০৩:৫৩ এম
সাত মাস বয়সে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে, এরপর ছোটবেলায় বাবাকেও হারান। দাদির আদরে বেড়ে ওঠা আমিনুল হক মাখন আজ বিসিএস ক্যাডার। চরম অর্থকষ্টের মধ্যে কৃষি ও শ্রমিকের কাজ করে এবং মানুষের সহযোগিতায় পড়াশোনা সম্পন্ন করেন তিনি।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম কান্দানিয়া ভাটিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন মাখন। শৈশব থেকেই অভাব এবং প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা তাকে শিখিয়েছে। কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে কৈশোর অতিবাহিত করেছেন। তবুও অভাবের কাছে মাথা নত করেননি তিনি। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে ইট ভাঙা, রডের কাজ, কৃষিকাজসহ নবম শ্রেণি থেকে টিউশনি শুরু করেন। ২০১২ সালে, যখন মাখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, তখন তার বাবা মারা যান। এই ঘটনা তার জীবনে এক বড় ধাক্কা ছিল। তবে তিনি ভেঙে পড়েননি। কৃষিকাজ এবং টিউশনের পাশাপাশি প্রতিদিন ৭ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে কলেজে গিয়েছেন।
আমিনুল হক মাখন বলেন, ‘আমার বয়স তখন ছয় বা সাত মাস, তখন বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয় ও মা চলে যান। মা কেমন হয় সেটা আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় দেখেছি। এর আগে আমি মাকে দেখিনি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা মারা যান। আমার কোনো ভাইবোন ছিল না। চাচা-চাচি, দাদি ও ফুফুরাই আমাকে আগলে রেখেছেন।’
আরও পড়ুন: দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা কক্সবাজারে পৌঁছে দিলেন পার্বত্য মন্ত্রী
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পরিবারটি ছিল খুবই দরিদ্র। চাচা রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। আমাদের ছিল মাটির ঘর। আমার পড়াশোনার জন্য গ্রামের মানুষরাই সহযোগিতা করেছেন। ৯৫ ভাগ খরচ এসেছে তাদের কাছ থেকে। আমি কৃষি কাজ, ইট ভাঙার কাজ, রডের কাজ করেছি। সেই আয় থেকে পড়াশোনার খরচ ও পরিবারে দিয়েছি। বন্ধুরা যখন মাঠে খেলত, বেড়াতে যেত, তখন আমাকে কাজ করতে হতো। শিশু হিসেবে তা কষ্টের ছিল। তখন মনে হয়েছে, আমার সামনে কোনো পথ নেই। পড়াশোনাটাই আমার একমাত্র সম্বল।’
২০১৫ সালে মাধ্যমিক এবং ২০১৭ সালে শাহাবুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও অভাব তাকে ছাড়েনি। বিভিন্ন শিক্ষাবৃত্তি ও টিউশনি করে পড়াশোনা চালিয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন চাকরির প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি পাঁচটি বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। ৪৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারের সুপারিশ পেয়েছেন এবং ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও শিক্ষা ক্যাডারে গ্যাজেটভুক্ত হয়েছেন। মাখন বলেন, ‘২০২১ সালের মার্চ থেকে চাকরির প্রস্তুতিতে পুরোপুরি মনোযোগ দিই। কোনো কোচিংয়ে পড়িনি। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রস্তুতি নিয়েছি।’
কঠিন সময়ে বাবা-মায়ের মতোই মাখনকে আগলে রেখেছেন চাচা-চাচি। তাদের চোখে আজ আনন্দশ্রু। চাচা আবদুল খালেক বলেন, ‘সাত মাসের বাচ্চা থুইয়া ওর মা চলে গেছিল। অনেক কষ্ট কইরা ওরে বড় করছি। কোনো দিন ভাতিজা মনে করি নাই। আল্লাহ ওরে বড় করছেন।’
চাচি মিনারা খাতুন বলেন, ‘নিজের বুকের দুধ খাওয়াইয়া ওরে বড় করছি। ওর বাবা আমার হাত ধইরা কইছিল, তোমার তিনটা ছেলে আর এইটা আরও একটা। চারজনরে এক চোখে দেখবা। আমি কোনো দিন ওরে আলাদা করি নাই।’
আরও পড়ুন: বিজয়া দশমী উপলক্ষে সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন: হালিম খান
আমিনুলের পড়াশোনার পেছনে তার পরিবারের পাশাপাশি পুরো গ্রামের সমর্থন ছিল। কেউ টাকা দিয়েছেন, কেউ খাতা-কলম কিনে দিয়েছেন, কেউ পোশাক কিনে দিয়েছেন। পরীক্ষার ফি দেওয়ার সময়ও সহায়তা পেয়েছেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ করিম বলেন, ‘স্কুলজীবন থেকেই আমরা ওর পাশে ছিলাম। খাতা, কলম, পোশাক লাগলে দিয়েছি। কলেজে ফরম পূরণের সময়ও টাকা দিয়েছি। কারণ, ও ভালো ছাত্র ছিল। মনে হতো, ওর পাশে দাঁড়ালে একদিন আমাদের এলাকার গর্ব হবে। সত্যিই সে আজ সফল। সে আমাদের এলাকার গর্ব। মানুষ চেষ্টা করলে যে সব সম্ভব সেটা মাখন দেখিয়ে দিয়েছে।’
তবে এমন সফলতার দিনে মাখনের কণ্ঠে আক্ষেপ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যারা আমার জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেছেন, সেই বাবা-দাদি আমার সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। দাদি সব সময় বলতেন, তুমি একদিন বড় অফিসার হবা। বাবা আমার জন্য কোনো সংসারও করেননি। তিনিও আমার সাফল্য দেখে যেতে পারেননি এটাই আফসোস।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সাবিকুন্নাহার সিনথিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় মাখনের। ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারা বিয়ে করেন। কঠিন সময়ে স্ত্রীর কাছ থেকে মানসিক সমর্থন পেয়েছেন বলে জানান আমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘সফলতার জন্য সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য দরকার। এর সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করতে হবে। আমি মনে করি, সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য যার মধ্যে আছে, তিনি সব ক্ষেত্রেই সফল হতে পারবেন।
আরও পড়ুন: থেমে নেই ওমরাহ যাত্রীদের নিয়ে প্রতারণা, জানে হাবও
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন