০৬:৩৩ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রার্থী হিসেবে থাকছেন না। এমনকি রিপাবলিকানরা নির্বাচনে হেরে গেলেও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির উপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে ট্রাম্প সচেতন আছেন যে, যদি ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, তাহলে বাকি দুই বছর তিনি নিজের ইচ্ছামত দেশ চালাতে পারবেন না। তাই রিপাবলিকান প্রার্থীদের জেতানোর জন্য তিনি প্রচারণায় ব্যস্ত রয়েছেন।
তবে, তার প্রচারণা দলের পক্ষ থেকে টানা ক্লান্তিকর সমাবেশ থেকে ট্রাম্পকে মুক্তি দিতে দুটি নির্ধারিত সমাবেশ বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু বাতিলের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর নেতিবাচক প্রচারণায় বিরক্ত হয়ে ট্রাম্প আবারও ওই সমাবেশ দুটিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
চলতি মাসে নিজের ২৫তম মধ্যবর্তী নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দিতে গত বৃহস্পতিবার সাউথ ক্যারোলাইনায় যাওয়ার সময়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার রাজনৈতিক দলের সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেন যে কানসাসের সমাবেশে ট্রাম্প সশরীরে উপস্থিতির পরিবর্তে টেলিফোনে তার সমাপনী বক্তব্য দেবেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর, আইওয়াতে নির্ধারিত আরেকটি সমাবেশও একইভাবে বাতিল করা হয়। এটি ছিল নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় প্রেসিডেন্টের কৌশলের একটি নাটকীয় পরিবর্তন। কারণ এত দিন তিনি রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতে একের পর এক ক্লান্তিকর সমাবেশ করে কর্মী-সমর্থকদের মাঝে উদ্দীপনা বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন।
আরও পড়ুন: মোজিবুল হকের সঙ্গে সাবেক জাপানি প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর সাক্ষাৎ
সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে ফিরে ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, তিনি মনে করেন না যে তার কানসাসে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, কারণ রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শাল খুব ভালো করছেন।
এই সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের কিছু রাজনৈতিক কর্মী স্বস্তি অনুভব করেন। ট্রাম্প সশরীরে না গিয়ে টেলি-র্যালি (টেলিফোনে সমাবেশ) করবেন শুনে তারা খুশি হন। কারণ সাধারণত টেলি-র্যালি আগে থেকে লিখে রাখা বক্তব্য অনুযায়ী চলে। ফলে ট্রাম্পের উল্টাপাল্টা কথা বলার আশঙ্কা কিছুটা কমে যাবে। দুটি নির্ধারিত সমাবেশ বাতিলের বিষয়ে একজন শীর্ষ রিপাবলিকান কর্মকর্তা সিএনএন-কে বলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। তিনি কোথাও তেমন বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারছিলেন না।’
কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিকল্পনা আবার বদলে যায়। কানসাস এবং আইওয়ার সমাবেশ দুটি আবারও বহাল করা হয় এবং দুটিই এখন রোববারের জন্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা ট্রাম্পের যে তুমুল নির্বাচনী প্রচারণার গতি আকস্মিকভাবে শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তা এখন আবার পুরোদমে বাড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার বিকেলে হোয়াইট হাউজে কথা বলার সময় ট্রাম্প জানান, আইওয়া এবং কানসাসের বন্ধুরা তাকে ফোন করে সমাবেশ বাতিলের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে এমন কয়েকটি আসন রয়েছে যেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলেছেন আপনি যদি সশরীরে যান, তবে তা টেলি-র্যালির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হবে। আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম এবং বলেছিলাম, একটি টেলি-র্যালি করলে কেমন হয়? কিন্তু তারা আমাকে অনুরোধ করেছেন। তাই আমি রোববার দুটি সমাবেশই করতে যাচ্ছি।’ এছাড়া শনিবার বিকেলের কলেজ ফুটবল ম্যাচগুলোর কারণে তিনি তার অনুষ্ঠানগুলো রোববারে স্থানান্তরিত করেছেন বলে উল্লেখ করেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্পকে ভার্চুয়াল ইভেন্টগুলোতে যুক্ত হওয়ার জন্য আরও বেশি সময় দিতেই কেবল সময়সূচিতে এই রদবদল করা হয়েছিল। তবে, এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সিএনএন-এর কাছে ভিন্ন কারণ বর্ণনা করেছেন। দুটি সমাবেশ বাতিলের সিদ্ধান্তে সায় দেওয়ার পর, এ নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখে ট্রাম্প বেশ বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন বলে সূত্রগুলো জানায়। সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে ফিরে সমাবেশ বাতিলের কারণ জানতে চাওয়া একজন সাংবাদিকের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ার সময়ই তার এই বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন: ইন্ডিয়া জোটের অভিনব প্রতিবাদ: সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ‘প্রতীকী অভিশংসন’
প্রচারণা চালাতে চালাতে তিনি ক্লান্ত বা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ’আপনি দুই সপ্তাহ ধরে আমার পেছনে ঘুরছেন। আমি একদম নিখুঁত আছি।’ যে সাংবাদিক প্রশ্নটি করেছিলেন, তাকে দেখতে ’একেবারে বিধ্বস্ত’ লাগছিল বলে ট্রাম্প কটাক্ষ করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রেসিডেন্ট বাতিল হওয়া সমাবেশগুলো পুনরায় চালু করার নির্দেশ দেন। এর ফলে যে কর্মীরা মাত্রই ক্যালেন্ডার থেকে অনুষ্ঠানগুলো বাদ দেওয়ার কাজ শেষ করেছিলেন, তাদের তড়িঘড়ি করে সেগুলো আবার যুক্ত করতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করতে হয়। এই পরিবর্তন নিশ্চিত করে দেওয়া একটি বিবৃতিতে লেখা হয়, ’সমাবেশ আবার ফিরে এসেছে!’
এই ঘটনাটি কেবল এটাই প্রমাণ করে যে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভাগ্য কতটা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করছে— তা সে তার পছন্দের প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়াই হোক কিংবা তার নিজস্ব ধাঁচের বড় বড় সমাবেশগুলোই হোক, যা প্রায়শই মূল রাজনৈতিক ইস্যু এবং প্রার্থীদের প্রচারণার মূল বক্তব্য থেকে দূরে সরে যায়। এমনকি কিছু রিপাবলিকান প্রার্থীকেও এই পরিস্থিতির সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার কানসাসের সমাবেশ বাতিলের খবর আসার পর সিনেটর মার্শাল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি জনমত জরিপে আমি এত ভালো করছি যে, সম্ভবত এর চেয়ে ভালো কোনো জায়গায় সময় দেওয়ার সুযোগ তার রয়েছে।’
তবে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা জোর দিয়ে বলছেন যে, প্রচারণার মাঠে প্রেসিডেন্টের চাহিদা এখনও ব্যাপক। এক উপদেষ্টা সিএনএন-কে জানান, আগামী মঙ্গলবারের নির্বাচনের এই শেষ মুহূর্তের দৌড়ে ট্রাম্প যেন তাদের অঙ্গরাজ্যগুলো সফর করেন, সেই অনুরোধ জানিয়ে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী শিবির থেকে তার রাজনৈতিক দলের কাছে প্রতিনিয়ত ফোন আসছে।
আরও পড়ুন: লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থি সংগঠনের বিক্ষোভ, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা
ট্রাম্পের কর্মকর্তারা মূলত এই যুক্তিই দিয়েছিলেন যে এটিই ছিল এই সপ্তাহান্তের অনুষ্ঠানগুলো বাতিলের আসল কারণ: সশরীরে উপস্থিত থাকার অনুষ্ঠানগুলো বাদ দিয়ে ট্রাম্প বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের প্রার্থীদের জন্য টেলি-র্যালি করে নিজের সময়টার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারবেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যে ট্রাম্পের প্রচারণা দল ঘোষণা করে, ’ভোটারদের উজ্জীবিত করতে, ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি বাড়াতে এবং বিজয় নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট ১৯টি অঙ্গরাজ্যে ভার্চুয়াল ইভেন্টে প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নেবেন।
ভার্চুয়াল ইভেন্টে এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি রিপাবলিকানদের কিছু অংশের কাছে বেশ ইতিবাচক ছিল। সশরীরে উপস্থিত থাকার অনুষ্ঠানগুলো বাতিল থাকার ওই ২১ ঘণ্টার মধ্যে, নির্বাচনী লড়াইয়ের মূল ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান কর্মী নীরবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন যে ট্রাম্পের এই প্রচারণার বহর আর তাদের রাজ্যে আসছে না। অনেকেই উল্লেখ করেছেন যে, টেলি-র্যালির সময় ট্রাম্পের সেইসব অস্পষ্ট বা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে, যা এখন তার বড় বড় সমাবেশগুলোর একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে। যেমন—তিনি যে বুদ্ধিমত্তা বা কগনিটিভ পরীক্ষায় পাস করেছেন সেই দাবি, হোয়াইট হাউজের বলরুমের গল্প, কিংবা বিভিন্ন রিপাবলিকান পুরুষের শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য।
একজন রিপাবলিকান কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনের এই চূড়ান্ত ব্যস্ততার সময়ে ট্রাম্পের সমাবেশগুলো অতিরিক্ত সময় নষ্ট করছিল। অথচ এই সময়ে রিপাবলিকান কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া, জনসংযোগ করা এবং ভোটারদের কেন্দ্রে আনার অন্যান্য কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকতে পারতেন।
ট্রাম্পের সাথে কথা বলেছেন এমন ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রচারণার শেষ সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প মাঝেমধ্যে তার সহযোগীদের আরও বেশি সফরের সূচি তৈরি করতে চাপ দিয়েছেন। গভীর রক্ষণশীল জেলাগুলোতে তাকে দেখতে আসা ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় দেখে তিনি উজ্জীবিত বোধ করছিলেন এবং বন্ধুবান্ধব ও উপদেষ্টাদের কথায় উৎসাহিত হচ্ছিলেন, যারা তাকে বলছিলেন যে তার উপস্থিতি রিপাবলিকানদের উদ্দীপনা সরাসরি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: সময়সীমা কমিয়ে ২ দিনের মধ্যে হরমুজ চালুর নতুন প্রস্তাব ইরানের
তবে ওই সূত্রগুলো আরও জানায়, মাসব্যাপী এই ঝোড়ো প্রচারণার অন্যান্য সময়ে তিনি আবার এই সফরের ক্লান্তিকর ও অবিরাম প্রকৃতি নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন, যার কারণে তাকে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন শহরে যেতে হচ্ছে। অনেক সময় কলেজ এরিনা বা সিভিক সেন্টারগুলোতে সমাবেশ করতে হচ্ছে, যেগুলো তার নিজের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়কার কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়ামগুলোর তুলনায় একেবারেই ছোট বা অনুন্নত মনে হয়। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এবং ইদানীং জনসমক্ষে ক্রমবর্ধমানভাবে এই নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন যে, নিজের নির্বাচন না হওয়া সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে তাকে কতটা কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট মেইন অঙ্গরাজ্য ছাড়া সিনেট নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকা প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই সফর করেছেন—অনেক রাজ্যে একাধিকবারও গেছেন। মধ্য-পশ্চিম অঞ্চলে সপ্তাহান্তের এই সফরগুলো বাতিল করার হোয়াইট হাউজের প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও দলের অনুগতদের মধ্যে এটি নিয়ে খুব কমই অভিযোগ ছিল।
রবিবার অনুষ্ঠানগুলোসহ হিসাব করলে, অক্টোবর মাসের শুরু থেকে ট্রাম্প মোট ২৮টি সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নিয়েছেন। এমনকি তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে এই সময়সূচিটি অত্যন্ত ক্লান্তিকর এবং এর ফলে তার কণ্ঠস্বরের ওপর বেশ ধকল গেছে।
চলতি মাসে কেনটাকির এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমার এটি করার কোনো দরকার নেই। কিন্তু আমাকে করতে হচ্ছে, কারণ (ডেমোক্র্যাটরা) যদি এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে জিতে যায়, তবে হঠাৎ করেই আপনারা এক বিপর্যয় দেখতে পাবেন এবং আমরা যেসব আবর্জনা বা আজেবাজে বিষয় নিয়ে কথা বলি, তার সব ফিরে আসবে। ঠিক এই কারণেই আমি এখানে আপনাদের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে খেটে যাচ্ছি।’ সূত্র: সিএনএন
আরও পড়ুন: ট্রাম্প প্রশাসনের আফগান শরণার্থীদের পাকিস্তানে পাঠানোর পরিকল্পনা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন