কিংবা চলাফেরা করতে পারেন না। খাওয়া-দাওয়া, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনেও পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা নিতে হয় তাদের।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, চার ভাই-বোন জন্মগতভাবে এমন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার ছিলেন না। সাত-আট বছর বয়সের দিকে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁদের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। বৃদ্ধা মা জহুরা বেগম জানান, প্রথম সন্তান হাবিয়ার বয়স যখন সাত বছর, তখন তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বর সেরে যাওয়ার কয়েক দিন পর তাঁর হাঁটাচলায় অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। পরে কবিরাজের মাধ্যমে চিকিৎসা করিয়েও কোনো উন্নতি হয়নি। একইভাবে অন্য তিন সন্তানেরও সাত-আট বছর বয়সের দিকে শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয়।
আরও পড়ুন: সিলেট সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৩৫ লাখ টাকার চোরাচালানি পণ্য ও অস্ত্র জব্দ
সন্তানদের এমন অবস্থার কারণে দীর্ঘদিন সামাজিক অবহেলা ও কটূক্তি সহ্য করতে হয়েছে জহুরা বেগমকে। সংসার চালানোর পাশাপাশি প্রতিবন্ধী সন্তানদের দেখাশোনা করতে গিয়ে জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে তাঁর সংগ্রামে। কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, "বাড়ির বাইরে বের হইলে মানুষ কত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছে! অনেক পরিশ্রম কইর্যা এই সংসার চালাইছি। এখনো কত কষ্ট করতে হয়, আল্লাহই জানেন।"
মেহেরজান বলেন, "আমাগো কষ্টের জীবনের খোঁজ কেউ নেয় না। প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিজেদের পরিবারের বোঝা মনে হয়। হুইলচেয়ারে কইরা বাইরে নেবে, সেই রাস্তাটাও তো নাই। আমাগো কষ্টের শেষ নাই।"
পরিবারের সদস্যরা জানান, তাদের বাবা হযরত আলী একটি সংস্থায় চাকরি করতেন। প্রায় ১০ বছর আগে তিনি মারা যান। আট সন্তানের মধ্যে শুধু ইজ্জত আলীর বিয়ে হয়েছে। তাঁর দুই ছেলে রয়েছে। অন্য তিন প্রতিবন্ধী ভাই-বোন অবিবাহিত। তাঁরা একই বাড়িতে বসবাস করেন। বর্তমানে বৃদ্ধা জহুরা বেগম প্রতিবন্ধী সন্তানদের নিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাবিয়া ও মেহেরজানকে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় খাওয়ানিসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজ করতে হয়। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতেও তাঁদের অন্যের সাহায্য নিতে হয়। অন্যদিকে খর্বাকৃতির হলেও ইজ্জত আলী ও সিরাজ আলী কিছুটা চলাফেরা করতে পারেন। তাঁরা বাড়ির পাশে ভাটবাউর বাজারে সড়কের ধারে ছোট দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেন। তবে দোকান থেকে আয় খুবই সামান্য।
আরও পড়ুন: টিএমজিবির সভাপতি হলেন মাসুদ রুমী, সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিত
পরিবারের চার সদস্য প্রায় দুই বছর ধরে সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। নিজেদের জমির ফসল ও দোকানের সামান্য আয় দিয়ে কোনো রকমে চলে তাঁদের সংসার। ইজ্জত আলীর দুই ছেলে ইয়াসির আরাফাত (২২) ও আলিফ আহম্মেদ (২০) ভোকেশনাল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন। তাঁরা শারীরিকভাবে সুস্থ। বড় ছেলে আরাফাত সম্প্রতি আকিজ কোম্পানির একটি প্রতিষ্ঠানে বিড়ি-সিগারেট সরবরাহের কাজ নিয়েছেন। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে ছেলেদের একটি ভালো চাকরির প্রত্যাশা করছেন ইজ্জত আলী।
ইয়াসির আরাফাত বলেন, "সরকার যদি একটা ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারতাম।"
তবে পরিবারটির সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা না থাকা। ভাটবাউর বাজারের পাকা সড়ক থেকে কয়েকটি বাড়ির ওপর দিয়ে তাঁদের বাড়িতে যেতে হয়। ফলে অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে হাবিয়া ও মেহেরজানকে হাসপাতালে নিতে পরিবারের সদস্যদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দুই বছর আগে রাস্তা নির্মাণের জন্য কিছু মাটি ফেলা হলেও অর্থের অভাবে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে রাস্তাটি নির্মাণ করা গেলে দুই বোনকে হুইলচেয়ারে করে বাড়ির বাইরে নেওয়া সহজ হবে। পাশাপাশি উপকৃত হবে আশপাশের আরও কয়েকটি পরিবার।
আরও পড়ুন: পল্লী বিদ্যুতের মিটার চুরির ঘটনায় টাকা দাবি, প্রতিকার পাচ্ছে না গ্রাহক
স্থানীয় বাসিন্দা জবেত আলী বলেন, পরিবারটির চার সদস্য শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার উপযোগী রাস্তা না থাকায় তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। শুধু এই পরিবার নয়, আশপাশের আরও অন্তত ১০টি পরিবার চলাচলের রাস্তার অভাবে ভোগান্তিতে রয়েছে। অন্যের বাড়ির ওপর দিয়ে তাঁদের যাতায়াত করতে হয়।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন বলেন, পরিবারটির বিষয়ে সরেজমিনে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ওই পরিবারসহ আশপাশের অন্য পরিবারগুলোর চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তা নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুই বোনের কাছে একটি রাস্তা শুধু যাতায়াতের পথ নয়, এটি ঘরের বাইরে যাওয়ার, প্রয়োজনের সময় হাসপাতালে পৌঁছানোর এবং একটু স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ। দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় পরিবারটি।
আরও পড়ুন: গৃহবধূর আপত্তিকর ভিডিওধারণ করে ব্ল্যাকমেইল, ধর্মীয় শিক্ষক নূর আলম শেখ গ্রেপ্তার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন