০৭:২৯ পি.এম
জুলাই সনদের আলোকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির পেশ করেছে ১৩ দফা প্রস্তাব, যা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কাঠামোগত সংস্কার, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধের দাবি করে। সংগঠনটি সরকারি নিয়োগে দলীয়করণ বন্ধ করে মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য জোর দাবি জানিয়েছে।
বুধবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ডাকসু ভবনের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
সংবাদ সম্মেলনের সময় ছাত্রশিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, "ছাত্র-জনতার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা।" তিনি অভিযোগ করেন যে, প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়নে গড়িমসি করা হচ্ছে এবং গণভোটে ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় ও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
আরও পড়ুন: স্ত্রীর ছবি ফেসবুকে দেয়ায় বন্ধুকে হত্যা, কুয়েতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড
তিনি আরও বলেন, "পিএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করা হচ্ছে।" প্রশ্নফাঁস, মৌখিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিক নম্বর বৃদ্ধি, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে মেধাবীদের বাদ দেওয়া এবং দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের সংস্কৃতি রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি মন্তব্য করেন, "সরকারি চাকরিকে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত কর্মীদের পুরস্কৃত করার সুযোগ নয়।" এটি রাষ্ট্রের সেবা করার দায়িত্ব। তাই নিয়োগ হতে হবে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে। তিনি বলেন, "কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা তার পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যেন নিয়োগে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।"
পিএসসির সংস্কার উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোডভিত্তিক লিখিত খাতা মূল্যায়ন, কম্পিটেন্সি বেইজড ইন্টারভিউ, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা জোরদার এবং ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি নিয়োগব্যবস্থাকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, "এসব উদ্যোগ বহাল রাখার পাশাপাশি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত পদায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে এবং বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ করতে হবে।"
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে এক হাজার ২০০ জনের বেশি প্রার্থীকে নিয়োগপত্র না দেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরে শিবির সভাপতি বলেন, বাদ পড়া প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। তিনি বলেন, "রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে চাকরিপ্রার্থীদের বাদ দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।" তিনি আরও বলেন, "রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য সৃষ্টি সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতার সাংবিধানিক নীতির পরিপন্থি।"
আরও পড়ুন: দুর্গাপুরে ডেপুটি স্পিকারের উদ্যোগে পুলিশ তদন্তকেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে
সংবাদ সম্মেলনে পেশকৃত ১৩ দফা প্রস্তাবের মূল দিকসমূহ
১. পিএসসি সংস্কার: জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী পিএসসির কাঠামোগত সংস্কার এবং চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন করা।
২. পিএসসির আওতা সম্প্রসারণ: নবম ও দশম গ্রেডসহ সব সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া পিএসসির অধীনে সম্পন্ন করা এবং এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও আর্থিক হস্তক্ষেপ বন্ধ রাখা।
৩. নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিতকরণ: লিখিত পরীক্ষার কোডভিত্তিক মূল্যায়ন, ১০০ নম্বরের ভাইভা, ডিজিটালি প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধ ও ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি বহাল রাখা। শূন্য পদের চাহিদা সংগ্রহ করে সমন্বিত বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা এবং ১২ মাসের মধ্যে পদায়ন সম্পন্ন করা।
আরও পড়ুন: সরকার পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছে : নাহিদ ইসলাম
৪. সহজ ও নিরপেক্ষ ভেরিফিকেশন: পুলিশ ভেরিফিকেশনের মানদণ্ড লিখিতভাবে প্রকাশ, এনআইডি ও অফিশিয়াল অপরাধ রেকর্ডের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। নেতিবাচক তথ্য থাকলে প্রার্থীকে লিখিতভাবে জানানো এবং আপিলের সুযোগ প্রদান করা।
৫. ভাইভায় স্বচ্ছতা: অসংগতি রোধে ভাইভার অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং লিখিত পরীক্ষায় এগিয়ে থাকা প্রার্থীর নম্বর ভাইভায় ইচ্ছাকৃতভাবে কম-বেশি করার প্রবণতা বন্ধ করা।
৬. আইন সংস্কার: সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮-এর ৮, ১৯ ও ২০ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন করে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে মেধা, সততা ও পেশাদারিত্বকে চাকরির মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ, তথ্য ও মানবাধিকার সম্পাদক তানজির হোছাইন জুয়েল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক সুমন সরকার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও ডাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মহিউদ্দিন খানসহ কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: চলতি বছরে সারের আমদানি বাড়ানোর ঘোষণা কৃষিমন্ত্রীর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন