০৬:৩১ এম
বাংলাদেশ ব্যাংক আবারো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা বা ধার দিচ্ছে। গত এক সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে। এই অর্থ নতুন করে টাকা ছাপানোর মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতামত, এতে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।
সূত্র অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অস্থিরতার ফলে গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত উত্তোলনের চাপ মোকাবেলা করতে বিশেষ তারল্য সহায়তা প্রদান করা হয়। এসময় ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়ে এবং গ্রাহকদের নগদ অর্থ পরিশোধে সংকটে পড়েছে। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চাওয়া হলে ধাপে ধাপে ব্যাংকটিকে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: সরকারকে সেলিম উদ্দিনের আহ্বান, গণরায়ের বিরুদ্ধে না গিয়ে জনগণের পক্ষে দাঁড়ান
অর্থনীতিবিদরা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নতুন টাকা সৃষ্টি করে কোনো ব্যাংককে ঋণ দেয়, তখন তাত্ত্বিকভাবে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন ও পণ্যের সরবরাহ একই হারে না বাড়লে তখন মূল্যস্ফীতির ওপর কিছু চাপ তৈরি হতে পারে। একটি ব্যাংককে সীমিত পরিসরে দেওয়া এই ধরনের তারল্য সহায়তার প্রভাব সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে খুব বেশি দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌকিফ আহমেদ জানান, ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটানোর উদ্দেশ্যেই এ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে একজন ব্যাংককে দেওয়া এ ধরনের সহায়তার ফলে সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।
তিনি আরও বলেন, অর্থের সরবরাহ বাড়লে চাহিদাও কিছুটা বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে একটি ব্যাংককে সীমিত পরিসরে দেওয়া তারল্য সহায়তার কারণে বাস্তবে এর প্রভাব সাধারণত খুবই সামান্য থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ বা শেষ আশ্রয়দাতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের অংশ। কোনো ব্যাংক যদি হঠাৎ তারল্য সংকটে পড়ে, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হলো সাময়িক সহায়তা দেওয়া, যাতে ব্যাংকটি স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস করেছে ফ্যাসিস্ট সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
এটি কোনো অনুদান নয়; বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ঋণ, যা নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে হবে। ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক এবং দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ এই ব্যাংকের মাধ্যমে আসে। তাই ব্যাংকটি কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হলে পুরো ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। বৃহত্তর আর্থিক স্থিতিশীলতার স্বার্থেই এই সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, ব্যাংকটির পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একজন নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সহায়তার কারণে মূল্যস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন কোনো ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেয়, তখন নতুন অর্থ বাজারে প্রবেশ করে। এই অর্থের বিপরীতে তাৎক্ষণিকভাবে সমপরিমাণ পণ্য বা সেবা না থাকলে তাত্ত্বিকভাবে এটি মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে এ ধরনের সহায়তা মূল্যস্ফীতি কিছুটা উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংককে সহায়তা ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে কার্যকর কোনো বিকল্প ছিল না। বিশ্বের কোনো ব্যাংকই একসঙ্গে সব গ্রাহকের টাকা তুলতে এলে তাৎক্ষণিকভাবে সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: জনগণের বিরুদ্ধে অবৈধ সাম্রাজ্য রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের নয়: হাসনাত আবদুল্লাহ
আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বা অপরিহার্যতার নীতির ভিত্তিতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যার উদ্দেশ্য হল গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা, যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
তিনি বলেন, এই সংকট সাময়িক। ইসলামী ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করবে। ফলে অতিরিক্ত অর্থ আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফিরে আসবে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হবে না।
আগের ক্ষেত্রেও টাকা ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০২২ সালের শেষ দিকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর গ্রাহকরা ব্যাংকগুলোর থেকে আমানত উত্তোলন বৃদ্ধি করে। তখন ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে তারা সিআরআর ও সরকারি সিকিউরিটিজ হিসেবে এসএলআর রাখতে ব্যর্থ হয়। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন টাকা সৃষ্টি করে বিশেষ তারল্য সহায়তা দেয়।
এরপর সংকট আরও গভীর হলে ব্যাংকগুলোর চলতি হিসাব ঘাটতিতে পড়ে। সে ঘাটতি রেখেও লেনদনের সুযোগ দেওয়া হয় তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের মাধ্যমে।
আরও পড়ুন: আইফোনের জন্য বন্ধুকে খুন করেছে সায়েল মিয়া
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হয়। শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে অর্থ সহায়তা না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে। কিন্তু বিভিন্ন ব্যাংকে তারল্য সংকট ও অস্থিরতা বাড়তে থাকায় পরে আবার বিশেষ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
বর্তমান সরকারও টাকা ছাপিয়ে ব্যাংককে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। তবে ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ তারল্য সহায়তা দিতে বাধ্য হয়।
কোন ব্যাংক কত সহায়তা পেয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিশেষ তারল্য সহায়তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা পেয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এরপর এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি এবং ইসলামী ব্যাংক ৯ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে।
এছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংক পাঁচ হাজার ৪২০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক পাঁচ হাজার কোটি, এবি ব্যাংক চার হাজার ২৭০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক তিন হাজার তিন কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৬২৪ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ২৫২ কোটি, পদ্মা ব্যাংক ২৫২ কোটি এবং বেসিক ব্যাংক ১৯৫ কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে। সব মিলিয়ে বিশেষ তারল্য সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন: বৃষ্টি বলয়ের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’
যেভাবে দেওয়া হয় ঋণ, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬(৪)(ডি) ও ১৭(১)(বি) ধারার আওতায় ৯০ দিনের জন্য সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এই অর্থ প্রদান করা হয়। ব্যাংকিং পরিভাষায় এটি ‘ওভারনাইট-ওডি’ সুবিধা নামে পরিচিত। ঋণের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো সমমূল্যের ডিমান্ড প্রমিসরি নোট জমা দেয়। শর্ত অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক অবসায়িত বা দেউলিয়া হলে তাদের সম্পদ বিক্রির অর্থ থেকে সবার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন