০৩:৪০ পি.এম
কয়েক মাস আগে নেপালে ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর যে পাকিস্তানি ধর্মীয় বক্তার কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করা হয়েছিল, সেই বক্তাকে এবার বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে কিছু ধর্মীয় সভায় অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর আগে তিনি বাংলাদেশে ধর্মীয় প্রচারমূলক সভায় অংশগ্রহণ করেছেন। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদরাসা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজকদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ওয়্যারইস্ট ডটকম-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমান আগামী ৬ নভেম্বর রাজশাহীর কাছে মিয়ানপুরে এবং ৭ নভেম্বর নওগাঁর পোরশায় দুই দিনব্যাপী একটি ইসলামী সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে তিনি আবারও উত্তরাঞ্চলে আসছেন। গত আগস্টে তার ঘোষিত বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনাতেও এসব এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ভারত ও নেপালের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, গত জুলাই মাসে নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আগে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমানের সফর ও বিভিন্ন বৈঠকের ওপর নজরদারি চালিয়েছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি যুবসমাজ : প্রধানমন্ত্রী
প্রাণঘাতী সেই সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই তদন্তে ঘুমানের গতিবিধি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কয়েক মাস আগে। তবুও, এখন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে নতুন করে ধর্মীয় জমায়েতে তিনি অংশগ্রহণ করবেন বলে প্রচার চলছে।
মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমানের সম্ভাব্য সফর ঘিরে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। ওয়্যারইস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ তার বিষয়ে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করেছে, নেপালের কাছ থেকে কোনো তথ্য চাওয়া হয়েছে কি না এবং তার সফরের আয়োজন কারা করছে, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানতে চাচ্ছেন। বিষয়টি শুধুমাত্র একটি বিতর্কিত সফরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, বারবার ধর্মীয় প্রচারমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া এবং আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবিতে ঢাকায় আয়োজিত একটি সমাবেশে তার উপস্থিতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। এসব অতীত কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে ঘুমানের প্রভাব ও ভূমিকা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
বাংলাদেশে নিয়মিত সফর
আরও পড়ুন: দেশের সব ইউনিয়নে খেলার মাঠ হবে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী
বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালকে ঘিরে বিতর্কের অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে নিয়মিত যাতায়াত করছেন মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমান। ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর ধর্মীয় সংবাদমাধ্যম ‘আওয়ার ইসলাম’ জানায়, আগের বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ সফরের পর তিনি আবারও দেশে ফিরেছেন।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আল-মারকাজুল ইসলামী’ নামের একটি সংস্থা তার এই সফরের আয়োজন ও তত্ত্বাবধান করছে। এতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান হামজা শহীদুল ইসলামের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ঘুমানের সফরের আয়োজন নিয়ে আলোচনা করেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সফরে ঘুমানের প্রথম কর্মসূচি চট্টগ্রামের জিরি মাদ্রাসায় ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
একই সংবাদমাধ্যমে ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত তার আরেকটি সফরসূচিতে আরো বিস্তৃত কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়। এতে ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, পাবনাসহ কয়েকটি জেলায় ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
সফরসূচি অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট রাজশাহীর কাটাখালীতে জামিয়া উসমানিয়ায় এবং ২৭ আগস্ট নওগাঁর পোরশায় জামিয়া ইসলামিয়া দারুল হিদায়াতে তার কর্মসূচি ছিল। এ ছাড়া ‘আল-মারকাজুল ইসলামী’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমের কথাও ওই সূচিতে উল্লেখ করা হয়।
আরও পড়ুন: ভোলায় তথ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত
নভেম্বরের কর্মসূচিটি ‘অষ্টম বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল’ নামে প্রচার করা হয়েছে। আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, ৬ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ১০টায় মিয়াপুরে একটি মাদ্রাসাসংলগ্ন মাঠে এ মাহফিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আয়োজক ‘জামিয়া ইসলামিয়া জামিরিয়া দারুল কুরআন’। এ ছাড়া ৭ নভেম্বর নওগাঁর পোরশায় আয়োজিত আরেকটি সম্মেলনেও মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমানের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সম্মেলনটি ৮ নভেম্বর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।
আগে প্রকাশিত এই সফরসূচিটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে নওগাঁর পোরশা উপজেলাকে এতে নতুন কোনো গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমানের নিয়মিত সফরের একটি জায়গা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
একজন সাবেক আফগান জিহাদি
মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমান পাকিস্তানের সারগোদায় অবস্থিত ‘মারকাজ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’-এর সঙ্গে যুক্ত। তার পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে ধর্মীয় শিক্ষা, বিশেষায়িত পাঠক্রম, অনলাইন কোর্স এবং আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: সংগঠিত ও দক্ষ যুবসমাজ দেশের মূল্যবান সম্পদ : রাষ্ট্রপতি
‘আহনাফ মিডিয়া’ প্রকাশিত উর্দু ভাষার একটি পুরনো জীবনীতে ঘুমানের অতীত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। প্রশংসাসূচক ভাষায় লেখা ওই জীবনীতে বলা হয়েছে, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি তিনি আফগান জিহাদেও অংশ নিয়েছিলেন। এতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯৬ ও ১৯৯৯ সালে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তবে জীবনীটিতে দাবি করা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে উভয় মামলাতেই তিনি খালাস পান।
নেপালের অভিযোগ
আগস্টে প্রকাশিত বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ২৬ জুলাই সুনসারি জেলায় অস্থিরতার ঘটনার পর নেপালের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমানের গতিবিধি খতিয়ে দেখছিল। প্রাথমিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে স্পর্শকাতর সীমান্তবর্তী ওই জেলায় মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমান এবং কাঠমান্ডুর একটি মসজিদের ইমাম মুফতি আবু বকর কাসমির উপস্থিতির বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়।
পরে নেপালের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমানের সঙ্গে হরকাত-উল-মুজাহিদীন, হরকাত-উল-আনসার ও হিজবুল মুজাহিদীনের যোগাযোগ থাকার অভিযোগে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এসব প্রতিবেদনে নেপালের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে কথিত বৈঠক এবং বাংলাদেশি ধর্মীয় ব্যক্তিদের সফরের বিষয়েও উল্লেখ করা হয়।
আরও পড়ুন: নোবিপ্রবিতে ইনকিলাব মঞ্চের ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত
সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য
বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করা। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত একটি সমাবেশে অংশ নেওয়া বিদেশি ধর্মীয় ব্যক্তিদের মধ্যে মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমানও ছিলেন। ওই সমাবেশ থেকে আয়োজকরা সরকারের কাছে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানান।
আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সদস্যরা নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন। তবে এ ধরনের প্রচারণায় অংশ নেওয়া ধর্মীয় নেতারা তাদের বিশ্বাসকে ইসলামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলে স্বীকার করেন না। ওই সমাবেশের মধ্য দিয়ে বছরজুড়ে একটি প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়। এর মধ্যে ছিল স্বাক্ষর সংগ্রহ, স্মারকলিপি জমা দেওয়া এবং আরো কয়েকটি সম্মেলনের আয়োজন।
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমাবেশের আগেই ‘আহমদিয়া মুসলিম জামাত’ প্রধান উপদেষ্টার কাছে চিঠি দিয়ে তাদের সদস্যদের নিরাপত্তা এবং জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছিল।
আরও পড়ুন: সখিপুরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী
এ থেকে দেখা যায়, মুহাম্মদ ইলিয়াস ঘুমান এমন একটি সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্বীকৃত পরিচয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ আরোপের দাবি তোলা। ঘুমানের জনসম্পৃক্ত ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রশ্নটি শুধু একজন বিদেশি ধর্মপ্রচারক কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কি না, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এর সঙ্গে আরো বড় একটি প্রশ্ন জড়িত, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ কি এমন প্রচারণাকে গ্রহণযোগ্যতা দিচ্ছে, যা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও ভীতির মুখে ঠেলে দিতে পারে?
স্থানীয়ভাবে প্রচারিত পোস্টারগুলোতে তিন দিনব্যাপী ধর্মীয় কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। পোস্টারে রাজশাহীর ব্যবসায়ী আব্দুল কাইয়ুম শাহকে প্রধান অতিথি, ধর্মীয় নেতা শহীদুল ইসলামকে সভাপতি এবং ‘ইতিদাল ফাউন্ডেশন রাজশাহী’কে আয়োজক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্য একটি পোস্টারে নওগাঁর পোরশার প্রধান মাঠে ৭ ও ৮ নভেম্বর দুই দিনব্যাপী ইসলামি সম্মেলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আসরের নামাজের পর শুরু হয়ে সম্মেলনটি ভোর পর্যন্ত চলার কথা।
‘ইসলামী সম্মেলন সংস্থা, পোরশা’র আয়োজনে এই সম্মেলনের প্রথম দিনের প্রধান বক্তা হিসেবে ঘুমানের নাম রয়েছে। দ্বিতীয় দিনের প্রধান অতিথি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হককে। দুই দিনের কর্মসূচিতেই স্থানীয় ও বাইরের আরও কয়েকজন ধর্মীয় নেতার অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন