বৃহস্পতিবার, ২২শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং
০৫:২৯ পি.এম
চট্টগ্রাম, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ : কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১ জেলায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৫৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
আজ চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ কার্যালয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে নিয়মিত মামলায় ৬৪ জন, পূর্ববর্তী মামলায় ৪৪ জন, পুলিশ অ্যাক্ট ৩৪ ধারায় ১৬ জন, ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৪ ধারায় ২৩ জন, কার্যবিধির ১৫১ ধারা ও অন্যান্য আইনে সাত জন, পরোয়ানা মূলে ৯২ জন, সাজা পরোয়ানা মূলে ৯ জন রয়েছেন।
এছাড়া, মাদক মামলায় ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন মাদক বহনকারী এবং ২৯ জন মাদকসেবী। নিয়মিত ও অন্যান্য মামলায় ২৪ মাদক ব্যবসায়ীসহ অভিযানে মোট ৫৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মাদক বিরোধী অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ২০ জনকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৪৫০ টাকা অর্থদণ্ড আদায় করা হয়েছে। এ সময় ১৭টি মাদক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অভিযানে ৬ হাজার ৬৯ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৫১০ লিটার চোলাইমদ, ১০ কেজি ১৯০ গ্রাম গাঁজা, ১০ বোতল বিদেশী মদ ও ২৮ বোতল স্কাফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সাত জন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। জেলাভিত্তিক গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে চট্টগ্রামে ৪ জন, কুমিল্লায় এক জন এবং নোয়াখালীতে দুই জন রয়েছেন।
অন্যদিকে, কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে ৬৯ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৬ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং ২৩ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জেলা ভিত্তিক আটককৃত কিশোর গ্যাং সদস্যের সংখ্যা: চট্টগ্রাম ২৩, কক্সবাজার ১২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছয়, নোয়াখালী আট জন, লক্ষ্মীপুর ছয় জন, রাঙ্গামাটি দুই জন, খাগড়াছড়ি ১২ জন।
জনস্বার্থে পরিচালিত এ বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) প্রকাশিত ‘আইনের শাসন সূচক ২০২৬’-এ ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম। উন্নতির পরেও দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্কোর বৈশ্বিক গড়ের নিচে অবস্থান করছে।
সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ০.৩৯, যেখানে বৈশ্বিক গড় ০.৫৫। তবে এ বছর আইনের শাসন সূচকে বিশ্বের ১৫তম শীর্ষ অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ চিহ্নিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অগ্রগতির দিক থেকে দেশটি শীর্ষে রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ অঞ্চলে শীর্ষে রয়েছে নেপাল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা ও ভারত রয়েছে। বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে শুধুমাত্র পাকিস্তান ও আফগানিস্তান।
আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশও সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ঘানা ৬২তম, কেনিয়া ১০০তম, লাইবেরিয়া ১০৩তম, সিয়েরা লিওন ১১০তম, নাইজেরিয়া ১২০তম এবং জিম্বাবুয়ে ১২২তম স্থানে রয়েছে।
বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ইউরোপের দেশগুলো রয়েছে। সূচকের শীর্ষ পাঁচে রয়েছে যথাক্রমে ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও লুক্সেমবার্গ।
মৌলিক অধিকার ও দেওয়ানি বিচারে পিছিয়ে বাংলাদেশ।
সূচকে আটটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে দেশগুলোর আইনের শাসন মূল্যায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো—সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, বিধি-বিধানের প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার।
আটটি মানদণ্ডের মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের উন্নতি ঘটেছে। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং বিধি-বিধানের প্রয়োগ। বাকি পাঁচটি মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি ঘটেছে।
মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল। এ খাতে ০.৩১ স্কোর নিয়ে ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে ১৩৩তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। দেওয়ানি বিচারেও দেশের অবস্থান দুর্বল। ০.৩১ স্কোর নিয়ে এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩২তম। এই মানদণ্ডে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষার চিত্র মূল্যায়ন করা হয়।
মুক্ত সরকার ও নিরাপত্তায় তুলনামূলক ভালো অবস্থান রয়েছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো অবস্থান মুক্ত সরকার মানদণ্ডে। এ খাতে ০.৪২ স্কোর নিয়ে ১২৮তম স্থানে রয়েছে দেশটি। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা মানদণ্ডে ০.৫৬ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৪তম। এই মানদণ্ডে ব্যক্তি ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সমাজের কার্যকারিতা পরিমাপ করা হয়।
বিধি-বিধানের প্রয়োগ বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা মানদণ্ডে ০.৫৬ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৪তম। ফৌজদারি বিচারে ০.৩৪ স্কোর নিয়ে ১১৯তম স্থানে রয়েছে দেশটি।
ঘুষ, অনুচিত প্রভাব ও সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের মাত্রা পরিমাপ করা ‘দুর্নীতির অনুপস্থিতি’ মানদণ্ডে বাংলাদেশের স্কোর ০.৩৪, অবস্থান ১১৯তম। অন্যদিকে আইনি জবাবদিহিতা পরিমাপক ‘সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা’ মানদণ্ডে ০.৩৮ স্কোর নিয়ে ৯৪তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
সূচকের সামগ্রিক চিত্রে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি দেখা গেলেও মৌলিক অধিকার ও দেওয়ানি বিচারসহ পাঁচটি মানদণ্ডে অবনতি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেশটির দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাছুম মন্তব্য করেছেন, ‘মানুষ ধোঁকা খেতে খেতে, শোষণ-বঞ্চনা আর নির্যাতনের শিকার হতে হতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তাই সব দল থেকে মুখ ফিরিয়ে জামায়াত এখন মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে। মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণে যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিতে হবে।’
তিনি এসব কথা বৃহস্পতিবার ফেনী জেলা জামায়াতের আয়োজনে দুই দিনব্যাপী রুকনদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার শেষ দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন।
ফেনী জেলা জামায়াতের আমির মুফতি আবদুল হান্নানের সভাপতিত্বে এবং জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক আবদুর রহিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের অপর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান।
কর্মশালায় কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের আমির পরিবেশবিজ্ঞানী নজরুল ইসলাম, ফেনী জেলার সাবেক আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য একেএম শামছুদ্দিন, নোয়াখালী জেলা জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ইসহাক খোন্দকার, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক পরিষদের কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি মাওলানা ফারুক আহমাদ, লন্ডনপ্রবাসী নেতা অধ্যাপক মফিজুর রহমান (ভার্চুয়াল) এবং জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক আবু ইউছুফ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য দেন।
এ সময় জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট জামাল উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও সাবেক জেলা আমির অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঞা দারসুল কোরআন পেশ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাওলানা এ টি এম মাছুম আরও বলেন, ‘ইব্রাহিম (আ.) যেভাবে সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নেতৃত্বের যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, সেভাবে আমরাও পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। এখন যদি নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব আমাদের ওপর অর্পিত হয়, আমরা যেন সেই পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে পারি। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারি।’
তিনি উল্লেখ করেন, এ জন্য মজবুত ঈমানের অধিকারী হতে হবে এবং নিয়তের মধ্যে ইখলাস থাকতে হবে। দ্বীনের কাজের ক্ষতি করে দুনিয়ার কাজে মশগুল থাকলে চলবে না। এটাই ইখলাসের বিষয়। একজন মুমিন তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যাবেন। মুমিন কখনো হতাশ হবেন না, নিরাশ হবেন না কিংবা ভেঙে পড়বেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একাত্তর প্রসঙ্গে মাওলানা এ টি এম মাছুম বলেন, ১৯৭১ সাল নিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়, সেগুলোর সবই মিথ্যা ও বানোয়াট।
এ ছাড়া কর্মশালায় প্রশ্নোত্তর পর্বে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে আবারও রাজপথে নামার জন্য প্রস্তুত থাকুন।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে সিলেটের সড়কে ২৮৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া আহত হয়েছেন ৬৩০ জন। এর মধ্যে মে মাসে সবচেয়ে বেশি ৫১ জন প্রাণ হারান।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
নিরাপদ সড়ক চাই সিলেট বিভাগীয় কমিটির মাসিক প্রতিবেদন অনুসারে, বছরের প্রথম ৯ মাসে ২৮৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। জানুয়ারিতে ২৫ দুর্ঘটনায় ২৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩২ দুর্ঘটনায় ৩২ জন, মার্চে ২৯ দুর্ঘটনায় ৩২ জন, এপ্রিলে ১৯ দুর্ঘটনায় ১৫ জন, মে মাসে ৪২ দুর্ঘটনায় ৫১ জন, জুনে ২৯ দুর্ঘটনায় ২৯ জন, জুলাইয়ে ২৮ দুর্ঘটনায় ৩১ জন, আগস্টে ৩৫ দুর্ঘটনায় ৪৭ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২৬টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনটি জানাচ্ছে, মাসভিত্তিক হিসাবে মে মাসে সবচেয়ে বেশি ৫১ প্রাণহানি ঘটেছে। আগস্ট মাসে ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। এই দুই মাসে মোট ৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা নয় মাসের মোট প্রাণহানির প্রায় ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, বছরের নির্দিষ্ট কিছু মাসে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এসব মাসে প্রাণহানির কারণ চিহ্নিত করতে দুর্ঘটনার ধরণ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অসতর্কতা, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং সড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি বিভিন্ন সময় সামনে আসে। মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট ব্যবহার এবং পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সচেতনতার পাশাপাশি আইন প্রয়োগ ও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
এতে আরো বলা হয়েছে, সিলেট বিভাগের মহাসড়কগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানবাহনের চাপ ও দ্রুতগতিতে চলাচলের মধ্যে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গতিসীমা কার্যকর করা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বর্ষাকালে কৃষিজমি দীর্ঘ সময় ধরে পানির নিচে থাকে। এই অবস্থায় জলজ উদ্ভিদ ঘন হয়ে ওঠে। সাধারণ কৃষিকাজ সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে, পিরোজপুরের কৃষকরা এই পরিস্থিতিতে নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন।
জলের ওপর কচুরিপানা জমিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি ‘ধাপ’ বা ভাসমান শয্যায় দেশি-বিদেশি নানা জাতের সবজি ও চারা ফলানো হচ্ছে। জেলার নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার শত শত একর জলমহালে এখন সবুজের সমারোহ দেখা যাচ্ছে।
ভাসমান এই চাষের মাধ্যমে প্রতি বছর জেলায় কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়, যেখানে পুরুষদের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের ভাগ্যের চাকাও ঘুরছে।
পানির ওপর সমৃদ্ধি
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী দোবরা, কলারদোয়ানিয়া, মালীখালী এবং নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গ্রামগুলো বর্তমানে ভাসমান কৃষির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এলাকার বিস্তীর্ণ জলাশয়ে চোখ মেললেই দেখা যায় সারি সারি ভাসমান কৃষিশয্যা।
কৃষিশয্যা প্রস্তুতের কৌশল
বর্ষার শুরুতে খাল বা বিলে জমে থাকা কচুরিপানা একত্রিত করে পচানো হয়। এরপর, কয়েক স্তরে জমাট বাঁধিয়ে প্রস্তুত করা হয় দুই থেকে তিন ফুট পুরু এবং ৫০ থেকে ১০০ ফুট দীর্ঘ ভাসমান শয্যা বা ধাপ। এসব ধাপে মূলত শসা, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, করলা, টমেটো, চালকুমড়া ও বেগুনের বীজ রোপণ করে চারা উৎপাদন করা হয়।
এছাড়া, ধাপে সরাসরি ফলানো হয় লালশাক, পালংশাক, ডাটাশাক ও পুঁইশাকও।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে ভাসমান কৃষিশয্যায় বিভিন্ন ধরনের সবজির প্রায় এক কোটি চারা উৎপাদিত হয়। এসব চারা বিক্রি করে আয় হয় প্রায় ১০ কোটি টাকা। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মৌসুমজুড়ে এখান থেকে চারা ও তাজা সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য জেলা তো বটেই, দেশের উত্তরাঞ্চল থেকেও কৃষকরা এখানে চারা কিনতে আসেন। বর্তমানে এ পেশায় সরাসরি জড়িত প্রায় ছয় হাজার কৃষক।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও জাতিসংঘের স্বীকৃতি
পিরোজপুরের স্থানীয় কৃষকদের এই ভাসমান চাষাবাদের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। শত বছরের এই মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি আজ আর কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলা করে পানির ওপর ফসল ফলানোর এই ভাসমান কৃষি পদ্ধতিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ২০১৫ সালে ‘গ্লোবাল ইম্পর্ট্যান্ট এগ্রিকালচারাল হেরিটেজ সিস্টেম’ বা ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
নাজিরপুর ও নেছারাবাদের এই পদ্ধতি আজ বিশ্বের জলবায়ু ঝুঁকিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অনুকরণীয় মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিড়া তৈরি
কচুরিপানা, দুলালীলতা, শ্যাওলা, টেপপানা, গুঁড়িপানা ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদের সঙ্গে খড়কুটা দিয়ে নারীরা ছোট ছোট গোলাকার ‘বিড়া’ বা দোলনা তৈরি করেন। এর ভেতর মাটি ও পচা পাতা দিয়ে বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটানো হয়।
পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ
বীজ ফুটলে তা যত্নে বড় করে তোলা, পোকা-মাকড় দূর করা এবং ধাপে বসানোর উপযোগী করার মূল দায়িত্ব পালন করেন পরিবারের নারী ও কিশোরীরা।
আর্থিক স্বাধীনতা
২০০৫ সাল থেকে নেছারাবাদের বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নূরজাহান বেগমের মতো অনেক নারী উদ্যোক্তা বর্তমানে এলাকার অসহায় নারীদের নিয়ে কাজ করছেন। এর মাধ্যমে গ্রামের হাজার হাজার নারী নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। ফলে, নিজেদের হাতখরচ ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ এখন তারা নিজেরাই বহন করছেন।
কৃষি দপ্তরের সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, নাজিরপুর ও নেছারাবাদে ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর, ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। কৃষি অফিস থেকে এই পেশার সঙ্গে জড়িত কৃষকদের নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তবে, স্থানীয় কৃষকদের মতে, ভাসমান কৃষিকে আরো লাভজনক করতে কিছু সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। হিমাগার ও পরিবহন সুব্যবস্থা সহজে চারা ও পচনশীল সবজি দূর-দূরান্তে পরিবহনের জন্য দ্রুত যোগাযোগ ও সংরক্ষণব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
সহজ শর্তে ঋণ প্রদান মৌসুমে কৃষকদের মূলধনের সংকট কাটাতে স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা উচিত। প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ আধুনিক উপায়ে বীজ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক কীটনাশক ব্যবহারের ওপর কৃষকদের আরো উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
পানির ওপর কৃষকদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প প্রমাণ করে, পরিবেশ যতই প্রতিকূল হোক, মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে তা নতি স্বীকার করতে বাধ্য। পিরোজপুরের মুগঝোর আর বলদিয়ার খালের পানিতে ভেসে থাকা প্রতিটি সবুজ চারা যেন একেকটি স্বপ্ন, যা প্রতিদিন নতুন করে বদলে দিচ্ছে দেশের গ্রামীণ অবস্থা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ